- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ১০, ২০২৬
দিল্লিতে আটক নেতা-কর্মীদের মুক্তি না দিলে, ফের অনশনের হুঁশিয়ারি সোনমের
দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের আটক করা নিয়ে সরব হলেন পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। যন্তরমন্তরে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আটক করার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র যে ঘোষণা না-করা জরুরি অবস্থার মধ্যে পড়বে, তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি।’ আটক ব্যক্তিদের রবিবারের মধ্যে মুক্তি দেওয়া না-হলে ফের অনশন অথবা পদযাত্রার কথা বিবেচনা করতে বাধ্য হবেন বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার কার্যত রণক্ষেত্র রাজধানী। বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংবাদিক ছাড়াও কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে খবর। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অরবিন্দ কেজরীওয়াল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পিনারাই বিজয়ন, বৃন্দা কারাট, মানিক সরকার, জন ব্রিটাস, নেহা বোরা, মীনাক্ষী মুখার্জি, সৃজন ভট্টাচার্য, ঐশী ঘোষ, যোগেন্দ্র যাদব, প্রশান্ত ভূষণ, ‘সিজেপি’-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস-সহ আরও অনেকে। এ ঘটনার পরেই সমাজমাধ্যমে সরব হয়েছেন ওয়াংচুক। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এত জন নেতা রয়েছেন দেখে তিনি আশ্বস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের সকলকে আটক করার খবর পেয়ে তিনি বিস্মিত। আশা করছেন, সরকার দ্রুত তাঁদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে। অন্যথায় ফের অনশন কিংবা পদযাত্রার পথে হাঁটার কথা ভাববেন তিনি।
ওয়াংচুকের জানান, ‘আমি খুশি হয়েছিলাম যে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এত জন নেতা রয়েছেন। কিন্তু এখন জানতে পারছি, তাঁদের সকলকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আশা করি, আটক ব্যক্তিদের দ্রুত মুক্তি দেওয়া হবে। আগামীকালের মধ্যে তাঁদের মুক্তি না-দেওয়া হলে অনশন অথবা পদযাত্রার কথা বিবেচনা করতে বাধ্য হব।’ শুক্রবার অবশ্য দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দিতে পারবেন না বলে জানিয়েছিলেন ওয়াংচুক। লাদাখে তাঁর কিছু জরুরি কাজ রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। শীতের আগে হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় জলনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হিমবাহ-হ্রদ থেকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু শনিবারের আটকের ঘটনা পরিস্থিতিকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন ওয়াংচুক।
শুক্রবার সমাজমাধ্যমে উর্দু কবি ফয়জ আহমেদ ফয়জের একটি বিখ্যাত কবিতার অনুকরণে লিখেছিলেন, ‘ঔর ভি গম হ্যায় জামানে মে সিয়াসত কে সিবা… রাহতেঁ অউর ভি হ্যায়ন ওয়াসল কি রাহত কে সিবা।’ অর্থাৎ, রাজনীতি ছাড়াও পৃথিবীতে আরও অনেক দুঃখ রয়েছে, আর প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনের আনন্দ ছাড়াও স্বস্তি পাওয়ার আরও পথ রয়েছে। সে বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজনীতির বাইরেও জীবনের নানা দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরের দিনই দিল্লিতে আটক-পর্বের ঘটনায় নতুন করে আন্দোলনে নামার ইঙ্গিত দিলেন এই পরিবেশকর্মী। শুক্রবারের বার্তায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আবেদন জানিয়েছিলেন ওয়াংচুক। একই সঙ্গে জেন জ়ি-র তরুণ আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, প্রতিবাদের ভাষা যেন কোনো অবস্থাতেই হিংসাত্মক হয়ে না ওঠে। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের আদর্শের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘এটাই ছিল বাপুর দেওয়া শিক্ষা, যা আমি জুন মাসে যন্তরমন্তরে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলাম। আশা করি, আমরা বাপুকে হতাশ করব না।’ শনিবারের ঘটনার পরে সেই আবেদন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আটক নেতাদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও ওয়াংচুক আপাতত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথেই থাকার বার্তা দিয়েছেন।
পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে গত জুন মাসে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছিলেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। ‘নিট-ইউজি’ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তরমন্তরে অনশনে বসেছিলেন তিনি। তাঁর অনশনকে কেন্দ্র করে ছাত্রছাত্রী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন বাড়তে থাকে। ক্রমে আন্দোলন বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসর পায়। অনশনের ২১তম দিনে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রশাসন তাঁকে বিক্ষোভস্থল থেকে সরিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ২৩ জুলাই হাসপাতালে অনশন ভাঙেন ওয়াংচুক। সে সময় তাঁর বক্তব্য ছিল, সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পরে এবং দেশে সম্ভাব্য হিংসার আশঙ্কার কথা বিবেচনা করে তিনি অনশন প্রত্যাহার করেছেন।
এর পর ২০ জুলাই সংসদ ভবন অভিযানের কর্মসূচিকে ঘিরে আন্দোলন আরও গতি পায়। পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে সরকারের উপর চাপ বাড়তে থাকে। ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। সেই ঘটনাকে আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হিসেবে দেখেছিলেন বিক্ষোভকারীরা। তবে ওয়াংচুক এবং সিজেপির মধ্যে পরবর্তী সময়ে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ওয়াংচুক ফিরে গিয়েছেন লাদাখে নিজের পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত কাজে। শনিবারের বিক্ষোভে তাঁর অনুপস্থিতির কারণও ছিল সে দায়িত্ব। লাদাখে শীত নামার আগে কৃত্রিম হিমবাহ তৈরির কাজ এবং হিমবাহ-হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন সোনম। শুক্রবারের পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, সরকারের বিভিন্ন বাধা সত্ত্বেও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের কাজ চলছে। হিমবাহ-হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যা বা গ্লফ (গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড) হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। হিমবাহ গলে হ্রদে অতিরিক্ত জল জমলে বাঁধ ভেঙে নীচের জনপদে আচমকা জল নেমে আসার আশঙ্কা থাকে। সে বিপদ মোকাবিলায় পরীক্ষানিরীক্ষা চালানোর কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, জলসংকট মোকাবিলায় কৃত্রিম হিমবাহ তৈরির কাজও চলছে বলে দাবি তাঁর।
ওয়াংচুকের জানান, হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে ২০০-রও বেশি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে, যেগুলিকে তিনি ‘টিকটিক করা জলবোমা’ বলে উল্লেখ করেছেন। শীতের আগে ওই বিপদ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়াই এখন তাঁর কাজের অন্যতম লক্ষ্য। সে কারণেই শুক্রবার দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দিতে না-পারার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শনিবারের আটকের ঘটনা তাঁর অবস্থানে বদল এনেছে। আন্দোলনকারীদের মুক্তি না-দিলে ফের অনশন কিংবা পদযাত্রার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। ওয়াংচুকের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সংঘাত অবশ্য নতুন নয়। গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর লেহ-তে হিংসার ঘটনার পরে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ)-এ আটক করা হয়েছিল তাঁকে। ওই হিংসায় চার জনের মৃত্যু হয়েছিল। জেলাশাসকের জারি করা নির্দেশের ভিত্তিতে তাঁকে আটক করা হয় বলে জানা যায়।
এরপর রাজস্থানের যোধপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল তাঁকে। চলতি বছরের মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় সরকার আটকাদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলে মুক্তি পান ওয়াংচুক। এ বার দিল্লিতে বিরোধী নেতাদের আটক করার ঘটনায় ফের তাঁর প্রতিবাদী অবস্থান সামনে এল। একদিকে লাদাখে পরিবেশ ও জলনিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজ, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে সওয়াল — দুই ক্ষেত্রেই সক্রিয় থাকার কথা জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। এখন দেখার, রবিবারের মধ্যে আটক নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয় কি না এবং তা না-হলে ওয়াংচুক সত্যিই নতুন করে অনশন অথবা পদযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেন কি না।
❤ Support Us








