- এই মুহূর্তে দে । শ
- মার্চ ৩, ২০২৫
হাওড়ার ঘিঞ্জি বস্তিতে ঠাঁই সম্রাট বাহাদুর শাহের প্রপৌত্রীর। মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ বেগমের কন্ঠে, স্থায়ী আবাসের আর্জি
কলকাতার শহরতলি হাওড়ার ঘিঞ্জি বস্তি। একচিলতে আকাশ। তারই মাঝে ভাড়ার পায়রা খোপের ঘরে ঢোকে না আলো, ঢোকে না বাতাস। সে বস্তিতেই পরিবার নিয়ে দিন গুজরান করেন মুঘল বংশের শেষ ‘বেগম’। ভারতের ইতিহাসে মুঘল অধ্যায়, পরাক্রম আর বীরত্বের ইতিহাস, জৌলুশ আর বৈভবের ইতিহাস, স্থাপত্য আর সৌধের ইতিহাস। বিতর্কিত বিশালতার ইতিহাস। সেই বংশের বেগমের জীবন অন্ধকারময়, দারিদ্র্য আর খিদের। ভারতের শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ৬০ বছর বয়সী প্রপৌত্রী সুলতানা বেগম বেঁচে থাকার জন্য করছেন কঠিন সংগ্রাম। বিলাসিতা এবং ঐশ্বর্য থেকে অনেক দূরে তিনি। তাঁর রাজকীয় পূর্বপুরুষরা কোনোদিন কি ভেবেছিলেন, সুলতানার জীবন এমন নিদারুণ কষ্টের হবে ? না বোধহয়।
রাজকীয় ঐতিহ্য, গৌরবময় তাঁর বংশ পরিচয়, ভারতের শাসন ব্যবস্থার ইতিহাসে পুর্বপুরুষদের মহিমান্বিত উপস্থিতি। তবু উত্তরাধীকারের নেই নূন্যতম সান্তনা। মুঘল রাজবংশের সরাসরি বংশধর হওয়া সত্ত্বেও, সুলতানা কলকাতার একটি বস্তি এলাকায় কুঁড়েঘরে থাকেন। প্রতিবেশীদের সাথে রান্নাঘর ভাগাভাগি করেন, রাস্তার পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করেন। তাঁর আজকের অস্তিত্ব, তাঁর পূর্বপুরুষদের বিলাসবহুল জীবনের থেকে বহু দূর, বাতাসে ফিসফাস ওঠে ‘দিল্লি অনেক দূর!’ অভাব আছে, তা নিয়ে ক্ষোভও আছে। তবু তার চেয়ে বেশি আছে সুলতালানার অহঙ্কার। শুধু সম্রাট হিসাবে নয়, কবি এবং সংস্কৃতি অনুরাগী হিসাবেও সুনাম ছিল বাহাদুর শাহের। ধর্মের সংকীর্ণ গন্ডি ছাপিয়ে তাঁর বিশাল দিগন্তের মাঠ। লাল কেল্লার সামনের মাঠে বিজয়া দশমীর রামলীলা সূচনাও তাঁর হাত ধরেই। এসব নিয়ে গর্ব আছে, অংকারের চিত্রও ফুটে ওঠে সুলতানার কথায়, শোনা যায় —’তখন তিনি ইংরেজদের কথা শুনলে এখন বস্তির বদলে আমরা হয় তো প্রাসাদেই থেকে যেতাম। অনেকেই তা করেছিল। কিন্তু বাহাদুর শাহ অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করেননি। তাই আমাদের কেউ গদ্দারের বংশ বলতে পারবে না। তাই এখনো আমরা সম্মান পাই।
সালটা ১৮৫৭। মহাবিদ্রোহ দমনের পর, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার নিয়েছেন ইংল্যাণ্ডের রানি। মুঘল সাম্রাজ্য তখন অস্তমিত প্রায়। টিমটিম করে জ্বলে থাকা শেষ প্রদীপ বাহাদুর শাহ জাফরকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ আসে। তাঁর সাথে সমাপ্ত হয় মুঘলদের দীর্ঘ শাসনের কাল। শাহ জাফর তখন সহায় সম্বলহীন সুলতান। কোনোকিছুই নেই তাঁর। মহাবিদ্রোহের পর দিল্লির হুমায়ুনের স্মৃতিসৌধ থেকে বাহাদুর শাহকে বন্দি করা হয়। বিচারের শেষে নির্বাসনের সাজা ঘোষণা হতেই গরুর গাড়িতে চাপিয়ে বাদশাহ আর তাঁর পরিবারের কয়েক জনকে রেঙ্গুনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নয়াদিল্লি থেকে অনেক দূরে রেঙ্গুনে ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হয় শেষ মোগল সম্রাটের। বাহাদুর শাহের পুত্র ছিলেন জওঁয়া বখ্ত। পৌত্র জামশেদ বখ্ত আর প্রপৌত্র মির্জা মহম্মদ বেদার বখ্ত। পরবর্তীকালে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে বাংলায় আশ্রয় নেন বেদার বখ্ত। বাহাদুর শাহের শেষ বংশধর বেদার বখ্তের স্ত্রী সুলতানা বেগম। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের থেকে ‘সুলতানা’ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। মাসে ৬ হাজার টাকা ভাতা পান, যা দিয়ে বাদশাহী জীবন তো দূর ভদ্রস্থ জীবন কাটানোও মুশকিল। স্বামীর মৃত্যুর পরে কখনও চুড়ি তৈরির কারখানায়, কখনও দিনমজুর হিসাবে, কখনও চায়ের দোকানেও কাজ করেছেন। লাল কেল্লার অংশীদারি দাবি করে মামলা করেছেন সুপ্রিমকোর্টে। হাঁটুর ব্যথায় কষ্ট পান, চিকিৎসার জন্যও অর্থের দরকার তাঁর।
১৯৮০ তে সুলতানার জীবন আরো করুণ, আরো বেদনার দিকে মোড় নেয়। মারা যান তাঁর স্বামী, প্রিন্স মির্জা মহম্মদ বেদার বখ্ত। সুলতানার জীবনে নেমে আসে চরম দারিদ্র্য। পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সামাজিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে শুরু হয় তাঁর জীবন সংগ্রাম। পাঁচ কন্যা এবং এক পুত্রকে নিয়ে বিশাল সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সৌখিনতা বাহুল্যমাত্র। পেনশনের অল্প টাকায় কোনোরকমে দিন গুজরান। আবাসনের জন্য বারবার আবেদন করেও মেলেনি সাড়া, তাই বস্তি মহল্লাতেই এখন তাঁদের ক্ষুদ্র, সংকীর্ণ, হতদরিদ্র ‘ভাড়ার কেল্লা’। সুলতানার পরিবারের কিছু সদস্য অবশ্য কর্মসংস্থানের ব্যাপারে যথেষ্ট ভাগ্যবান। তাঁর নাতনি, রওশনারাকে সরকারি চাকরি দেওয়া হয়েছিল, যদিও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কাজ খুঁজে পাননি। সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। ছোটো চায়ের দোকান চালিয়েছেন বহুদিন, মহিলাদের পোশাক তৈরির কাজ করেছেন —তবু দারিদ্র্য ঘোঁচেনি।
কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও, সুলতানা তাঁর ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত। গর্ব আরা হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে তিনি শোনান, কিভাবে তাঁর প্রয়াত স্বামী মহম্মদ বেদার বখ্ত প্রায়শই তাঁকে মনে করিয়ে দিতেন অতীত দিনের গৌরবময় সময়ের উপাখ্যান, রাজকীয় রক্তের তেজ। ভিক্ষা নয়, পরিবার যা প্রাপ্য তাই ফেরত পেতে চান নবাবী, বেগম সুলতানা। অতীত ও বর্তমানের মিলিত ভাবের কথা যখন শোনা যাচ্ছে ভারতীয় রাজনীতির আনাচে-কানাচে, তখন মুঘল খানদানের উত্তরাধিকারের কেন এমন মৃতপ্রায় দশা ! এও রাজনীতির ধারা। তবু সাম্প্রতিক সময়ে মানবাধিকার কর্মী আর পরিচালক সৌম্য সেনগুপ্তের দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর ও তাঁর বংশধরদের নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের সুবাদে ভারতের রাজকীয় বংশধরদের দুর্দশার কথা জনসম্মুখে উঠে এসেছে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পরে ‘হিন্দুস্থানের স্বাধীন বাদশাহ’র খেতাব দেওয়া হয় শাহ জাফরকে, কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকারীদের কথা কে মনে রাখে !
❤ Support Us






