Advertisement
  • দে । শ
  • মে ২৩, ২০২৬

‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবে অস্বাভাবিক উষ্ণতা, ভারতে খরা পরিস্থিতির সম্ভাবনা! কী প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার ?   

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবে অস্বাভাবিক উষ্ণতা, ভারতে খরা পরিস্থিতির সম্ভাবনা! কী প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার ?   

প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে ক্রমশ জোরদার হচ্ছে এক অস্বাভাবিক উষ্ণ জলপ্রবাহের সঞ্চালন, যা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াবিদদের মধ্যে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এ প্রবণতা চলতি বছরেই রূপ নিতে পারে এক শক্তিশালী, এমনকি ‘সুপার এল নিনো’-তে, যার প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে খরা, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

 

মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা ‘নোয়া’-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এই বৃদ্ধি ‘এল নিনো’ গঠনের প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত বদলালে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। আশঙ্কার কেন্দ্রে রয়েছে ‘কেলভিন ওয়েভ’ নামে পরিচিত এক বিশাল উষ্ণ জলপ্রবাহ, যা প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর অংশ দিয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিছু অঞ্চলে ইতিমধ্যেই সমুদ্রজলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়েছে, যা আবহাওয়াগত ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

বিজ্ঞানীদের মতে, ১৮৫০ সালের পর থেকে মাত্র ছয়বার এমন ‘সুপার এল নিনো’-সদৃশ পরিস্থিতি দেখা গেছে। সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫–১৬ সালের ‘এল নিনো’ ছিল অন্যতম শক্তিশালী, তবে তার আগে ১৯৯৭–৯৮, ১৯৮২–৮৩ এবং ১৯৭২–৭৩ সালের ঘটনাগুলিও ছিল ভয়াবহ মাত্রার।  প্রতিটি ঘটনাই বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার চরম অস্থিরতা তৈরি করেছিল। ১৯৯৭–৯৮ সালের ‘এল নিনো’-র সময় বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ছিল ১৮৭৭–৭৮ সালের এল নিনো, যার অভিঘাতে সৃষ্ট ভয়াবহ খরা ও দুর্ভিক্ষে বিশ্বের প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ আনুমানিক ৩ থেকে ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় আরও জটিল, কারণ এখন বিশ্ব মহাসাগর আগের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ। অতিরিক্ত উষ্ণতার অন্যতম উৎস হিসেবে ধরা হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার পূর্বদিকে অবস্থিত ‘ওয়েস্ট প্যাসিফিক ওয়ার্ম পুল’ অঞ্চলকে, যা পৃথিবীর অন্যতম উষ্ণ সমুদ্রাঞ্চল। ‘ট্রেড উইন্ড’-এর স্বাভাবিক প্রবাহে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল উষ্ণ জল সঞ্চিত হচ্ছে। ফলে, এখন বাতাসের প্রবাহে পরিবর্তন ঘটলে, বিশেষ করে ‘ট্রেড উইন্ড’ দুর্বল হয়ে ‘ওয়েস্টার্লি উইন্ড বার্স্ট’-এ রূপ নিলে, এই উষ্ণ জল পূর্বদিকে সরে যায় এবং সমুদ্রের গভীর স্তর দিয়ে ‘কেলভিন ওয়েভ’ তৈরি হয়। এই ঢেউ কয়েক মাস ধরে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে পৌঁছালে ঠান্ডা গভীর জল ওপরে ওঠার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলস্বরূপ, প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠ অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে শক্তিশালী ‘এল নিনো’-র জন্ম দেয়।

 

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এ প্রক্রিয়া শুরু হলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের স্বাভাবিক বজ্রঝড় পূর্বদিকে সরে যেতে পারে, যার ফলে বৈশ্বিক বায়ুচাপ ও বায়ুপ্রবাহের ভারসাম্যে বড়ো ধরনের পরিবর্তন ঘটবে। আর সে পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, সৃষ্টি করতে পারে তীব্র খরা, অতিবৃষ্টি আর ঘন ঘন তাপপ্রবাহ। ভারতের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগের, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ বর্ষা নির্ভর করে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর উপর। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, ২০২৬ সালের বর্ষায় ‘এল নিনো’-র প্রভাব মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করতে পারে। আইএমডি-র প্রাথমিক দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে বর্ষার বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে, প্রায় ৯২ শতাংশের আশেপাশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

১৯৭১ থেকে ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারতের গড় মৌসুমি বৃষ্টিপাত প্রায় ৮৭০ মিলিমিটার। সে তুলনায় এবার বৃষ্টির ঘাটতির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আবহাওয়া দফতরের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, স্বাভাবিকের ৯০ শতাংশের নিচে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৩৫ শতাংশ, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌসুমের শুরুতে জুন মাস তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে, তবে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের দিকে ‘এল নিনো’-র প্রভাব বাড়লে দেশের বিস্তীর্ণ অংশে বৃষ্টির ঘাটতি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য ভারতের একাধিক রাজ্য, যার মধ্যে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশের একাধিক অঞ্চল যেমন ইন্দোর, উজ্জয়িনী, গোয়ালিয়র, জবলপুর, রেওয়া, সাগর ও নর্মদাপুরম উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে লাদাখ, উত্তর-পূর্ব ভারত, তেলেঙ্গানা এবং কিছু দক্ষিণাঞ্চল তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হতে পারে। তবে দক্ষিণ ভারতের উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে চেন্নাই, অতিবৃষ্টির ঝুঁকিতে থাকতে পারে, যার ফলে বন্যা ও জলজটের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

ভারতের জন্য এ ধরণের সংকট নতুন নয়। ২০১৫–১৬ সালের শক্তিশালী ‘এল নিনো’-র সময় বর্ষার বৃষ্টিপাত নেমে এসেছিল দীর্ঘমেয়াদি গড়ের মাত্র ৮৬ শতাংশে, যার ফলে বহু রাজ্যে খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। আবার ২০২৩ সালের এল নিনো বছরে আগস্ট মাসেই দেশে প্রায় ৩৬ শতাংশ বৃষ্টির ঘাটতি দেখা গিয়েছিল। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ইতিমধ্যেই টানা ৫ বছর ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের ধারা বজায় রেখেছে। ২০২৪–২৫ সালে এই অঞ্চলে গত ১২৫ বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন বর্ষা রেকর্ড হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে চা উৎপাদন, কৃষি, জলসম্পদ এবং গ্রামীণ জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা।

 

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এর প্রভাব গভীর হতে পারে। দেশের কৃষিজমির বড়ো অংশ এখনো বৃষ্টিনির্ভর হওয়ায় ধান, ডাল, আখ ও তৈলবীজের উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি-র জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এস এন মিশ্র জানিয়েছেন, ভারতের কৃষি ব্যবস্থার বেশিরভাগ অংশ এখনো বর্ষার বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় ‘সুপার এল নিনো’-র পরিস্থিতি কৃষিক্ষেত্রকে অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ফসল উৎপাদন কমে গেলে শুধু কৃষিই নয়, বরং খাদ্য মূল্যস্ফীতি, সেচ নির্ভরতা এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। জলাধার কম পূর্ণ থাকলে রবি মরশুমের উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার উপর পড়বে। মনে রাখা দরকার, ‘এল নিনো’-র প্রভাব শুধু বৃষ্টিপাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাবে ব্যাপক হারে তাপমাত্রা বেড়ে যায়, ফলে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয়, ফলে বিদ্যুৎ গ্রিডের উপর চাপ বাড়ে। একই সময়ে জলাধারের স্তর কমে যাওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হয়, শক্তি ব্যবস্থায় একযোগে চাপ সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, ‘এল নিনো’-কে শুধু বৃষ্টির ঘাটতি হিসেবে দেখলে মারাত্মক ভুল হবে, বৃষ্টির অসম বণ্টনে কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ খরা—এই চরম বৈপরীত্য কৃষি ও অর্থনীতিকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

 

যদিও, আসন্ন মরসুমে ‘এল নিনো’-র চোখরাঙানি সামলাতে কৃষি মন্ত্রক পুরোপুরি প্রস্তুত বলে দাবি করছে কেন্দ্র। সরকার জানিয়েছে,  খরিফ চাষের ক্ষতি রুখতে সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি সেরে রাখা হয়েছে। জলাধারগুলিতে পর্যাপ্ত জল মজুত রাখা থেকে শুরু করে বিকল্প চাষের রূপরেখা— কৃষকদের সুরক্ষায় একাধিক বড় পদক্ষেপ করছে প্রশাসন। পশুপালনের ক্ষেত্রের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্যগুলির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় যাতে কৃষকদের মাথায় হাত না পড়ে, তার জন্য সব রকম প্রযুক্তিগত ও পরিকাঠামো গত সাহায্য মজুত রাখা হচ্ছে।’ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মূলত ৪টি স্তরে ‘এল নিনো’ প্রতিরোধী দেওয়াল গড়া হচ্ছে: প্রথমত, দেশের  প্রধান জলাধারগুলিতে জলের পরিমাণ সন্তোষজনক থাকায় সেচ ব্যবস্থার বড়ো কোনো সমস্যা হবে না। দ্বিতীয়ত, খরাপ্রবণ এলাকার জন্য কম জলে ফলন সম্ভব এমন বিশেষ জাতের বীজ ও আধুনিক বপন যন্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। তৃতীয়, অতিরিক্ত গরমের হাত থেকে গবাদি পশুদের বাঁচাতে এবং পশুখাদ্যের জোগান স্বাভাবিক রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট দফতরকে আর সর্বোপরি রাজ্যস্তরে বিপর্যয় মোকাবিলা দল ও কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলিকে সতর্ক রাখা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিকভাবে এল নিনোর প্রভাব বিস্তৃত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলে সাধারণত খরা দেখা দেয়, অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকা ও পূর্ব আফ্রিকায় অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ে। ফলে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলও এর প্রভাবে অস্থির হয়ে ওঠে। যদিও জলবায়ু বিজ্ঞানীদের একাংশ সতর্ক করছেন যে, এখনই এ ঘটনাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা সময়ের আগে সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন যে সম্ভাব্য চরম আবহাওয়ার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা নিয়ে মতভেদ নেই।  কারণ, ‘এল নিনো’ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিয়ন্ত্রিত, যার প্রধান কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের চরম আবহাওয়াগত ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!