Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ৩, ২০২৬

নারী নিরাপত্তায় ‘দুর্গা স্কোয়াড’, সাইবার অপরাধ দমনে পৃথক নজরদারি, আইনশৃঙ্খলায় একগুচ্ছ উদ্যোগের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নারী নিরাপত্তায় ‘দুর্গা স্কোয়াড’, সাইবার অপরাধ দমনে পৃথক নজরদারি, আইনশৃঙ্খলায় একগুচ্ছ উদ্যোগের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে নারী নিরাপত্তাসাইবার অপরাধ দমন এবং পুলিশের প্রশাসনিক স্বাধীনতাকে সামনে রেখে একগুচ্ছ পদক্ষেপের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার নবান্নে রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দেনঅপরাধের তথ্য আর গোপন করা যাবে না। অভিযোগ পেলেই এফআইআর নথিভুক্ত করতে হবেআইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি জানানআইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য নবান্নের অনুমতির অপেক্ষা না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হবে।

পুলিশ-প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠকে নারী নিরাপত্তাকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। বুধবার প্রতিটি থানায় মহিলা হেল্প ডেস্ক চালুর ঘোষণা করেছিলেন তিনি। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক ভাবে সে প্রকল্পের সূচনা হলো। নবান্নের তরফে জানানো হয়েছেপ্রতিটি থানার মহিলা হেল্প ডেস্কে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধগার্হস্থ্য হিংসাযৌন নির্যাতনপক্সো-সংক্রান্ত অভিযোগআইনি সহায়তাকাউন্সেলিং এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন পরিষেবা এক ছাতার তলায় দেওয়া হবে। অভিযোগকারীদের যাতে একাধিক দফতরের দ্বারস্থ হতে না হয়সে দিকেও নজর রাখা হবে।শুধু হেল্প ডেস্ক নয়শহরাঞ্চলে পথেঘাটে মহিলাদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে দুর্গা স্কোয়াড’ নামে বিশেষ মহিলা পুলিশ বাহিনীরও উদ্বোধন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মোটরবাইক-আরোহী এ বাহিনী নিয়মিত টহল দেবেবিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানবাজারকর্মক্ষেত্রগণপরিবহণ কেন্দ্র-সহ জনবহুল এলাকায়। মহিলাদের বিরুদ্ধে অসংগঠিত অপরাধ, ‘ইভ-টিজিং বা হেনস্থার ঘটনায় দ্রুত হস্তক্ষেপই হবে এ বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অডিয়ো-ভিডিয়ো রেকর্ডিং-সক্ষম সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো  আধুনিক কন্ট্রোল রুম তৈরির পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিন, নারী নিরাপত্তার প্রসঙ্গে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ঘটনা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ওই ঘটনা আমাদের কাছে অত্যন্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি কোনো ভাবেই হতে দেওয়া যাবে না।’ শুধু আরজি কর নয়বগটুইপার্ক স্ট্রিট, কামদুনির মতো বহুচর্চিত অপরাধের ঘটনাও তাঁর বক্তৃতায় উঠে আসে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবিঅতীতে বিচার না পাওয়া একাধিক ঘটনার পুনর্বিবেচনার জন্য পৃথক কমিশন গঠন করা হয়েছে। পুরনো কোনো মামলার ক্ষেত্রেও নতুন করে অভিযোগ জমা পড়লে তদন্ত হবে, উপযুক্ত প্রমাণ মিললে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দিকেও এগোবে সরকার। বৈঠকে সাইবার অপরাধ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ‘সাইবার অপরাধ এখন মহামারির আকার নিয়েছে।’ তিনি জানানবিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের ফর্ম পূরণের নাম করে প্রতারকেরা সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় উধাও হয়ে যাচ্ছে। জনতার দরবার’-এ আসা বহু প্রবীণের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেনঅবসরজীবনের প্রভিডেন্ট ফান্ডগ্র্যাচুইটি কিংবা সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য জমানো অর্থ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলা শুধু সাধারণ তদন্তে সম্ভব নয়প্রয়োজন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আধুনিক বাহিনী।

সে লক্ষ্যেই রাজ্যজুড়ে প্রতিটি থানায় সাইবার হেল্প ডেস্ক’ চালুর পাশাপাশি সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পৃথক উইং গঠনের ঘোষণা করা হয়েছে। নবান্ন জানিয়েছেএডিজি বা আইজি পদমর্যাদার এক জন অভিজ্ঞ আইপিএস অফিসারকে ই শাখার দায়িত্ব দেওয়া হবে। তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে সমন্বয় রেখে গোটা রাজ্যের সাইবার পুলিশ স্টেশনতদন্ত এবং হেল্প ডেস্কগুলির কাজ পর্যবেক্ষণ করবেন। আধুনিক প্রযুক্তিডিজিটাল ফরেন্সিক পরিকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তার জন্যও বিশেষ বরাদ্দ রাখা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকে পুলিশের উদ্দেশে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যকোনো অপরাধ বা অভিযোগ চাপা দিয়ে রাখার প্রবণতা বরদাস্ত করা হবে না। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রোগ লুকিয়ে রাখলে যেমন এক সময় তা ভয়ঙ্কর আকার নেয়তেমনই অপরাধের তথ্য গোপন করলেও সমস্যা আরও বাড়ে।’ তাই কোনো অভিযোগ এলেই তা এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করে আইন অনুযায়ী তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ-সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য নিয়মিত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠানোর নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগঅতীতে এ তথ্য নিয়মিত পাঠানো হতো না।

পুলিশের কাজের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন শুভেন্দু। দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যে পুলিশের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তুলে এসেছে বিরোধীরা। সেই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী বলেনআইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে নবান্নের অনুমতির অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশ নিজেরাই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাসিনিয়রিটি  প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখার উপরও জোর দিয়েছেন তিনি। যদিও পুলিশের একাংশের বক্তব্যএই স্বাধীনতা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবেতা সময়ই বলবে। পুলিশ বাহিনীর জনবল ঘাটতির বিষয়টিও এ দিন স্বীকার করে নেয় সরকার। মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল জানানজনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা এখনো পর্যাপ্ত নয়। তবে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করা হবে। মুখ্যমন্ত্রীও ঘোষণা করেনআগামী সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্য পুলিশের ১২ হাজার এবং কলকাতা পুলিশের ৪ হাজার— মোট ১৬ হাজার নতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জওয়ান দায়িত্বে যোগ দেবেন। তাঁদের মাধ্যমে থানাগুলির জনবল যেমন বাড়বেতেমনই জরুরি পরিষেবাও আরও দ্রুত করা সম্ভব হবে বলে সরকারের আশা।

দ্রুত পুলিশি পরিষেবা নিশ্চিত করতে ডায়াল ১১২’ জরুরি পরিষেবাকে রাজ্যজুড়ে পূর্ণাঙ্গ ভাবে চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবিবর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে জরুরি ফোনের পরে পুলিশের পৌঁছাতে গড়ে প্রায়  ঘণ্টা সময় লাগে। আগামী এক বছরের মধ্যে সেই সময়সীমা  মিনিটে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দুর্গাপুজোর আগেই এ পরিষেবা পুরো রাজ্যে চালু করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। প্রয়োজনীয় যানবাহনআধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে এই পরিষেবা শক্তিশালী করা হবে। তারাতলার বহুতল ধসের সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেনকলকাতা পুলিশদমকলপুরসভাপরে এনডিআরএফ ও সেনার সমন্বিত উদ্যোগে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। অতীতে পোস্তামাঝেরহাট বা গার্ডেনরিচের দুর্ঘটনায় যেখানে জীবিত উদ্ধার প্রায় অসম্ভব হয়েছিলসেখানে এবার কুইক রেসপন্স টিম’-এর দ্রুত পদক্ষেপে একাধিক মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা গিয়েছে।  অভিজ্ঞতাকেই রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে চায় সরকার।  

পার্ক সার্কাস ও আসানসোলে পুলিশের আক্রান্ত হওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাও বৈঠকে উঠে আসে। মুখ্যমন্ত্রী জানানবাহিনীর মনোবল ধরে রাখতে তিনি নিজে আক্রান্ত পুলিশকর্মীদের পাশে গিয়েছেন। তাঁর মতেসদ্য পাশ হওয়া গুন্ডাদমন আইন ভবিষ্যতে পুলিশকে আরও নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেনদীর্ঘমেয়াদে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে দিল্লি পুলিশ বা কেন্দ্রীয় প্যারা মিলিটারি বাহিনীর সমতুল্য আধুনিকপ্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ বাহিনীতে পরিণত করাই সরকারের লক্ষ্য। প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতেঘোষিত পরিকল্পনাগুলি কার্যকর হলে রাজ্যের পুলিশি পরিকাঠামো এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!