Advertisement
  • দে । শ
  • মে ২৩, ২০২৬

বারাণসী–কলকাতা এক্সপ্রেসওয়ে প্রজেক্টকে শর্তসাপেক্ষে ছাড়পত্র। বনচ্ছেদ ও বন্যপ্রাণী করিডর নিয়ে উদ্বেগ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বারাণসী–কলকাতা এক্সপ্রেসওয়ে প্রজেক্টকে শর্তসাপেক্ষে ছাড়পত্র। বনচ্ছেদ ও বন্যপ্রাণী করিডর নিয়ে উদ্বেগ

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটি ২৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বারাণসী–কলকাতা এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দিয়েছে। এ সিদ্ধান্তে মহাসড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বাধা অতিক্রম করলেও, বনভূমি হস্তান্তর, গাছ কাটার বিপুল পরিকল্পনা এবং সংবেদনশীল বন্যপ্রাণী অঞ্চলের উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তীব্র বিতর্ক নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে।

প্রস্তাবিত ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া-র এই প্রকল্পের প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় অনুমান করা হয়েছিল প্রায় ২৮,৫০০ কোটি থেকে ৩৫,০০০ কোটি টাকা। পশ্চিমবঙ্গ অংশে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯,২৫০ কোটি টাকা। পরিবেশ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক নথিতে পশ্চিমবঙ্গের ২৩৫ কিলোমিটার অংশকে বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। চার থেকে ছয় লেনের এই সবুজক্ষেত্র এক্সপ্রেসওয়ে শুধুমাত্র সড়ক প্রকল্প নয়, বরং উত্তর ও পূর্ব ভারতের মধ্যে দ্রুতগতির অর্থনৈতিক করিডর তৈরির বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ বলে বারবার দাবি করে আসছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। তবে উন্নয়নের  গতি যে বিপুল পরিবেশগত মূল্য দাবি করছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রকল্প নথিতে।

২৩ থেকে ২৪ এপ্রিল পরিবেশ মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকে, এই প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। নথি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ অংশে প্রায় ১০৩ হেক্টরেরও বেশি সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনভূমি হস্তান্তর করতে হবে। পাশাপাশি প্রায় ৫০ হাজার গাছ কাটা হবে, যার মধ্যে ১০ হাজার গাছ রয়েছে সরাসরি বনভূমির অন্তর্গত এলাকায় এবং বাকি ৪০ হাজার গাছ অ-বনভূমি অঞ্চলে, অর্থাৎ রাস্তার ধার, সামাজিক বনসৃজন এলাকায়।

বিপুল বনচ্ছেদের ফলে জঙ্গলমহল অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে গভীর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলি ও হাওড়া জেলার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করবে এই করিডর, যেখানে ইতিমধ্যেই বনাঞ্চল ও মানব বসতির মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক গাছ কাটা হলে স্থানীয় কার্বন শোষণ ক্ষমতা হ্রাস পাবে, মাটির আর্দ্রতা ও জলবায়ুর ভারসাম্য বদলে যেতে পারে এবং বহু প্রজাতির পাখি ও ছোটো স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে যে প্রকল্প এলাকার জঙ্গলমহল হাতি করিডরটির অবস্থান প্রস্তাবিত রুটের দক্ষিণে প্রায় ৭.৭৫ কিলোমিটার দূরে হলেও, বাস্তবে বিভিন্ন স্থানে হাতির চলাচলের পথ এ সড়ক অ্যালাইনমেন্টকে অতিক্রম করে। ফলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রকল্প এলাকার মধ্যে বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন অনুযায়ী তফসিল-১ শ্রেণিভুক্ত মোট ১৭টি প্রজাতির প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় হাতি, চিতাবাঘ, স্যাম্বার হরিণ, ডোরাকাটা হায়েনা, ভারতীয় শিয়াল এবং অন্যান্য বিরল প্রজাতি। প্রাণীগুলি কেবলমাত্র নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে না, বরং মৌসুমি অভিবাসন ও খাদ্য অনুসন্ধানের জন্য বিস্তৃত বনাঞ্চলের উপর নির্ভরশীল।

এই পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ন্যাশনাল হাইওয়েজ কর্তৃপক্ষ ২০টি বিশেষ ‘এলিফ্যান্ট-কাম-ওয়াইল্ডলাইফ আন্ডারপাস’ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। বিশেষজ্ঞ কমিটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে,  আন্ডারপাসগুলির নকশা জেলা বনাধিকারিকের সুপারিশ অনুযায়ী হতে হবে। কোনো আন্ডারপাসের দৈর্ঘ্য ৩০০ মিটারের কম হতে পারবে না এবং উচ্চতা রাখতে হবে ৮ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত, যাতে বড়ো আকারের হাতির পাল ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী নির্বিঘ্নে পারাপার করতে পারে। কমিটি আরও নির্দেশ দিয়েছে এগুলোকে শুধু কাঠামোগতভাবে নয়, পরিবেশগতভাবেও কার্যকর হতে হবে। অর্থাৎ আশপাশের বনভূমি সংযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে এবং প্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ তৈরি করতে হবে, নচেৎ এ উদ্যোগের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এই এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়িত হলে বারাণসী থেকে কলকাতা যাত্রার সময় প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা থেকে কমে প্রায় ৬ ঘণ্টায় নেমে আসবে। ফলে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং শিল্পসংযোগে এক নতুন গতি আসবে। উত্তর প্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গকে যুক্ত করে এই করিডর পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে পারে বলেই কেন্দ্রের দাবি। উত্তর প্রদেশে ইতিমধ্যেই প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিহার ও ঝাড়খণ্ড অংশে নির্মাণকাজ চলছে এবং সেখানে বনকাটার ছাড়পত্রও পাওয়া গেছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র মিললেও বনভূমি হস্তান্তর, ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজন, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা কাঠামোর বাস্তবায়ন, জমি অধিগ্রহণ এবং রাজ্যগুলির মধ্যে সমন্বয়—সবই এখন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। পশ্চিমবঙ্গ অংশে এতদিন জমি অধিগ্রহণ, অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন এবং বনভূমি সংক্রান্ত অনুমোদনের জটিলতায় ধীর গতিতে এগোচ্ছিল। রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার ফলে, এবার আর কোনো বাধা থাকবে না বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এ প্রকল্প ভারতের উন্নয়ন বনাম পরিবেশ সংরক্ষণের দ্বন্দ্বকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে দ্রুতগতির যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে জঙ্গলমহলের বনভূমি, হাতির করিডর এবং জীববৈচিত্র্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা। সব মিলিয়ে, বারাণসী–কলকাতা এক্সপ্রেসওয়ে এখন শুধুমাত্র একটি সড়ক প্রকল্প নয়, বরং পূর্ব ভারতের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নীতি, পরিবেশগত সংরক্ষণ আর মানব-প্রকৃতি সম্পর্কের এক জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!