- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ৬, ২০২৬
হট্টগোলের মধ্যেই লোকসভায় পাশ কর-সংক্রান্ত বিল, ‘ইউপিআই’ বিনিময়ে গুনতে হবে অতিরিক্ত টাকা ?
সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের ১৪তম দিনেও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরল না দু-কক্ষের কাজকর্ম। বিরোধীদের লাগাতার স্লোগান, বিক্ষোভ এবং আলোচনার দাবির মধ্যেই লোকসভায় পাশ হয়ে গেল গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্যাক্সেশন অ্যান্ড আদার লজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। বিরোধীদের তীব্র প্রতিবাদের কারণে বিলটি নিয়ে কোনোরকম আলোচনাই হয়নি। ধ্বনিভোটে বিল পাশ হওয়ার পর দিনের মতো মুলতুবি করে দেওয়া হয় লোকসভার অধিবেশন। সরকারের দাবি, এই সংশোধনী দেশের কর কাঠামোকে আরও আধুনিক করার পাশাপাশি দেশীয় ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে এবং ভারতের ডিজিটাল পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, এই বিলের আড়ালে ইউপিআই-এর মতো জনপ্রিয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় ভবিষ্যতে অতিরিক্ত চার্জ আরোপের রাস্তা খুলে দেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই বিরোধী সাংসদরা বিভিন্ন ইস্যুতে সরব হন। অযোধ্যার রামমন্দিরে দান সংক্রান্ত অভিযোগ, ছাত্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনার দাবি জানান তাঁরা। বিরোধীদের বক্তব্য, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু নিয়ে সংসদে আলোচনা না করে সরকার একের পর এক বিল পাশ করিয়ে নিতে চাইছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন লোকসভায় ‘ট্যাক্সেশন অ্যান্ড আদার লজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ পেশ করেন। বিরোধীদের স্লোগান চলতে থাকলেও বিলটি ধ্বনিভোটে গৃহীত হয়। এ বিলের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০০৭’-এর সংশোধন। বর্তমানে আইনের ১০এ ধারায় নির্দিষ্ট কিছু ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থার উপর ব্যাঙ্ক বা পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির কোনো ধরনের চার্জ নেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সে বিধানে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্র ভবিষ্যতে বিজ্ঞপ্তি জারি করে নির্দিষ্ট ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে চার্জ আরোপের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে ‘ইউপিআই’ লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ বা ‘এমডিআর’ নেওয়া হয় না। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী ইউপিআই-এর মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করলে তাঁকে আলাদা করে কোনো পরিষেবা মূল্য দিতে হয় না। এ ব্যবস্থা ইউপিআই-এর দ্রুত জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও, বিভিন্ন ব্যাঙ্ক ও ডিজিটাল পেমেন্ট শিল্পের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, এই বিপুল ডিজিটাল পরিকাঠামো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি স্থায়ী আর্থিক মডেল প্রয়োজন। তাঁদের বক্তব্য, কোটি কোটি লেনদেনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য নিয়মিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। কেন্দ্র সরকারের বক্তব্যও একই। তাদের মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে ব্যাঙ্ক, পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলির জন্য একটি নির্ভরযোগ্য রাজস্ব কাঠামো তৈরি করতে হবে।
ইউপিআই-তে এমডিআর চালুর সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রার মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মতো জনপরিকাঠামো পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন। সে খরচ শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো উপায়ে বহন করতেই হবে। মালহোত্রার বক্তব্য, ‘হয় সাধারণ মানুষ করের মাধ্যমে এ খরচ বহন করবেন, অথবা ব্যবহারকারী অর্থ প্রদান করবে—এই নীতির ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।’ তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, এই মুহূর্তে ‘এমডিআর’ চালু করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাঁর মতে, ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপরিকাঠামোয় পরিণত হয়েছে। তাই এর ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
এই বিল নিয়ে কেন্দ্রকে তীব্র আক্রমণ করেছে কংগ্রেস। দলের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ অভিযোগ করেন, এই সংশোধনীর মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদির সরকার ‘ইউপিআই’ ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, এত দিন ‘ইউপিআই’-কে বিনামূল্যে রাখার যে আইনি নিশ্চয়তা ছিল, নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে তা সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ ব্যবহারকারী এবং ছোটো ব্যবসায়ীদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। রমেশের বক্তব্য, ‘ইউপিআই’ ভারতের ডিজিটাল জনপরিকাঠামোর অন্যতম সফল উদাহরণ। এ ব্যবস্থাকে চালিয়ে যাওয়ার জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষ বা ব্যবসায়ীদের উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানোর প্রয়োজন নেই। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক চাপের কারণেই কি ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে ?
এদিকে, সংসদের চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশনেই ‘মহিলা সংরক্ষণ বিল’ এবং ‘ডিলিমিটেশন বিল’ পাশ করানোর জন্য নতুন করে উদ্যোগ শুরু করেছে কেন্দ্র। ‘মহিলা সংরক্ষণ বিল’-এ ২০২৯ সাল থেকে লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভাগুলিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে ‘ডিলিমিটেশন বিল’-এর মাধ্যমে লোকসভার আসনসংখ্যা বাড়িয়ে ৮১৬ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে ঐকমত্য তৈরির জন্য সরকার কংগ্রেস এবং এনডিএ-র শরিক দলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। কেন্দ্রের লক্ষ্য, বিরোধীদের আপত্তি দূর করে সর্বসম্মতভাবে বিল পাশ করানো। তবে এর আগে একই ধরনের উদ্যোগ সংখ্যার অভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে এবার সরকার কতটা সমর্থন জোগাড় করতে পারে, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে নজর রয়েছে। তবে, সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু অবশ্য জানিয়েছেন, ১৬ থেকে ১৮ আগস্টের মধ্যে কোনো বিশেষ অধিবেশন ডাকার পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই।
অন্যদিকে, রাজ্যসভায় বৃহস্পতিবার পাশ হয়েছে ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন (নং ৩) বিল, ২০২৬’। এ বিলের মাধ্যমে ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুমোদিত বরাদ্দের অতিরিক্ত যে অর্থ খরচ হয়েছে, তা ভারতের সঞ্চিত তহবিল থেকে ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানান, অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল মূলত দুটি ক্ষেত্রে। এর মধ্যে একটি ছিল রেল মন্ত্রকের সঙ্গে সম্পর্কিত আদালতের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে হওয়া প্রায় ১৯৬.৪৪ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়। অন্যটি ছিল প্রায় ৫৩,৮৭১ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ সংক্রান্ত ব্যয়। অর্থমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, ঋণ পরিশোধ সংক্রান্ত অর্থ সরকারি বন্ড বা সিকিউরিটি জারির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ফলে এর কোনো অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তৈরি হয়নি।
রাজ্যসভাতেও এ দিন বিরোধীদের প্রতিবাদ অব্যাহত ছিল। ছাত্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিবৃতি দাবি করে কংগ্রেস-সহ কয়েকটি বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। এর আগে রাজ্যসভায় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এবং বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। রিজিজুর অভিযোগ, খাড়্গে প্রতিদিন একই বিষয় তুলে ধরে সংসদের কাজ ব্যাহত করছেন। তিনি সংসদের নিয়মের উল্লেখ করে বলেন, কোনো বিষয়ে এক বার বক্তব্য রাখার পর একই বিষয় বারবার তোলা যায় না। পাল্টা জবাবে কংগ্রেস সভাপতি বলেন, তিনি কী বলবেন, কখন বলবেন এবং কীভাবে বলবেন, তা তাঁর অধিকার। বিরোধীদের প্রতিবাদকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ বলেও দাবি করেন তিনি।
❤ Support Us






