- দে । শ
- জানুয়ারি ৭, ২০২৫
যাত্রার রূপকারের গ্রামে জেলা যাত্রা উৎসব
মতিলাল রায়ের হাত ধরে সনাতন ছক ভেঙে আধুনিকতা অর্জন করেছিল যাত্রাপালা রচনা। সেই মতিলাল রায়ের জন্মভিটে নাদনঘাটের জাহাননগর পঞ্চায়েতের রাজাপুর-ভাতশালা গ্রামে শুরু হল পূর্ব বর্ধমান জেলা আদিবাসী সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি ও যাত্রা উৎসব। পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পূর্বস্থলী ১নং ব্লকের সহযোগিতায় তিনদিনের এই উৎসবের আয়োজক পশ্চিমবঙ্গ যাত্রা অ্যাকাডেমি। গ্রামের ধীরেন্দ্রনাথ বিদ্যাপীঠ লাগোয়া মাঠে উৎসবের উদ্বোধন করলেন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ। ছিলেন সাংসদ ডাঃ শর্মিলা সরকার, জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক রামশঙ্কর মণ্ডল, জেলা পরিষদের সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহার, বিধায়ক তপন চ্যাটার্জি প্রমুখ। তিন দিনের উৎসবে তিনশর বেশি লোকশিল্পী যোগ দেবেন। উৎসব ময়দানে রয়েছে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের স্টল। প্রথম দিন যাত্রাপালায় শিক্ষক ও দ্বিতীয় দিনে কৃষ্ণের ভূমিকায় অভিনয় করে তারিফ কুড়োলেন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ।
বিস্মৃতির গর্ভ থেকে মতিলালকে জনসমক্ষে নিয়ে আসার কৃতিত্ব এলাকার বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথেরই। তাঁরই উদ্যোগে মতিলাল রায়ের স্মৃতিরক্ষায় স্থায়ী যাত্রামঞ্চ তৈরি হয়েছে ভাতশালা গ্রামে। স্বপনবাবুর কথায়, ‘একসময় যাত্রাপালা ছিল একঘেয়ে। মানুষ তেমন বিনোদন পেতেন না। মতিলাল যাত্রাপালা রচনার ভোল বদলে দিয়েছিলেন। তিনি শুধু দক্ষ পালাকারই ছিলেন না, ছিলেন অভিনেতা, সুরকার, গীতিকার ও বলিষ্ঠ পরিচালক। তাঁর জন্মভিটেয় যাত্রা উৎসবের আয়োজন করে রাজ্য যাত্রা অ্যাকাডেমি যথার্থ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করল মতিলালকে।’ উৎসবকে সফল করার লক্ষ্যে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রও হয়।
স্বপনবাবুর উদ্যোগেই গ্রামে বসেছে মতিলালের আবক্ষ মূর্তি। এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ১২৪৯ বঙ্গাব্দের ২১ মাঘ গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম মতিলালের। বাবা মনোহর রায়, মা কাশীশ্বরী দেবী। সংসারের অর্থকষ্ট দূর করতে কলকাতায় গিয়ে কেরানির কাজ নেন মতিলাল। কিন্তু মাথায় যে যাত্রার পোকা। তাই সবকিছু ছেড়েছুড়ে যাত্রাপালা লেখা শুরু করেন মতিলাল। পালা মঞ্চস্থ করার জন্য মতিলাল ১৮৭৩ সালে ‘নবদ্বীপ বঙ্গ গীতাভিনয় সম্প্রদায়’ নামে একটি যাত্রাদল প্রতিষ্ঠা করেন। নবদ্বীপ পোড়ামাতলায় প্রথম যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হওয়ার পর থেকেই পালার সুনাম ছড়াতে থাকে। তরণীসেন বধ, সীতাহরণ, রামের বনবাস, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, ভীষ্মের শরশয্যা, নরকাসুর বধ, একটার পর একটা যাত্রাপালা রচনা ও মঞ্চস্থ করতে থাকেন মতিলাল। সবমিলিয়ে ৪০টি যাত্রাপালা রচনা করেছিলেন মতিলাল। তবে সবথেকে জনপ্রিয়তা হয় ‘বিজয় বসন্ত’ পালাটির। এমনকী তাঁর রচিত ‘সঙ্গীত সংকলন গীতাবলি’ খুবই সমাদৃত হয়েছিল। তাঁর যাত্রাপালার গুণমুগ্ধ ছিলেন কেশবচন্দ্র সেন। ১৮৮০ সালের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার খবরে লেখা হয়, কেশবচন্দ্র সেনের অনুরোধে মতিলাল রায় ‘নিমাই সন্ন্যাস’ পালাটি রচনা করেন। ১৩১৫ বঙ্গাব্দের ৪ পৌষ প্রয়াত হন মতিলাল। তাঁকে অমর করে রাখতে রাজ্য প্রশাসন, যাত্রা অ্যাকাডেমি বা স্বপনবাবু যেভাবে ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণ করছেন, তাকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন মতিলালের পরিবার ও এলাকাবাসী।
❤ Support Us







