Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ৩, ২০২৬

বিধায়ক প্রশিক্ষণ শিবিরে বাম-তৃণমূল জমানার সমালোচনা করেও, ঐক্যের বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর। দল ভাঙানোর অভিযোগে ওয়াকআউট কুণালের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বিধায়ক প্রশিক্ষণ শিবিরে বাম-তৃণমূল জমানার সমালোচনা করেও, ঐক্যের বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর। দল ভাঙানোর অভিযোগে ওয়াকআউট কুণালের

নিউটাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে শুক্রবার শুরু হলো রাজ্যের বিধায়কদের জন্য দুদিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবির। সংসদীয় গণতন্ত্র, বিধানসভার কার্যপ্রণালি, আইন প্রণয়ন এবং জনপ্রতিনিধিদের সাংবিধানিক দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন ও প্রবীণ বিধায়কদের আরও দক্ষ করে তোলাই এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যপাল আর এন রবি, রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ নারায়ণ সিংহ, কেন্দ্রীয় সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু, রাজ্য বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বিভিন্ন দলের বিধায়করা।

প্রশিক্ষণ শিবিরের মঞ্চ থেকেই ঐক্যের বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে তিনি রাজ্যের পূর্ববর্তী বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের প্রশাসনিক সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র সমালোচনাও করেন। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল সর্বদলকে সঙ্গে নিয়ে চলার আহ্বান, তেমনই ছিল অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ। ভাষণের শুরুতেই কর্মসূচির আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী। লোকসভার সচিবালয়, সংসদের আধিকারিক এবং এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সকলের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এত বড়ো আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর কথায়, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু বিধায়কদের দক্ষতা বৃদ্ধি করবে না, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকেও আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি দল-মত নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার নীতি গ্রহণ করেছেন। সে কারণেই বিরোধী দলের বিধায়কদেরও প্রশাসনিক বৈঠক ও সরকারি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বিরোধী মতের উপস্থিতিতেই নিহিত, তাই বিধানসভার ভিত আরও মজবুত করতে সব দলের প্রতিনিধিদের সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এর পরেই তিনি রাজ্যের অতীত রাজনৈতিক পর্বের সমালোচনায় সরব হন। নাম না করেই বামফ্রন্ট সরকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যত দলীয় কার্যালয় থেকেই নেওয়া হতো। তৃণমূল সরকারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে গিয়ে অবশ্য কিছুটা সংযত সুরেই তিনি বলেন, বর্তমান অনুষ্ঠানে সব দলের বিধায়ক উপস্থিত থাকায় নিজের বিধানসভার অতীত নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা মুখ্যমন্ত্রীর শোভা পায় না।

তবে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিরোধীদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলতে পিছপা হননি তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী সাংসদ ও বিধায়কদের সরকারি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হতো না। রাজনৈতিক পরিচয় বিচার করে কয়েকজনকে ডাকা হলেও অধিকাংশ বিরোধী জনপ্রতিনিধিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, গত পাঁচ বছরে বিরোধী দলনেতাকে একবারও কোনো সরকারি কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনের আগেও তাঁকে বারবার সাসপেন্ড করা হতো বলে দাবি করেন তিনি। রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি বাংলার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান স্মরণ করে বলেন, বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস নানা মতাদর্শ ও গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। সে ঐতিহ্য বজায় রাখতে হলে বিধানসভাকে আরও কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ করে নবনির্বাচিত বিধায়কদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়াই শেষ কথা নয়, বিধানসভার কাজ, সংসদীয় রীতি, আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দুদিনের প্রশিক্ষণ শিবির থেকে যতটা সম্ভব শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে আরও দক্ষতার সঙ্গে মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার আহ্বান জানান তিনি। দলীয় বিভাজন ভুলে সকলে মিলে বাংলার উন্নয়নে কাজ করারও ডাক দেন মুখ্যমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের ওয়াকআউট। বিধায়ক হিসেবে নির্ধারিত ডেলিগেট কার্ড সংগ্রহ করে তিনি অনুষ্ঠানে যোগ দিলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সভাস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, প্রশিক্ষণ শিবিরে উপস্থিত হওয়া ছিল তাঁর সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ওয়াকআউটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কুণাল ঘোষ সরাসরি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং রাজ্য বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেস ভাঙানোর অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, সংসদে দলত্যাগের ঘটনাগুলিতে নিরপেক্ষ ভূমিকা নেওয়ার পরিবর্তে স্পিকার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, অন্য দলে যোগ দেওয়া সাংসদদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না করে তাঁদের সঙ্গে প্রকাশ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিধানসভার স্পিকারের বিরুদ্ধেও দলত্যাগীদের স্বীকৃতি দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি।

কুণালের অভিযোগ, যাঁদের ভূমিকা নিয়ে তাঁর এত গুরুতর আপত্তি, তাঁদের কাছ থেকে সংসদীয় রীতি, বিধানসভার নিয়ম বা রাজনৈতিক শিষ্টাচার শেখার প্রশ্নই ওঠে না। যদিও এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তাকে তিনি সমর্থন করেছেন। তাঁর দাবি, বিধানসভার কার্যপ্রণালি শেখার জন্য তাঁর অন্য পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন রাজ্য বিধানসভার স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এখন তাঁর সহকর্মী। বিধানসভার নিয়মকানুন, সংসদীয় আচরণ এবং পরিষদীয় রীতিনীতি তিনি বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকেই শিখবেন বলে মন্তব্য করেন কুণাল।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, কুণাল ঘোষের বেইমানমন্তব্য কার্যত বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরকেই উদ্দেশ্য করে করা। যদিও তিনি কারও নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি। এদিনের অনুষ্ঠানে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও বক্তব্য রাখেন। অন্যদিকে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় দুদিনের প্রশিক্ষণ শিবির। এ কর্মসূচির রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয় বলে মনে করছে পর্যবেক্ষকদের একাংশ। একদিকে মুখ্যমন্ত্রীর সর্বদলীয় সহযোগিতার বার্তা, অন্যদিকে অতীত প্রশাসনিক সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর আক্রমণদুইয়ের মাঝেই উঠে এসেছে বর্তমান রাজনীতির বিভাজনের ছবি। তারই মধ্যে কুণাল ঘোষের ওয়াকআউট এবং স্পিকারদের বিরুদ্ধে তাঁর প্রকাশ্য অভিযোগ প্রশিক্ষণ শিবিরের মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কেরও জন্ম দিল।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি কালীঘাট-ঘনিষ্ঠ তৃণমূল শিবিরের তরফে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের সমর্থন এবং স্পিকারের অনুমোদনের ভিত্তিতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি পান। একই সময়ে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী রায়-সহ তৃণমূলের একাংশের সাংসদ নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের পথে হাঁটায় রাজ্যের রাজনীতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে। সে প্রেক্ষাপটেই কুণাল ঘোষের এ দিনের প্রতিবাদ এবং স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!