- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ১৪, ২০২৫
বাংলাদেশি সন্দেহে ভিনরাজ্যে বাংলাভাষী শ্রমিকদের হেনস্থা, কেন্দ্র-রাজ্যের কাছে হলফনামা তলব সুপ্রিম কোর্টের
বাংলাদেশি সন্দেহে ভিনরাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী শ্রমিকদের আটক করার অভিযোগে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন কোনো নির্দেশ দিল না। তবে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে কেন্দ্র ও নয়টি রাজ্যকে হলফনামা দিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার নির্দেশ দিয়েছে বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ।
পশ্চিমবঙ্গ অভিবাসী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের তরফে দায়ের হওয়া এ মামলায় দাবি করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একটি নির্দেশিকাকে হাতিয়ার করে দেশের একাধিক রাজ্যে, বিশেষত দিল্লি, গুজরাত, মহারাষ্ট্রে বাংলা ভাষায় কথা বললেই পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ বলে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যাচাই না করেই তাঁদের আটক, রাজ্যে ফেরত পাঠানো, এমনকি জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ। মামলাকারীদের পক্ষ থেকে প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ আদালতে জানান, ‘সন্দেহ হলেই আটক করছে পুলিশ। অনেক ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় লেখা নথিকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। অথচ বাংলা শুধু বাংলাদেশি ভাষা নয়, ওটা ভারতীয় সংবিধান স্বীকৃত ভাষা। এমনকি যাচাইয়ের আগে অনেককে আটকে রাখা হচ্ছে, কোথাও কোথাও নির্যাতনের অভিযোগও এসেছে।’ তিনি আদালতের কাছে আবেদন জানান, যতক্ষণ না নাগরিকত্ব যাচাই হচ্ছে, ততক্ষণ যেন কাউকে আটক না করা হয়।
উত্তরে সুপ্রিম বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, এখনই ধরপাকড় বন্ধ রাখতে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিলে বৈধ নথি-সহ বাংলাদেশ থেকে আসা নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। ফলে, আদালত অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ না দিলেও, মামলার গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে কেন্দ্র ও ওড়িশা, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, হরিয়ানা ও পশ্চিমবঙ্গ, এই ৯ রাজ্যকে হলফনামা জমা দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে বলেছে। বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘যে রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকেরা কাজ করছেন, সে রাজ্যের পুলিশ বা প্রশাসনের তাঁদের সম্পর্কে জানার অধিকার আছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়া যেন মানবাধিকার লঙ্ঘন না করে, সে দিকেও লক্ষ্য রাখা জরুরি।’ তিনি আরো বলেন, ‘সমন্বয়ের জন্য রাজ্যগুলির মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় ব্যবস্থাপনা থাকা উচিত, যাতে প্রকৃত ভারতীয় শ্রমিকদের অযথা হয়রানি না হয়।’ বিচারপতি বাগচী প্রশ্ন তোলেন, ‘বাংলা ভাষা অবৈধ ভাষা নয়। তাহলে কেন এ ভাষায় লেখা নথিকে সন্দেহজনক ধরা হচ্ছে? এটা ঠিক নয়।’ এ মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ২৫ আগস্ট। ওই দিনই কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিকে হলফনামা জমা দিয়ে জানাতে হবে, এ বিষয়ে তাদের কী অবস্থান। আদালত তখনই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
এই মামলার প্রেক্ষিতে পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম জানান, ‘বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ন্যায়বিচারের জন্য আমরা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আমরা বাংলাবিরোধী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাব এবং তাঁদের পরাজিত করব। এই দেশ সবার। আমরাও সমানভাবে এই দেশের নাগরিক।’ ভিনরাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তা ইস্যুতে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় চলছে। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে শুরু করে অন্যান্য বিরোধী দলগুলো দাবি তুলেছে, ‘বাংলা ভাষা নিয়ে বিদ্বেষ তৈরি করে বিজেপি নাগরিকদের হেনস্থা করার চেষ্টা হচ্ছে’। অন্যদিকে, বিজেপি বলছে, ‘দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় অবৈধ অনুপ্রবেশ রোখা জরুরি, কিন্তু কোনো ভারতীয় নাগরিক যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটাও দেখতে হবে।’ এদিনের সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট, এ মামলা শুধু কোনও রাজ্যের সমস্যা নয়, দেশজুড়ে কর্মরত লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী ও অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন।
❤ Support Us





