Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুলাই ১০, ২০২৬

মৌসুমি অক্ষরেখার দোসর ঘূর্ণাবর্ত, টানা বৃষ্টিতে নাজেহাল কলকাতা-সহ বাংলা। দক্ষিণে ভারী বর্ষণের সতর্কতা, উত্তরে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মৌসুমি অক্ষরেখার দোসর ঘূর্ণাবর্ত, টানা বৃষ্টিতে নাজেহাল কলকাতা-সহ বাংলা। দক্ষিণে ভারী বর্ষণের সতর্কতা, উত্তরে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা

রাতভর অবিরাম বর্ষণ। শুক্রবার সকালেও স্বস্তি মেলেনি কলকাতাবাসীর। শহর ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় দফায় দফায় বৃষ্টি চলেছে। কোথাও জলমগ্ন রাস্তাকোথাও হাঁটু সমান জলকোথাও আবার যানজটের দীর্ঘ সারি। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস বলছেআপাতত এই ভেজা আবহাওয়া থেকে মুক্তি মিলছে না। আগামী কয়েক দিন দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, বর্তমানে বর্ষাকালীন অক্ষরেখাটি রাজস্থানের অনুপগড়রোহতকদক্ষিণ-পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের উপর অবস্থানরত সুস্পষ্ট নিম্নচাপ এলাকার কেন্দ্র, ফুরসতগঞ্জদেহরিধানবাদবাঁকুড়া এবং দীঘার উপর দিয়ে উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। অন্যদিকেবাংলাদেশের পূর্বাংশ ও সংলগ্ন এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩.১ কিলোমিটার থেকে ৭.৬ কিলোমিটার উচ্চতার মধ্যে একটি সক্রিয় উচ্চস্তরের ঘূর্ণাবর্ত অবস্থান করছে। উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে যা দক্ষিণমুখী হেলে রয়েছে। এই দুই আবহাওয়াগত ব্যবস্থার প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প স্থলভাগে প্রবেশ করছেযার ফলেই রাজ্যজুড়ে বৃষ্টির দাপট বৃদ্ধি পেয়েছে।

কলকাতার জন্য আগামী কয়েক দিন বিশেষ সতর্কতার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। পূর্বাভাস অনুযায়ীআগামী সোমবার পর্যন্ত শহরে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা ও ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। শুক্রবার কলকাতায় বৃষ্টির সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ বলে জানিয়েছে হাওয়া অফিস। শহরের আকাশ সারাদিনই মেঘলা থাকবে এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু কলকাতা নয়একই ধরনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে হাওড়াহুগলিউত্তর ২৪ পরগনাবীরভূমপশ্চিম বর্ধমানবাঁকুড়াপুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রাম জেলাতেও।

দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনাপূর্ব মেদিনীপুরপশ্চিম মেদিনীপুরনদিয়ামুর্শিদাবাদ এবং পূর্ব বর্ধমান জেলায় ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। শুক্রবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই জেলাগুলিতে ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। পাশাপাশি হাওড়াকলকাতাহুগলি এবং পূর্ব বর্ধমান জেলায় শুক্রবারের জন্য ভারী বৃষ্টির বিশেষ সতর্কতা জারি রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনাপূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে বলেও জানানো হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও আগামী পাঁচ দিন বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

শুক্রবার সকাল থেকেই কলকাতার একাধিক এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। রাতভর বৃষ্টির জেরে বিভিন্ন রাস্তায় জল জমে যাওয়ায় চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। অফিস টাইমে শহরের বহু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। এর মধ্যেই ঘটে যায় একটি উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনা। স্ট্র্যান্ড রোডেস্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার প্রধান কার্যালয়ের সামনে এবং নব মহাকরণের অদূরে রাস্তার ধারে থাকা একটি বিশাল গাছ উপড়ে পড়ে। গাছটি এমন জোরে ভেঙে পড়ে যে রাস্তার রেলিং পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার নীচে চাপা পড়ে যায় একটি পণ্যবাহী গাড়ি। দুর্ঘটনার জেরে ওই এলাকায় সাময়িক ভাবে সমস্ত যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় কলকাতা পুরসভা ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীরা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় গাছ কেটে সরানোর কাজ শুরু হয়। তবে ব্যস্ত সকালে স্ট্র্যান্ড রোডে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

উত্তরবঙ্গেও দুর্যোগের আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে। দার্জিলিংকালিম্পংজলপাইগুড়িকোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ার জেলায় আগামী সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। কোথাও কোথাও ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। শুক্রবার দার্জিলিংজলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারে অতি ভারী বৃষ্টির জন্য কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি কালিম্পংকোচবিহারউত্তর দিনাজপুরদক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। শনিবার থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা।

দার্জিলিংকালিম্পংজলপাইগুড়িকোচবিহারআলিপুরদুয়ার এবং মালদহে ভারী বৃষ্টির হলুদ সতর্কতা জারি থাকবে। অবিরাম বৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকায় টানা বর্ষণের ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি জায়গায় ধসের খবর পাওয়া গিয়েছে। তিস্তা সহ পাহাড়ি নদীগুলির জলস্তরও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিচু এলাকায় জল জমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দা  পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সমুদ্র উপকূলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর ওড়িশা উপকূলবর্তী সমুদ্র এলাকায় ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪৫ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইছে। কোথাও কোথাও সে গতি ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। সমুদ্র উত্তাল হয়ে থাকায় শুক্রবার পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের গভীর সমুদ্রে যেতে নিষেধ করেছে আবহাওয়া দফতর। উপকূলবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়ার এ পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে তাপমাত্রাতেও। শুক্রবার সকালে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসযা স্বাভাবিকের তুলনায় ০.১ ডিগ্রি কম। বৃহস্পতিবার শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসযা স্বাভাবিকের চেয়ে ২.১ ডিগ্রি কম। অন্য একটি পরিমাপে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৭.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতার পরিমাণ সর্বাধিক ৯৭ শতাংশ ও সর্বনিম্ন ৮৩ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবার শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রির আশপাশে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে ঘূর্ণাবর্তসক্রিয় মৌসুমি অক্ষরেখা এবং নিম্নচাপ-সহ একাধিক আবহাওয়াগত ব্যবস্থার প্রভাবে বাংলা জুড়ে বর্ষার শক্তি যেন নতুন করে ফিরে এসেছে। দক্ষিণবঙ্গে জলমগ্ন শহর ও গ্রামাঞ্চলউত্তরবঙ্গে ধসের আশঙ্কাউপকূলে উত্তাল সমুদ্র— সর্বত্রই সতর্কতার বার্তা দিচ্ছে প্রকৃতি। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস যদি মিলে যায়তবে অন্তত আগামী সপ্তাহের শুরু পর্যন্ত বৃষ্টি থেকে রেহাই পাওয়ার আশা কার্যত ক্ষীণ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!