- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- আগস্ট ১৯, ২০২৬
গঙ্গা জল চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’, হাসিনার প্রত্যর্পণ : তারেক রহমানের ভারত সফর জল্পনার মাঝে দুই শর্ত বাংলাদেশের
এক দিকে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি নবীকরণে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ফেরানোর দাবি। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ না হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা। তিস্তার জলবণ্টন নিয়েও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্ন। সব মিলিয়ে ফের জটিল সমীকরণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। এরই মধ্যে মঙ্গলবার দিল্লির তরফে বলা হয়েছে, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হবে ‘পারস্পরিক স্বার্থ এবং পারস্পরিকতা’। বাংলাদেশের ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও সম্প্রতি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানের ভারত সফরকে ‘স্মরণীয়’ করে তুলতে চান।
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি ডিসেম্বরেই শেষ হওয়ার কথা। তার আগে নতুন চুক্তি নিয়ে দর-কষাকষিতে বসতে চাইছে ঢাকা। বাংলাদেশের জলসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী আনী জানিয়েছেন, নতুন চুক্তিতে এমন একটি ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ রাখতে হবে, যাতে শুষ্ক মরসুমে গঙ্গার জলপ্রবাহ কমে গেলেও বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম জল পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। প্রয়োজনে বাংলাদেশের জলসম্পদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক মঞ্চের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। ঢাকার বক্তব্য, ১৯৯৬-এর চুক্তিতে জলবণ্টনের যে কাঠামো রয়েছে, তা তৈরি হয়েছিল কয়েক দশক আগের জলপ্রবাহের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে গঙ্গার শুষ্ক মরসুমের জলপ্রবাহ এখন অনেক বেশি অনিশ্চিত। ফলে শুধু নির্দিষ্ট হিসাবের ভিত্তিতে জল ভাগ না করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম জলপ্রবাহের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। বাংলাদেশের তরফে পরিবেশগত বিষয়— নদীর স্বাস্থ্য, লবণাক্ততা, উজানে জল প্রত্যাহার এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ—নতুন চুক্তির আলোচনায় রাখার দাবিও উঠছে।
১৯৭৭ সালের গঙ্গা চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’-এর ব্যবস্থা ছিল। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে সে বিধান আর রাখা হয়নি। ঢাকার যুক্তি, শুষ্ক মরসুমে নদীর জলস্তর অস্বাভাবিক ভাবে নেমে গেলে শুধুমাত্র ভাগাভাগির সূত্র যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের কৃষি, নৌপরিবহণ এবং মানুষের দৈনন্দিন জলপ্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে ন্যূনতম জলপ্রবাহের নিশ্চয়তা থাকা জরুরি। বর্তমান ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর গঙ্গার জলপ্রবাহের পরিমাণ হিসাব করে দুই দেশের মধ্যে জল ভাগ হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখন বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতের চুক্তিতে জলপ্রবাহের পরিবর্তনশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। গঙ্গার জল নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কে ফারাক্কা ব্যারাজ বরাবরই সংবেদনশীল বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে গঙ্গার উপর তৈরি এই ব্যারাজের মাধ্যমে নদীর জলের একটি অংশ হুগলি নদীর দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের অভিযোগ, এর ফলে শুষ্ক মরসুমে ভাটির দিকে জলপ্রবাহ কমে যায়। ঢাকার এই অভিযোগের সঙ্গে অবশ্য একমত নয় দিল্লি। ভারতের বক্তব্য, ফারাক্কা কোনও বাঁধ নয়, বরং জলবিভাজন বা ডাইভারশন কাঠামো। ফারাক্কার মাধ্যমে হুগলি-ভাগীরথী নদী ব্যবস্থায় জল সরবরাহের পাশাপাশি বাংলাদেশের দিকে গঙ্গার প্রবাহও অব্যাহত থাকে। এ বিতর্কের মধ্যেই গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় এগিয়ে আসায় ফারাক্কা ফের আলোচনার কেন্দ্রে।
গঙ্গার পাশাপাশি তিস্তা নিয়েও ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জলবণ্টন চুক্তির চেষ্টা চলছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন তৃণমূল সরকারের আপত্তির কারণে সে চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলায় ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। ফলে বাংলাদেশ নতুন করে দাবি তুলছে, গঙ্গার চুক্তি নবীকরণের পাশাপাশি বৃহত্তর নদী-সহযোগিতার কাঠামো নিয়েও আলোচনার। প্রতিবেশী দুই দেশ মিলিয়ে ৫৪টি অভিন্ন নদী ভাগ করে নেয়। কিন্তু গঙ্গা ছাড়া অন্য কোনো নদীর জলবণ্টন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হয়নি। ফলে গঙ্গার চুক্তির পুনর্নবীকরণকে শুধু একটি পুরনো চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয় হিসেবে দেখছে না ঢাকা; বরং ভবিষ্যতে অভিন্ন নদীগুলির জল ব্যবস্থাপনার জন্য বৃহত্তর কাঠামো তৈরির সুযোগ হিসাবেও দেখছে।
জলবণ্টনের প্রশ্নের সঙ্গে এ বার সরাসরি যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সম্পর্কও। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নেন। তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে দায়ের হওয়া মামলার পর ঢাকা বার বার তাঁকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে। ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথোপকথনের পর সে দাবি আরও জোরালো হয়েছে। বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, হাসিনার ওই প্রকাশ্য বক্তব্যের পর তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফরের পরিবেশও প্রভাবিত হয়েছে। ঢাকার তরফে বলা হয়েছে, হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতকে দ্রুত পদক্ষেপ করতে হবে। দিল্লি অবশ্য জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধগুলি প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই পরীক্ষা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ‘ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী’ সম্পর্ক চায়। তবে সে সম্পর্কের ভিত্তি হবে ‘পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিকতা’। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ‘পারস্পরিকতা’ শব্দটির ব্যবহার তাৎপর্যপূর্ণ। এত দিন দিল্লির তরফে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহযোগিতা, প্রতিবেশী-প্রথম নীতি এবং গঠনমূলক যোগাযোগের উপর জোর দেওয়া হলেও এ বার সরাসরি পারস্পরিক স্বার্থের কথা সামনে আনা হয়েছে।
এদিকে, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে জল্পনা চলছে। এর আগে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ২০ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে দু–দিনের সফরে দিল্লি আসতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তবে এখনো পর্যন্ত এ নিয়ে ঢাকা বা দিল্লি—কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু ঘোষণা করেনি। ফলে সফরটি শেষ পর্যন্ত হবে কি না, হলেও কোন সময় হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তারেকের সম্ভাব্য ভারত সফরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আগামী সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনও। আগামী মাসে দিল্লিতে ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্যরাষ্ট্র নয়। তবে আঞ্চলিক প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশকে বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। প্রায় তিন সপ্তাহ আগে সে আমন্ত্রণের কথা প্রকাশ্যে আসে। ঢাকার তরফেও আমন্ত্রণ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, তারেক ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন না— এমনটা প্রায় নিশ্চিত হওয়ার পরই দুই দেশ আলাদা করে একটি দ্বিপাক্ষিক সফরের পরিকল্পনা করতে শুরু করে। তবে, পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দু–দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যস্ততা। ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে চলেছে ‘এসসিও’ সম্মেলন। সেখানে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কিরঘিজস্তান সফরে যাওয়ার কথা। ফলে আগস্টের শেষ দিকে তাঁর সময়সূচি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান সেপ্টেম্বরের গোড়াতেই নিউ ইয়র্কে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করতে চলেছেন।
অন্যদিকে, কিন্তু হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিকে সামনে রেখে ঢাকার অবস্থান কঠোর হওয়াতেও তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র একেএম শহীদুল করিম জানিয়েছেন, সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। হাসিনা এবং বাংলাদেশে অভিযুক্ত অন্যান্য পলাতকদের প্রত্যর্পণের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মী শরিফ ওসমান হাদির হত্যায় অভিযুক্তদেরও বাংলাদেশে হস্তান্তরের দাবি তুলেছে ঢাকা। দিল্লির তরফে অবশ্য তারেককে সফরের আমন্ত্রণ এখনো বহাল থাকার কথা জানানো হয়েছে। তবে সফর কবে হবে, তা নিয়ে কোনো নতুন তথ্য দেওয়া হয়নি। এই তীব্র টানাপড়েনের মধ্যেই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি না কি তারেক রহমানের ভারত সফরকে ‘স্মরণীয়’ করে তুলতে চান। দু–দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো আর ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষে-মানুষে সম্পর্ক জোরদারের উপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
এক দিকে জলবণ্টন, অন্যদিকে হাসিনার প্রত্যর্পণ— এখন এই দুই ইস্যুই ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরীক্ষার জায়গা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা আর তিস্তার মতো পুরনো প্রশ্ন। তবু এ মুহূর্তে সম্পর্ককে পুরোপুরি সংঘাতের পথে নিয়ে যেতে চায় না কোনো পক্ষই, অন্তত প্রকাশ্য বার্তায় তারই ইঙ্গিত। ঢাকা বলছে, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করতে তারা চায় না। দিল্লিও বলছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে তারা আগ্রহী।
❤ Support Us





