- এই মুহূর্তে দে । শ
- জানুয়ারি ১৬, ২০২৬
চরম সংকটে ঐতিহ্যবাহী হিন্দু স্কুল! নেই শিক্ষক, ক্লাসরুমের বেহাল দশা, বিক্ষোভ বাম ছাত্র সংগঠন ও অভিভাবকদের
রাজ্যের এক অন্যতম প্রাচীন সরকারি স্কুল, ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী হিন্দু স্কুলে শিক্ষক সংকট চরমে পৌঁছেছে। স্কুলের দিবা বিভাগের তিনটি সেকশনে যেখানে ৪৬ জন শিক্ষক থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে ১৮টিরও বেশি পদ শূন্য। ইংরেজি, অর্থনীতি ও রসায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য একমাত্র শিক্ষক থাকায় ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব ক্লাসকে একাই নিতে হচ্ছে। অঙ্কের জন্যও শিক্ষক সংকট রয়েছে। শরীরচর্চার কোনো শিক্ষক নেই। ফলে শিক্ষকের অভাবে পড়ুয়াদের ক্লাস একসাথে চালাতে হচ্ছে, এবং অনেক সময় গ্রন্থাগারিককেই পাঠদান সামলাতে হচ্ছে। এমন অবস্থা তুলে ধরে, শুক্রবার ‘ঐতিহ্যবাহী হিন্দু স্কুল বাঁচাও’ এই ব্যানারে স্কুল চত্বরে প্রতিবাদে সামিল বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এসএফআই। বিক্ষোভে যোগ দেন স্কুলের পড়ুয়া, তাদের অভিভাবকরা ও স্কুলের প্রাক্তনী শিক্ষার্থীরাও।
অভিভাবকরা জানান, ‘শিক্ষকের এই অভাবে নিয়মিত ক্লাস হওয়া অসম্ভব। স্কুলের বহু বিষয়ের পড়াশোনা বন্ধের পথে। বারবার সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’ স্কুল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, অঙ্ক বিভাগের ৫ জন শিক্ষক থেকে সম্প্রতি একজন অবসর নিয়েছেন। বাকি ৪ জনের মধ্যে ২ জনকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। ইংরেজি বিভাগের একমাত্র শিক্ষকের পক্ষে সবকটি ক্লাস নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এসএফআই-এর দাবি, রাজ্যের অন্যান্য সরকারি স্কুলের মতো হিন্দু স্কুলেও শিক্ষক-সংকট ভয়াবহ আকারে পৌঁছেছে। অবিলম্বে শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। বদলির নির্দেশ প্রত্যাহার না হলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।’ সংগঠনের অভিযোগ, শিক্ষক সংকটের কারণে পড়ুয়াদের নিয়মিত ও মানসম্মত পড়াশোনা কাঠামো ভেঙে পড়ছে এবং অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে আগ্রহ হারাচ্ছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহুবার সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে, কিন্তু এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি পরিকাঠামোগত সংস্কারেরও দাবি তুলছে সংগঠনটি।
এই পরিস্থিতিতে বুধবার বিদ্যালয়ের বর্তমান পড়ুয়া ও অভিভাবকদের একাংশ বিকাশভবনে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। শিক্ষামন্ত্রী অনুপস্থিত থাকায় তার আপ্ত সহকারী এবং একজন সরকারি কর্মকর্তা সেই স্মারকলিপি গ্রহণ করেন। অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকার সমস্যার গুরুত্ব বুঝছেন না। এরপরই পুনরায় বইপাড়া চত্বরে আন্দোলনে নামে এসএফআই। রাস্তা অবরোধ করে চলে স্লোগান। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ এবং বদলির নির্দেশ প্রত্যাহার না হলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।’
দেশের অন্যতম পুরনো, বাংলার গর্ব হিন্দু স্কুলের ইতিহাস দীর্ঘ, বিস্তৃত। ১৮১৭ সালের ২০ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলটি কলকাতার আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। স্কুলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জুড়ে আছে রাজা রামমোহন রায়ের নাম। প্রথমে এর নাম ছিল ‘হিন্দু কলেজ’। রাজা রাধাকান্ত দেব, রামকমল সেন ও প্রসন্ন ঠাকুরের উদ্যোগে গড়ে তোলা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে ‘প্রাচ্যের ইটন’ নামে খ্যাতি পায়। ১৮২৬ সালে হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও মাত্র ১৭ বছর বয়সে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। স্কুলের ছাত্ররা মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগতভাবে সমৃদ্ধ হয়। ১৮৫৩ সালের ২১ অক্টোবর বাংলা, বিহার ও ওড়িশার গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি কলকাতায় সব ধর্মের ছাত্রদের জন্য একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। সেই কলেজের নাম রাখা হয় ‘দ্য প্রেসিডেন্সি কলেজ’। এর ফলে হিন্দু কলেজের সকল ছাত্রকে প্রেসিডেন্সি কলেজে স্থানান্তর করা হয়। বাংলার সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত জাগরণের ইতিহাসে এই কলেজ এবং এর ছাত্রদের অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু কলেজের বিশিষ্ট ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন রামতনু লাহিড়ি, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রাধানাথ শিকদার, প্যারিচাঁদ মিত্র, শিবচন্দ্র দেব, রামগোপাল ঘোষ, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রসিক কৃষ্ণ মল্লিক প্রমুখ। বর্তমানে হিন্দু স্কুল প্রায় ১৮০০ পড়ুয়া পড়ায়। প্রাতঃ ও দিবা বিভাগের সকল শ্রেণি মিলিয়ে নিয়মিত ক্লাস চালানোর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। অভিভাবকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী হিন্দু স্কুলের গৌরব এখন ঝুঁকির মুখে। সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ধ্বংসের পথে চলে যাবে।’
❤ Support Us







