Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • মে ২৩, ২০২৬

নজরে সরকারি স্কুল, বিকাশ ভবনে ম্যারাথন বৈঠক। বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত

‘বন্দে মাতরম’ থেকে ব্যাগের ওজন, হোমওয়ার্ক, থেকে পরিচালন সমিতিতে ভোট : স্কুল শিক্ষায় একাধিক বদলের পথে রাজ্য সরকার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নজরে সরকারি স্কুল, বিকাশ ভবনে ম্যারাথন বৈঠক। বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত

গরমের ছুটি এখনো ফুরোয়নি। রাজ্যের সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে তালা ঝুলছে প্রায় গোটা মে মাস জুড়েই। ছুটির আবহের মধ্যেই বিকাশ ভবনে শুরু হয়ে গিয়েছে তৎপরতা। প্রশাসনিক স্তরে একের পর এক বৈঠক, নির্দেশিকা আর নয়া নীতির মাধ্যমে রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যত নতুন করে সাজানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে স্কুলশিক্ষা দফতর। আগামী ২৮ এবং ২৯ মে সব জেলার স্কুল পরিদর্শকদের নিয়ে ডাকা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পর্যালোচনামূলক বৈঠক। একই সঙ্গে স্কুল পরিচালন সমিতির কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন, পড়ুয়াদের ব্যাগের ওজন নিয়ন্ত্রণ, হোমওয়ার্কে কড়াকড়ি, এমনকি স্কুলের ভিতরে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর মতো একাধিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত মিলেছে দফতরের অন্দরে।

 

শুক্রবার বিকাশ ভবনের স্কুলশিক্ষা ডিরেক্টরেটের পক্ষ থেকে জারি হওয়া জরুরি নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, এ বৈঠক সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল মাধ্যমে হবে। গুগল মিটের লিঙ্ক অথবা কিউআর কোড স্ক্যান করে রাজ্যের সমস্ত জেলার প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার জেলা স্কুল পরিদর্শকদের বৈঠকে যোগ দিতে বলা হয়েছে। পরিবর্তিত সূচি মেনে এই বৈঠক আয়োজনের কথা উল্লেখ রয়েছে কমিশনারের নির্দেশিকায়। ইতিমধ্যেই সে নির্দেশ জেলার জেলাশাসক এবং স্কুলশিক্ষা দফতরের অতিরিক্ত মুখ্য সচিবের দফতরেও পাঠানো হয়েছে।

বিকাশ ভবন সূত্রে খবর, এই দু-দিনের বৈঠক নিছক নিয়মরক্ষার প্রশাসনিক বৈঠক নয়। বরং নতুন সরকারের অধীনে স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপরেখা কী হবে, তারই বিস্তৃত খসড়া তৈরি হতে চলেছে এ আলোচনায়। মোট ৯টি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা নির্ধারণ করা হয়েছে। তার মধ্যে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক— দু-দিক থেকেই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে  বিদ্যালয়গুলিতে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার সূচনা করার বিষয়টিকে। শিক্ষা দফতরের একাংশের মতে, জাতীয়তাবোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার বার্তা দিতেই এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

 

তবে শুধু এই একটি বিষয় নয়, গরমের ছুটির পরে স্কুল পুনরায় খোলা এবং তার প্রস্তুতিও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। রাজ্যে ১১ মে থেকে শুরু হওয়া গরমের ছুটি এ বার ৩১ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নতুন বিজেপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে বলে সরকারি মহলের দাবি। ফলে ১ জুন থেকে স্কুল খুললে কী ভাবে পঠনপাঠন স্বাভাবিক করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা হবে। একই সঙ্গে সরকারি স্তরে ‘অস্টেরিটি মেজার’ বা কৃচ্ছ্রসাধন নীতির বাস্তবায়ন নিয়েও আলোচনা হবে। শিক্ষা দফতরের বিভিন্ন প্রকল্পে খরচ নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক ব্যয় কমানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে জেলা স্তরের আধিকারিকদের মতামত নেওয়া হতে পারে বলে সূত্রের খবর।

 

এ ছাড়া আইসিটি ও আধার সংক্রান্ত সমস্যা নিয়েও বিস্তর অভিযোগ জমা পড়েছে বিভিন্ন জেলা থেকে। ছাত্রছাত্রীদের তথ্য আপলোড, আধার সংযুক্তিকরণ, ডিজিটাল পোর্টাল সংক্রান্ত জটিলতা এবং পরিকাঠামোগত সমস্যাগুলি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারি পাঠ্যপুস্তক বণ্টনের কাজ কতদূর এগিয়েছে, কোথাও কোনও ঘাটতি রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ‘র‌্যাশনালাইজেশন’ বা যুক্তিযুক্তকরণের বিষয়টিও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। কোন স্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন, কোথায় শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে— তা নতুন করে পর্যালোচনা করে রদবদলের পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা পেনশন সংক্রান্ত মামলা ও মানবিক কারণে চাকরির আবেদনগুলির নিষ্পত্তির বিষয়েও জেলা স্কুল পরিদর্শকদের কাছ থেকে রিপোর্ট তলব করা হতে পারে। ১০০ পয়েন্ট রোস্টার নিয়েও প্রশাসনিক স্তরে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানা গিয়েছে।

 

সব জেলার আধিকারিকদের সুবিধার জন্য ভৌগোলিক ভিত্তিতে বৈঠকের সূচি ভাগ করা হয়েছে। ২৮ মে দুপুর ১২টায় উত্তরবঙ্গ এবং সংলগ্ন জেলার ডিআইদের নিয়ে প্রথম দফার বৈঠক হবে। আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, কালিম্পং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ— জেলাগুলি তালিকায় রয়েছে। ২৯ মে দুপুর ১২টায় দক্ষিণবঙ্গ ও কলকাতা সংলগ্ন জেলার আধিকারিকদের নিয়ে দ্বিতীয় দফার বৈঠক হবে। নদিয়া, বাঁকুড়া, ব্যারাকপুর, বীরভূম, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলি, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং কলকাতার আধিকারিকেরা ওই বৈঠকে অংশ নেবেন।

 

তবে প্রশাসনিক বৈঠকের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয়েছে স্কুল পরিচালন সমিতি নিয়ে শিক্ষা দফতরের নতুন ভাবনাকে কেন্দ্র করে। ইতিমধ্যেই বিকাশ ভবনের তরফে নির্দেশ জারি করে স্পনসরড স্কুলগুলির পরিচালন সমিতিতে সরকার মনোনীত সভাপতি এবং সদস্যদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষা দফতরের বক্তব্য, স্কুল প্রশাসনের কাজ যাতে ব্যাহত না হয়, তার জন্য দ্রুত ডিডিও নিয়োগ করতে হবে জেলা স্কুল পরিদর্শকদের। সরকারি সূত্রে খবর, এর পরবর্তী ধাপেই স্কুল পরিচালন সমিতিকে সম্পূর্ণ নির্বাচিত ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতদিন মনোনয়ন প্রথার মাধ্যমে পরিচালন সমিতি গঠন করা হতো। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতেই সেই মনোনয়ন করা হত। নতুন সরকার সেই কাঠামো বদলাতে চাইছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতির সুপারিশ মেনে এবার নির্বাচনের মাধ্যমে পরিচালন সমিতি গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

 

নতুন খসড়া অনুযায়ী, প্রাথমিক স্কুলের পরিচালন সমিতিতে থাকবেন ১৫ জন সদস্য। মাধ্যমিক স্কুলে ২০ জন এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সর্বাধিক ২৫ জন সদস্য রাখা হতে পারে। উচ্চমাধ্যমিকের ক্ষেত্রে এই ২৫ জনের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৮ জনই থাকবেন অভিভাবক। স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দু’জন জনপ্রতিনিধি থাকতে পারেন। বাকিরা হবেন স্থানীয় শিক্ষাবিদ। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সভাপতি এবং সহ-সভাপতির পদ শুধুমাত্র নির্বাচিত অভিভাবকদের জন্য সংরক্ষিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষিকাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রত্যেক সদস্যকেই নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

পরিচালন সমিতির কাজের ক্ষেত্রেও কড়া নিয়ম আনা হচ্ছে। সমিতির মেয়াদ হবে ২ বছর। প্রধান শিক্ষক ছাড়া কোনও ব্যক্তি টানা ২ টি মেয়াদে দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। প্রতি মাসে অন্তত একটি বৈঠক করা বাধ্যতামূলক হবে। বছরে একবার সমস্ত অভিভাবকদের নিয়ে বার্ষিক সাধারণ সভা করতে হবে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার এক মাসের মধ্যেই পরিচালন সমিতি গঠন করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে।  শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। শিক্ষক সংগঠনের নেতাদের বক্তব্য, জাতীয় শিক্ষা নীতির আলোকে এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এতদিন যে সমস্যাগুলি ছিল, তা দূর করার জন্য দ্রুত এই নীতি কার্যকর করা প্রয়োজন। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির নেতা স্বপন মণ্ডলের দাবি, আগে পরিচালন সমিতিগুলি কার্যত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো। নতুন ব্যবস্থায় অভিভাবকদের হাতে ক্ষমতা ফিরবে এবং স্কুল প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব অনেকটাই কমবে।

 

এ দিকে পড়ুয়াদের শারীরিক এবং মানসিক চাপ কমাতেও একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারি করেছে শিক্ষা দফতর। জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০-এর ‘স্কুল ব্যাগ নীতি’ অনুসরণ করে জানানো হয়েছে, কোনো পড়ুয়ার ব্যাগের ওজন তার শরীরের মোট ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। জেলা স্কুল পরিদর্শকদের কাছেও এই নির্দেশিকা পৌঁছে গিয়েছে। প্রাক্‌-প্রাথমিক স্তরের শিশুদের কোনো ব্যাগ বহন করতে হবে না। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের ব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কেজি ২০০ গ্রাম। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে সীমা আড়াই কেজি। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির জন্য ২ থেকে ৩ কেজি, অষ্টম শ্রেণির জন্য ৪ কেজি, নবম ও দশমের জন্য সাড়ে ৪ কেজি এবং একাদশ-দ্বাদশের জন্য সর্বাধিক ৫ কেজি ওজনের ব্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত ব্যাগের ওজন পরিমাপ করার কথাও বলা হয়েছে।

 

শুধু ব্যাগ নয়, হোমওয়ার্ক নিয়েও কড়া অবস্থান নিয়েছে শিক্ষা দফতর। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের কোনো হোমওয়ার্ক দেওয়া যাবে না। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়ারা সপ্তাহে সর্বাধিক ২ ঘণ্টা হোমওয়ার্ক পেতে পারে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ক্ষেত্রে সপ্তাহে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা এবং নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য দিনে সর্বাধিক ২ ঘণ্টা কাজের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্কুলে পানীয় জলের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে, যাতে পড়ুয়াদের বাড়ি থেকে জলের বোতল বয়ে আনতে না হয়। পরপর ২ টি পিরিয়ডে একই বিষয় পড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিদিন সব বই বহন করতে না হয়। খাতার পৃষ্ঠাসংখ্যা কমানোর নির্দেশও রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য একটি মাত্র খাতা এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে ক্লাসওয়ার্ক ও হোমওয়ার্কের জন্য আলাদা খাতা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

 

বিশেষ ভাবে সক্ষম পড়ুয়াদের জন্য স্কুলে লকারের ব্যবস্থার কথাও ভাবা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই পড়ুয়া এবং অভিভাবকদের সচেতন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বছরে অন্তত ১০ দিন ‘নো ব্যাগ ডে’ পালন করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। সেই দিনগুলিতে স্থানীয় কুমোর, ছুতোর, মালি কিংবা শিল্পীদের কাছ থেকে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পাবে পড়ুয়ারা। দঃদিও শিক্ষা মহলের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতেও ব্যাগের ওজন কমানো নিয়ে একাধিক নির্দেশিকা জারি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। এখনও বহু পড়ুয়াকে ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে স্কুলে উঠতে হয়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!