Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫

তালিবানি কঠোরতার আড়ালে রমরমা সীমান্তপারের মাদক-বাণিজ্য, সতর্ক করল রাষ্ট্রপুঞ্জ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
তালিবানি কঠোরতার আড়ালে রমরমা সীমান্তপারের মাদক-বাণিজ্য, সতর্ক করল রাষ্ট্রপুঞ্জ

কাবুল দখলের পর আফিম ও মাদক চাষে নিষেধাজ্ঞা জারি করে নিজেদের ‘নৈতিক শাসন’-এর ছবি তুলে ধরতে চেয়েছিল তালিবান। কিন্তু বাস্তবে সে নিষেধাজ্ঞার আড়ালেই সীমান্ত পেরিয়ে নতুন করে ফুলে-ফেঁপে উঠছে মাদক-বাণিজ্য— এমনই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। ৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত ওই রিপোর্টে জানানো হয়েছে, আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদন কমলেও মাদক বাণিজ্য এখনো দেশটির অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে রয়ে গিয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অবৈধ বাণিজ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিস্তৃত চক্র, যার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক পাচারকারী, সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠী, এমনকি কিছু রাষ্ট্রীয় স্তরের শক্তিও। রিপোর্টে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই নেটওয়ার্কগুলিই মাদক থেকে বিপুল আর্থিক লাভ তুলে নিচ্ছে।

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশত্যাগ করার পর, দীর্ঘ দু-দশকের মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে কাবুলের ক্ষমতা দখল করে তালিবান। ক্ষমতায় এসেই তারা পোস্ত চাষ ও আফিম উৎপাদনে কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তার জেরে আফগানিস্তানে পোস্ত চাষ এবং আফিম উৎপাদন নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন স্তরে। কিন্তু রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট বলছে, ‘শিল্পটি ধ্বংস হয়নি, কেবল স্থানান্তরিত হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, আফগান মাদক নেটওয়ার্কগুলি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কৃষক ও যন্ত্রপাতি সীমান্তের ওপারে সরিয়ে নিয়েছে। ফলে আফগানিস্তানের বাইরে নতুন নতুন এলাকায় মাদক উৎপাদনের ঘাঁটি গড়ে উঠছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের আশঙ্কা, এই পরিবর্তনের সুযোগ নিতে পারে ‘আইএসআইএল’-খোরাসান শাখা এবং তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর মতো জঙ্গি সংগঠনগুলি।

২০২২ সালে তালিবানের আফিম নিষেধাজ্ঞার ফলে আফগানিস্তান থেকে হেরোইন প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পাচার কিছুটা কমেছে ঠিকই। তবে তার পাশাপাশি বেড়েছে শুকনো আফিমের দাম। রিপোর্ট অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময়ের তুলনায় এই কাঁচামালের দাম প্রায় ৪ গুণ বেড়ে গিয়েছে। উল্লেখযোগ্য ভাবে, শুকনো আফিমই হেরোইন তৈরির মূল উপাদান। অন্য দিকে, তালিবানের কড়া অবস্থানের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন আফগান কৃষকেরাও। মে মাসে আফিম চাষিদের সঙ্গে তালিবান প্রশাসনের সংঘর্ষে ২ জনের মৃত্যু হয়। তার এক মাস পর ফের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত বদাখশন ও জুর্ম অঞ্চলে প্রশাসন ১৫ দিনের সময়সীমা ঘোষণা করে, এ সময়ের মধ্যে পোস্ত সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়, পরে ক্ষেত ধ্বংস করার শর্তে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের মাদক ও অপরাধ দফতর (ইউএনওডিসি) আরো জানিয়েছে, আফিম উৎপাদন কমলেও আফগানিস্তানের গ্রামীণ অঞ্চলে নতুন এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জীবিকার বিকল্প উৎসের অভাবে অনেক এলাকাতেই বেড়েছে সিন্থেটিক মাদক— বিশেষত মেথামফেটামিন তৈরিতে ব্যবহৃত ফসলের চাষ। পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের মাদক আন্তর্জাতিক বাজারে ধীরে ধীরে আফিমের জায়গা নিতে পারে। সব মিলিয়ে, তালিবানের তথাকথিত নৈতিক শাসনের দাবির আড়ালে আফগানিস্তান ও তার প্রতিবেশী অঞ্চলে মাদক-বাণিজ্যের নতুন রূপরেখা গড়ে উঠছে বলেই মনে করছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। যা শুধু আফগানিস্তানের নয়, গোটা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তার জন্যই বড়সড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

মাদক-বাণিজ্যের পাশাপাশি আফগানিস্তানে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনগুলির ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়েও নতুন করে সতর্ক করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। রিপোর্টের বলা হয়েছে, তালিবান শাসনের মধ্যেও ইসলামিক স্টেট–খোরাসান (আইএসআইএল-কে), তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং আল-কায়েদার উপস্থিতি দেশ ও অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সানাউল্লাহ ঘাফারির নেতৃত্বাধীন আইএসআইএল-কে আফগানিস্তানের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে এখনো যথেষ্ট শক্তশালী। তালিবান ও পাকিস্তানের অভিযানে সংগঠনটির নেতৃত্বে কিছুটা আঘাত লাগলেও, তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মধ্য এশিয়ার দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যারা আফগান সীমান্তের দু-পাশে বসবাস করে, সেখান থেকেই মূলত আইএসআইএল-কে তাদের সদস্য সংগ্রহ করছে। শুধু আফগানিস্তানেই নয়, দেশের বাইরেও নিজেদের উপস্থিতির জানান দিয়েছে এই জঙ্গি সংগঠন। গত বছর ইরানের কেরমানে একটি শিয়া মসজিদে হামলা এবং রাশিয়ার মস্কোয় ক্রোকাস সিটি হল-এ ভয়াবহ হামলার পিছনে আইএসআইএল-কের হাত ছিল বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট।

অন্য দিকে, নূর ওয়ালি মেহসুদের নেতৃত্বাধীন টিটিপি পাকিস্তানের জন্য ক্রমশ বড়ো মাথাব্যথা হয়ে উঠছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উপর ৬০০-র বেশি হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়েছে এই সংগঠন। রাষ্ট্রপুঞ্জের দাবি, আফগানিস্তানের খোস্ত, কুনার, নানগরহার, পাকতিকা ও পাকতিয়া প্রদেশে টিটিপির অন্তত ৬ হাজার সশস্ত্র সদস্য সক্রিয় রয়েছে। তালিবান বারবার দাবি করলেও যে, তারা আল-কায়েদার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, রাষ্ট্রপুঞ্জের পর্যবেক্ষণ সে দাবিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আল-কায়েদার সদস্য বা সমর্থকেরা এখন প্রশাসনের উচ্চস্তরে আসীন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে আল-কায়েদার কার্যত নেতা সাইফ আল-আদল আফগানিস্তানকে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ বলে ঘোষণা করে অনুগতদের সেখানে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এরই মধ্যে ইরান ও পাকিস্তান থেকে বিপুল সংখ্যক আফগান শরণার্থীর প্রত্যাবর্তনে দেশটির অর্থনীতির উপর চাপ আরও বেড়েছে। কর্মসংস্থান ও জীবিকার সংকট তীব্রতর হচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। যদিও তালিবান দেশ জুড়ে মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার বৃহৎ কর্মসূচি নিয়েছে, তবে, রাষ্ট্রপুঞ্জের মতে নারী ও কন্যাশিশুদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতে মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। রিপোর্টে সতর্ক করে বলা হয়েছে, জনসংখ্যার অর্ধেক যদি শিক্ষা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না পায়, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনিবার্য। তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার বিরুদ্ধে ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ থাকলেও, রাষ্ট্রপুঞ্জের মূল্যায়নে তাঁর নিয়ন্ত্রণ এখনো দৃঢ়। আমিরের ফরমান বাস্তবায়ন ও তদারকির দফতর, সৎকাজের প্রসার ও অসৎকাজ দমন মন্ত্রক এবং সুপ্রিম কোর্ট— এই তিন প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে এক কট্টরপন্থী ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে, যা সরাসরি হিবাতুল্লাহর নির্দেশ কার্যকর করছে। আর এই ক্ষমতার বলয়ের ‘প্রধান দ্বাররক্ষী’ হিসেবে উঠে এসেছে কান্দাহারের প্রাদেশিক গভর্নর মোল্লা মোহাম্মদ শিরিন আখুন্দের নাম। রিপোর্ট অনুযায়ী, হিবাতুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনিই শেষ কথা। মূল ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের সরিয়ে দিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!