- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ১১, ২০২৫
বন্ধ হয়ে যাবে ‘এসআইআর’? বহু প্রশ্নের উত্তর চেয়ে কমিশনকে নোটিশ জারি সুপ্রিম কোর্টের
সারা দেশে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে। এক দিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, এ উদ্যোগে ভোটার তালিকা আরও স্বচ্ছ হবে; অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ— এটি ‘তাড়াহুড়ো করে করা এক বিপজ্জনক পদক্ষেপ’। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে সে বিতর্কেরই উত্তাল প্রতিধ্বনি। তামিলনাড়ুর শাসকদল ডিএমকে এবং পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস, পাশাপাশি কংগ্রেস ও সিপিএম—সবাই মিলে চ্যালেঞ্জ করেছে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে। মামলাকারীদের যুক্তি, কমিশন এক মাসে সারা দেশের ভোটার তালিকা খতিয়ে দেখতে চাইছে— যা বাস্তবসম্মত নয় এবং কোটি কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। বিচারপতি সুর্য কান্ত ও জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চ আজ শুনানি করে কমিশনকে নোটিস জারি করেছে। তবে একই সঙ্গে আবেদনকারীদের উদ্দেশে আদালতের প্রশ্ন, ‘এসআইআর নিয়ে আপনারা এত ভয় পাচ্ছেন কেন?’
মামলাকারীদের পক্ষে আদালতে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ আইনজীবি কপিল সিব্বল। তাঁর বক্তব্য, ‘আগে এসআইআর করতে ৩ বছর সময় লাগত। এখন কমিশন বলছে এক মাসেই শেষ করবে। এতে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে।’ সিব্বল জানান, এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ৪ নভেম্বর, শেষ হবে ৪ ডিসেম্বর। ‘যাঁদের নাম বাদ পড়বে, তাঁদের কবে নোটিস দেওয়া হবে? বিহারে কিন্তু প্রক্রিয়া চলাকালীনই নোটিস জারি করা হয়েছে। তামিলনাড়ু বা বাংলায় তা হয়নি।’ প্রশ্ন সিব্বলের। তিনি আরও বলেন, ‘বিহারের এসআইআরের নথি ব্যবহার করে তামিলনাড়ুর যাচাই চলছে। দুই রাজ্যের বাস্তবতা এক নয়। পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণ ভারতে এই সময় বর্ষা, ফসল কাটার সময়— কমিশনের উচিত ছিল স্থানীয় বাস্তবতা বোঝা।’
কপিল সিব্বল আদালতে আক্ষেপ করে বলেন, ‘এসআইআর এখন এক ধরনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। যেন রাজ্যগুলো দৌড়চ্ছে— কে আগে শেষ করবে! কিন্তু এটা তো প্রতিযোগিতা নয়, গণতান্ত্রিক অনুশীলন।’ তাঁর দাবি, অনেক রাজ্যে এখনও স্থায়ী ইন্টারনেট সংযোগ নেই। ‘বাংলার বহু গ্রামীণ এলাকায় অনলাইন নথি আপলোড করা যায় না। এই অবস্থায় অনলাইনে ভোটার ফর্ম জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত?’ এরপর বিচারপতি সুর্য কান্ত আবেদনকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা এমন ভাবে দেখাচ্ছেন, যেন প্রথমবার ভোটার তালিকা তৈরি হচ্ছে! ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ তো কমিশনের নিয়মিত দায়িত্ব। যদি পরে কোনো ক্রটি থাকে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেটি সংশোধন করবে।’ তবে বিচারপতি সূর্য কান্ত এটাও উল্লেখ করেন যে কমিশনকে বিভিন্ন রাজ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে— ‘যা বিহারে প্রযোজ্য, তা তামিলনাড়ু বা বাংলায় নাও হতে পারে।’
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ভোটার তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে সতর্ক মন্তব্য করেন, ‘ভোটার তালিকার তথ্য জনসমক্ষে না এনে, ব্যক্তিগতভাবে সুরক্ষিত রাখা উচিত। তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো রকম অবহেলা চলবে না।’ আদালত আগেই ২০১৮-র কামল নাথ মামলার রায় উল্লেখ করে বলেছে— মেশিন রিডেবল ভোটার তালিকা প্রকাশ করলে ভোটার গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী জানান, ‘তামিলনাড়ুর মতো উন্নত রাজ্যে এই প্রক্রিয়া চালানো সম্ভব। কিছু রাজ্য কেবল ‘দুর্বল অবকাঠামো’ দেখিয়ে সময় চাইছে।’কিন্তু আদালত স্পষ্ট জানায়— শুনানি চলাকালীন কোনো রাজ্যের হাইকোর্টে ‘এসআইআর’ সংক্রান্ত মামলা চলতে পারবে না। কেউ কিছু বলতে চাইলে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে আসতে হবে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রক্রিয়াকে তুলনা করেছেন নোটবন্দির সঙ্গে। তাঁর মন্তব্য, ‘আগে ছিল নোটবন্দি, এখন ভোটবন্দি! দুই মাসে সারা দেশের ভোটার তালিকা সংশোধন করা অসম্ভব। এতে সাধারণ মানুষ ভুগছেন, বিএলও কর্মীরাও চাপে রয়েছেন।’ নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ‘এসআইআর’ আর ‘এসএসআর’ এক নয়। ‘এসএসআর’-এ পুরনো ভোটার তালিকা বহাল থাকে, শুধু নতুন সংযোজন বা বাদ দেওয়ার আবেদন নেওয়া হয়। কিন্তু ‘এসআইআর’-এ প্রত্যেক ভোটারকেই নতুন করে ফর্ম জমা দিতে হয়, আর বিএলও-রা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই করেন। সুপ্রিম কোর্ট কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে, তারা যেন সমস্ত তথ্য ও আইনি যুক্তি-সহ লিখিত হলফনামা জমা দেয়। আদালত জানিয়েছে, ‘আমরা আবেদনকারীদের বক্তব্য এবং কমিশনের উত্তর দেখে সিদ্ধান্ত নেব— এ প্রক্রিয়া চলবে কি না।’ পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত হয়েছে ২৬ নভেম্বর।
❤ Support Us






