- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ৬, ২০২৬
‘এসআরএফটিআই’-এ ফের পঠনপাঠন বন্ধের নির্দেশ! বরখাস্ত দুই শিক্ষক, নতুন করে শো-কজ় ১১ পড়ুয়াকে
ছাত্র আন্দোলন ঘিরে অচলাবস্থা কাটার কোনো লক্ষণ নেই কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে (এসআরএফটিআই)। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। আন্দোলনের জেরে প্রতিষ্ঠানে পঠনপাঠন বন্ধ রাখার মেয়াদ আরও এক মাস বাড়িয়ে দিল কর্তৃপক্ষ। আগামী ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফিল্ম বিভাগ এবং ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া (ইডিএম) বিভাগের সমস্ত নিয়মিত শিক্ষামূলক কার্যকলাপ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জারি করা নতুন নির্দেশিকায় এই কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধ থাকবে হস্টেল ও মেস পরিষেবা। পড়ুয়াদের ক্যাম্পাস খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে, আন্দোলনকে সমর্থন করার অভিযোগে দুই চুক্তিভিত্তিক শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে দাবি পড়ুয়াদের। এক স্থায়ী শিক্ষককেও শো-কজ় করেছে কর্তৃপক্ষ। নতুন করে ১১ জন পড়ুয়াকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে বলেও সূত্রের খবর। এর আগে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত পঠনপাঠন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তার পরেও আন্দোলন প্রত্যাহার করেননি পড়ুয়ারা। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা, হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, উপাচার্যের পদত্যাগ-সহ একাধিক দাবিতে তাঁদের বিক্ষোভ অব্যাহত। এরকম পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার নতুন নির্দেশিকা জারি করে বন্ধের মেয়াদ আরও বাড়ানো হয়েছে। ফলে অন্তত ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে স্বাভাবিক পঠনপাঠন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত নেই।
প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রার দীপক কুমারের স্বাক্ষরিত নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাজকর্ম বজায় রাখার স্বার্থে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ। ১৬ অক্টোবরের দফতর নির্দেশিকার ধারাবাহিকতায় আগের নির্দেশগুলির মেয়াদ ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে। নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ফিল্ম, ইডিএম বিভাগের সমস্ত নিয়মিত পঠনপাঠন বন্ধ থাকবে। হস্টেলের মেস পরিষেবাও ওই সময় পর্যন্ত চালু হবে না। প্রতিষ্ঠানের চত্বরের মধ্যে থাকা সমস্ত পড়ুয়াকে হস্টেল-সহ অন্যান্য জায়গা খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে জারি করা নির্দেশিকাতেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্যাম্পাসের সমস্ত পরিসর ছেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ বারও সেই নির্দেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তরফে আরও জানানো হয়েছে, নির্দেশ অমান্য করা কিংবা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাজকর্মে ইচ্ছাকৃত বাধা সৃষ্টি করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপও করা হবে। নির্দেশ কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডিন, বিভাগীয় প্রধান, হস্টেলের ওয়ার্ডেন, নিরাপত্তা আধিকারিক সহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মীদের। কোনো পড়ুয়া নির্দেশ অমান্য করলে সেই ঘটনা নথিভুক্ত করে কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথাও বলা হয়েছে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের দাবি, ক্যাম্পাসে হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। ছাত্র সংসদের তরফে আরও দাবি করা হয়েছে, এখনও পর্যন্ত মোট ২৫ জন পড়ুয়াকে শো-কজ় করা হয়েছে, ছ’জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এক জন পড়ুয়ার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে কর্তৃপক্ষ। যদিও এই সমস্ত পদক্ষেপের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য এখনও সামনে আসেনি।
অচলাবস্থার সূত্রপাত ২৭ সেপ্টেম্বর ‘এসআরএফটিআই’য়ের ক্যাম্পাসে একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অনুষ্ঠানটি ছিল ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ’ (আরএসএস)-এর শাখা সংগঠন ‘অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত’ (এবিজিপি)-এর। পড়ুয়াদের অভিযোগ, ওই সংগঠনের সমর্থকেরাই ক্যাম্পাসে ঢুকে তাঁদের উপর হামলা চালান। ঘটনার পরের দিন, ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস বয়কট শুরু করেন পড়ুয়ারা। তাঁদের অভিযোগ, হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ করছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। গত ৪ অক্টোবর ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’-এর সমর্থকেরাও ক্যাম্পাসে জোর করে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। পর পর এই ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
গত ৩১ অক্টোবর সাংবাদিক বৈঠক করে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ২৭ সেপ্টেম্বর এবং ৪ অক্টোবরের ঘটনায় যাঁরা পড়ুয়াদের উপর হামলা চালিয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। অথচ আন্দোলনে অংশ নেওয়া পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হচ্ছে। এ বার সেই বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে শিক্ষক ও পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের দাবি, আন্দোলন চলাকালীন পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানোর কারণেই দুই চুক্তিভিত্তিক শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে। পাঁচ জন রিসোর্স পার্সনের পরিষেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। শুধু তা-ই নয়, এক স্থায়ী শিক্ষককেও একই কারণে শো-কজ় করা হয়েছে বলে দাবি পড়ুয়াদের। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে বৃহস্পতিবার নতুন করে ১১ জন পড়ুয়াকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে বলেও সূত্রের খবর। এর আগেও ছাত্র সংসদের তরফে জানানো হয়েছিল, আন্দোলনকে সমর্থন করার কারণে দুই চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক এবং পাঁচ জন রিসোর্স পার্সনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে ওই দুই শিক্ষকের চুক্তি বাতিল করা হল, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের তরফে বিস্তারিত ব্যাখ্যা মেলেনি।
‘এসআরএফটিআই’য়ের চলমান অচলাবস্থা নিয়ে মুখ খুলেছেন ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ’ (আরএসএস)-এর পূর্ব ক্ষেত্রের প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসু। বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে মন্তব্য করেন তিনি। জিষ্ণু বসু ‘সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজ়িক্স’-এর শিক্ষকও। ছাত্র আন্দোলনের পিছনে বহিরাগতদের ভূমিকা রয়েছে বলে ইঙ্গিত করে তাঁর বক্তব্য, পড়ুয়াদের একাংশকে বাইরে থেকে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। জিষ্ণু বলেন, ‘যাঁরা সুকোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের উস্কানি দেন, সেখান থেকেই তো গোপালচন্দ্র সেনকে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটে। পড়ুয়াদের খুব সামান্য অংশ হয়তো এতে যোগ দেন, কিন্তু বাইরের যাঁরা এই সব পরিচালনা করেন, তাঁরা পাকা মাথার। তাঁরাই তিন-চার জনকে নিয়ে অচলাবস্থা তৈরির চেষ্টা করেন।’
উল্লেখ্য, গোপালচন্দ্র সেন ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য। তাঁর হত্যার প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে বহিরাগতদের ভূমিকার তুলনা টানেন জিষ্ণু। তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে আন্দোলন পরিচালনায় বাইরের কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির ভূমিকা থাকার অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেছেন এসআরএফটিআইয়ের আন্দোলনরত পড়ুয়ারা। তাঁর বক্তব্য, ‘বাইরের গুন্ডা নিয়ে এসে হামলা করলে সমস্যা নেই! আর সে হামলার বিরোধিতায় বৃহত্তর সমাজ সমর্থন করলেই মাথাব্যথা? আন্দোলন পরিচালনা করছেন পড়ুয়ারাই। তাতে বাইরের কারও কোনো হাত নেই।’
এদিকে, দীর্ঘদিন পঠনপাঠন বন্ধ থাকায় পড়ুয়াদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। চলচ্চিত্র নির্মাণ, সম্পাদনা, চিত্রগ্রহণ ও বৈদ্যুতিন মাধ্যমে প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলিতে নিয়মিত ব্যবহারিক ক্লাস, কর্মশালা ও পরিকাঠামোর ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ, পাঠক্রম শেষ করা এবং ভবিষ্যতের পেশাগত পরিকল্পনায়। পড়ুয়াদের একাংশের দাবি, দেশের কোনো কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র আন্দোলনের জেরে এ ভাবে বার বার পঠনপাঠন বন্ধ রাখার ঘটনা নজিরবিহীন। প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য সন্তোষ আজমেরার পদত্যাগও আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি। পড়ুয়াদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ ও দীর্ঘদিন পঠনপাঠন বন্ধ থাকার ফলে তাঁদের কেরিয়ারে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উপাচার্য এ পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেন নি। ফলে, ‘এসআরএফটিআই’য়ে পড়ুয়া ও প্রশাসনের সংঘাত এখন একাধিক স্তরে পৌঁছেছে। আপাতত ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পঠনপাঠন। তার পরে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরবে কি না, তা নির্ভর করছে কর্তৃপক্ষ ও আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের মধ্যে অচলাবস্থা কাটানোর কোনো পথ বেরোয় কি না, তার উপর।
❤ Support Us







