- এই মুহূর্তে মা | ঠে-ম | য় | দা | নে
- আগস্ট ১৯, ২০২৬
হকি স্টিকেই ইতিহাস ! মিজোরামের প্রথম ‘অর্জুন’ লালরেমসিয়ামি
মিজোরামের ক্রীড়াজগতে গর্বের মুহূর্ত, ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ। ভারতীয় মহিলা হকি দলের তারকা লালরেমসিয়ামিই হতে চলেছেন রাজ্যের প্রথম ‘অর্জুন’। ২০২৫ সালের অর্জুন পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত ১৭ জন ক্রীড়াবিদের তালিকায় নাম রয়েছে ২৬ বছরের এই অলিম্পিয়ানের। জাতীয় দলের জার্সিতে একের পর এক সাফল্য, অলিম্পিক্সে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব, এশিয়ান গেমসে পদক— দীর্ঘ কৃতিত্বের স্বীকৃতিই এ বার আসতে চলেছে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া সম্মানের মাধ্যমে।
মিজোরামের একমাত্র মহিলা অলিম্পিয়ান লালরেমসিয়ামির এ সাফল্যে স্বাভাবিক ভাবেই উচ্ছ্বসিত তাঁর পরিবার। আবেগঘন মুহূর্তে ফিরে এসেছে তাঁর প্রয়াত বাবার স্মৃতিও। মেয়ে দেশের হয়ে বড়ো মঞ্চে খেলুক, রাজ্য ও দেশের জন্য কিছু করুক— এমনই স্বপ্ন ছিল বাবা লালথানসাঙ্গা জোটের। কিন্তু মেয়ের এই ঐতিহাসিক সম্মান নিজের চোখে দেখে যেতে পারলেন না তিনি। লালরেমসিয়ামির মা লালজারমাউই বলেন, ‘সিয়ামি যখন আমাদের অর্জুন পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার কথা জানাল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে বলল, আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম। এত বড়ো সম্মান আসবে, তা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের কাছে এ এক বিরাট সাফল্য।’ মেয়ের পুরস্কারের খবর শুনে স্বামীর কথাও মনে পড়েছে তাঁর। লালজারমাউই বলেন, ‘খবরটা শোনার পর ওর বাবার কথা বার বার মনে পড়ছিল। তিনি বেঁচে থাকতে সব সময় সিয়ামিকে উৎসাহ দিতেন। বলতেন, ও এক দিন দেশ ও রাজ্যের জন্য ভাল কিছু করবে। আজকের এই শুভ মুহূর্তটা যদি উনি নিজের চোখে দেখে যেতে পারতেন!’
লালরেমসিয়ামির জাতীয় স্বীকৃতিতে উচ্ছ্বসিত মিজোরামের ক্রীড়াজগৎ থেকে রাজনৈতিক মহল। রাজ্যের মেয়ের ‘অর্জুন’ পুরস্কার পাওয়াকে মিজোরামের ক্রীড়াক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমা। অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, লালরেমসিয়ামির নিষ্ঠা, অধ্যবসায় আর সাফল্য মিজোরাম তথা ভারতীয় হকিকে গর্বিত করেছে। তিনি বলেন, ‘এই স্বীকৃতি বিশেষ ভাবে ঐতিহাসিক। কারণ, তিনিই প্রথম মিজো, যিনি অর্জুন পুরস্কার পেতে চলেছেন। মিজোরামের মানুষের পক্ষ থেকে লালরেমসিয়ামিকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। তাঁর সাফল্য আমাদের যুবসমাজের কাছে অনুপ্রেরণা।’ রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী লালনঘিংলোভা হামারও অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতীয় হকি দলের এই তারকাকে।
তবে এ জায়গায় পৌঁছনোর পথ মোটেই মসৃণ ছিল না লালরেমসিয়ামির। ২০০০ সালের মার্চে অসমের কাছাড় জেলার প্রত্যন্ত ডিগলাংমুখ গ্রামের এক কৃষিজীবী পরিবারে জন্ম তাঁর। পাঁচ বছর বয়সে পরিবার চলে আসে মিজোরামের কোলাসিবে। সেখানেই ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় হকি। লালরেমসিয়ামির প্রতিভা প্রথম নজরে পড়ে তাঁর শিক্ষিকাদের। তাঁরা তাঁকে হকি খেলার জন্য উৎসাহ দেন। তাঁদের উৎসাহ ও সহযোগিতাই পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্তরে পৌঁছনোর রাস্তা খুলে দেয়।
মাত্র ১১ বছর বয়সে, ২০১১ সালে, আইজল থেকে প্রায় ৯১ কিলোমিটার দূরের থেনজলে রাজ্য পরিচালিত হকি অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন লালরেমসিয়ামি। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর কঠোর অনুশীলন। ২০১৬ সালে বড়ো সুযোগ আসে। দিল্লির জাতীয় হকি অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণের জন্য ডাক পান তিনি। জাতীয় স্তরে তাঁর উত্থানও দ্রুত। ২০১১ সালের অক্টোবরে ‘জুনিয়র নেহরু হকি প্রতিযোগিতা’য় জাতীয় মঞ্চে আত্মপ্রকাশ। তার পর ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৮ দলে জায়গা করে নেন এশিয়ান কাপের জন্য। ২০১৭ সালে প্রথম বার ভারতীয় সিনিয়র দলে ডাক পান লালরেমসিয়ামি। সে দলই এশিয়া কাপের সোনা জেতে। তার পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ভারতীয় মহিলা হকি দলের তারকা হয়ে ওঠেন তিনি। একের পর এক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকেন।২০১৮ সালের এশিয়ান গেমসেও তৈরি হয় ইতিহাস। ভারতীয় দল রুপোর পদক জিতলে মিজোরামের প্রথম ক্রীড়াবিদ হিসাবে এশিয়ান গেমসে পদক জয়ের নজির গড়েন লালরেমসিয়ামি।
তবে ২০১৯ সালটি তাঁর জীবনে একেবারেই অন্য রকম। জুন মাসে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর বাবা লালথানসাঙ্গা জোটে। সেই গভীর শোকের মধ্যেও জাতীয় দলের সতীর্থদের ছেড়ে যাননি লালরেমসিয়ামি। জাপানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের মহিলা সিরিজে দেশের হয়ে খেলতে সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জাপানকে হারিয়ে সে সিরিজ জেতে ভারত। একই সঙ্গে অলিম্পিক্সে খেলার যোগ্যতাও অর্জন করে ভারতীয় দল। ধারাবাহিক সাফল্যের হাত ধরেই মিজোরামের প্রথম মহিলা হিসেবে অলিম্পিক্সে অংশ নেওয়ার নজির গড়েন লালরেমসিয়ামি। টোকিও অলিম্পিক্সে ভারতীয় মহিলা হকি দল চতুর্থ স্থান অর্জন করে। পদক না এলেও সে অভিযান ভারতীয় হকির ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসাবে সেখানে ছিলেন লালরেমসিয়ামিও।
অলিম্পিক্সে অংশ নেওয়ার নজিরের পাশাপাশি মিজোরামের ক্রীড়াক্ষেত্রেও তাঁর হাত ধরে নতুন অধ্যায় এসেছে। এর আগে তিরন্দাজ সি লালরেমসাঙ্গা ১৯৯২ সালের বার্সেলোনা এবং ১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিক্সে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তাঁর ২৫ বছর পরে মিজোরাম থেকে দ্বিতীয় অলিম্পিয়ান হিসাবে উঠে আসেন লালরেমসিয়ামি। তবে মহিলা হিসাবে তিনিই প্রথম। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের ‘উইমেনস রাইজিং স্টার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জেতেন লালরেমসিয়ামি। এ পুরস্কার পাওয়া প্রথম ভারতীয় মহিলা হকি খেলোয়াড়ও তিনি। এ বার সেই সাফল্যের মুকুটে যোগ হতে চলেছে আরও একটি পালক— অর্জুন।
❤ Support Us





