- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬
‘শান্তির পক্ষে, সন্ত্রাসে শূন্য সহনশীলতা’ ইজরায়েলের কনেসেটে জোরালো বার্তা মোদির, পেলেন সর্বোচ্চ সম্মান
তেল আবিব ও জেরুজালেম জুড়ে কূটনীতির এক অভিনব আবহ। আলিঙ্গন, আবেগ, করতালি—তারই মধ্যে সন্ত্রাসবাদ, প্রতিরক্ষা ও ভূ-রাজনীতির কঠোর ও কৌশলগত বার্তা। ইজরায়েল সফরে গিয়ে ফের আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একসঙ্গে উচ্চারণ করলেন সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর বার্তা আর শান্তির আবেদন। ইজরায়েলের সংসদে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি স্পষ্ট জানালেন, ‘ইজরায়েলের মতো ভারতও সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার নীতি নিয়েছে।’ একই সঙ্গে গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পাশে থাকার আশ্বাসও দিলেন তিনি। ভাষণের পরই তাঁকে সম্মানিত করা হয় ইজরায়েলি পার্লামেন্টের সর্বোচ্চ সম্মানে— ‘স্পিকার অফ দ্য নেসেট মেডেল’।
এই মুহূর্তে দু-দিন সফরে ইজরায়েলে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। বুধবার, বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর স্ত্রী সারা নেতানিয়াহু। উষ্ণ আলিঙ্গনে দুই নেতার সাক্ষাৎ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইতিমধ্যেই ‘মোদি হাগ’ নামে পরিচিত। পরে কনেসেটের অধিবেশনেও সেই ব্যক্তিগত সখ্যের উল্লেখ করেন নেতানিয়াহু। তাঁর কথায়, ‘এটা শুধু দুই নেতার সম্পর্ক নয়, দুই জাতির হৃদ্যতার প্রতীক।’ এরপরেই আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ইজরায়েলের সংসদ কনেসেট –এ ভাষণ দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ১৪০ কোটি ভারতবাসীর শুভেচ্ছা ও বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে বক্তব্য শুরু করেন তিনি। নিজেকে ‘এক প্রাচীন সভ্যতার প্রতিনিধি’ বলে উল্লেখ করে আর এক প্রাচীন সভ্যতার সংসদে বক্তব্য রাখাকে বিশেষ সম্মান বলে অভিহিত করেন। স্মরণ করান, ২০১৭ সালে তাঁর প্রথম ইজরায়েল সফরেই দুই দেশের সম্পর্ক ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এর স্তরে উন্নীত হয়েছিল। দুই দেশ বহু দশক ধরেই প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগী। এখন সেই সহযোগিতা যৌথ উৎপাদন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ পর্যন্ত বিস্তৃত। তেল আভিভের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, আরও সংবেদনশীল প্রকল্পে সহযোগিতার ক্ষেত্র খুলতে আগ্রহী তারা। ৯ বছর পর দ্বিতীয় সফরে সে সম্পর্ককে আরও গভীর করার ইঙ্গিত স্পষ্ট। প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে তিনি আখ্যা দেন ‘সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ’ হিসেবে। সূত্রের খবর, সফরকালে ইজরায়েল-নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সংক্রান্ত বড়ো একটি চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে, যদিও সরকারি ভাবে তার বিশদ প্রকাশের সম্ভাবনা কম।
৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রসঙ্গে তিনি গভীর সমবেদনা জানান। মোদি বলেন, ‘আমরা আপনার বেদনা অনুভব করি, আপনার শোক ভাগ করে নিই। ভারত দৃঢ় ভাবে ইজরায়েলের পাশে আছে, এখনো এবং আগামীতেও।’ একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করান ২৬/১১ মুম্বই হামলার কথা, যেখানে ইজরায়েলি নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর বার্তা স্পষ্ট, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। ‘সন্ত্রাস কোথাও হলে তা বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি’ বলেন তিনি। তবে শুধু কঠোর অবস্থান নয়, শান্তির আহ্বানও ছিল তাঁর ভাষণে। গাজা শান্তি উদ্যোগকে সমর্থনের কথা জানিয়ে বলেন, তা ‘ন্যায়সঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অফ পিস’-এর বৈঠকে ভারত ইতিমধ্যেই পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মন্তব্য, ‘শান্তির পথ সব সময় সহজ নয়, কিন্তু সংলাপ, স্থিতিশীলতা ও মানবতার পক্ষে ভারত অটল।’
বাণিজ্য ও অর্থনীতিও এ সফরের গুরুত্বপূর্ণ অক্ষ। ইজরায়েলের অর্থনীতি ও শিল্পমহলের বক্তব্যে উঠে এসেছে, ভারত-ইসরায়েল মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা ‘ফাস্ট ট্র্যাক’-এ। ইজরায়েলের এক মন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা উদ্ভাবনে এগিয়ে, কিন্তু পরিসর ছোটো। ভারত বিশাল বাজার ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে আমাদের স্বাভাবিক অংশীদার।’ ভারতকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন ‘এশিয়ার প্রবেশদ্বার’ হিসেবে। তিনি জানান, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ইতিমধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র বাদ দিয়েই। ভারতের উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে ইজরায়েলের প্রযুক্তি ও কৃত্রিম মেধা খাতে দক্ষতার সমন্বয়কে ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে। জল ব্যবস্থাপনা, কৃষি, সেমিকন্ডাক্টর, আর্থিক প্রযুক্তি— বহু ক্ষেত্রেই সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ইজরায়েলে কর্মরত ভারতীয় কেয়ারগিভার ও দক্ষ কর্মীদের সাহসিকতা ও দায়িত্ববোধের কথাও বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন তিনি, বিশেষত ৭ অক্টোবরের সঙ্কটের সময়ে তাঁদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। ভারতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছে ইজরায়েল। ‘ইন্ডিয়া-মিডলইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক’ করিডোর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। হাইফা বন্দর থেকে ইউরোপমুখী বাণিজ্যপথের সম্ভাবনা, এবং সেই বন্দর আংশিক ভাবে ভারতীয় সংস্থার হাতে যাওয়া—সব মিলিয়ে প্রকল্পটিকে নতুন গতি দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তৃতায়। তিনি বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইহুদি সম্প্রদায় ভারতে নিরাপদে থেকেছে, কোনও নিপীড়ন বা বৈষম্য ছাড়াই—যা ভারতের গর্ব। ইজ়রায়েলের ‘টিক্কুন ওলাম’ দর্শন এবং ভারতের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ ভাবনার মিল তুলে ধরে বলেন, দুই দেশের মানবিক মূল্যবোধের ভিত একসূত্রে বাঁধা। ভাষণ শেষে কনেসেটের স্পিকার আমির ওহানা মোদির হাতে তুলে দেন ‘স্পিকার অফ দ্য নেসেট মেডেল’। ইজ়রায়েলি পার্লামেন্টের সর্বোচ্চ সম্মান এই পদক। ভারত-ইজ়রায়েল কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে তাঁর ব্যতিক্রমী অবদানের স্বীকৃতিতেই এই সম্মান জানানো হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রতিক্রিয়ায় মোদী বলেন, ‘এই সম্মান কোনও ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়, ভারত ও ইজ়রায়েলের স্থায়ী বন্ধুত্বের প্রতীক।’
উল্লেখযোগ্য, ২০১৮ সালে তিনি প্যালেস্টাইনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গ্র্যান্ড কলার অফ দ্য স্টেট অফ প্যালেস্টাইন’ও পেয়েছিলেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুই যুযুধান পক্ষের কাছ থেকেই সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পাওয়া বিরল কূটনৈতিক অবস্থানেই রয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে রয়েছে ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জোগের সঙ্গে বৈঠক এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা। বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, সে বৈঠকেও গাজা পরিস্থিতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে।
❤ Support Us





