- বি। দে । শ
- আগস্ট ৬, ২০২৬
গোপনে থেকেই ডিসেম্বরে দেশে ফেরার দাবি শেখ হাসিনার, কতটা বাস্তব ?
দেশ ছাড়বার দু-বছর পার। ২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের চাপে ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়েন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন তিনি। ঢাকা বারবার দাবি করেছে, দিল্লির সুরক্ষিত এলাকায় রয়েছেন মুজিব কন্যা। সেখান থেকে বারবার দেশকে উপ্তপ্ত করার নির্দেশ দিচ্ছেন, যদিও এ অভিযোগ প্রসঙ্গে পরিষ্কার কোনো বার্তা দেয়নি মোদি সরকার। বুধবার, আরও একবার দলীয় কর্মী ও আওয়ামী সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন তিনি। দেশে ফিরলেই গ্রেফতার, এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কার কথাও নিজেই স্বীকার করেছেন। তবু তাঁর ঘোষণা, ‘আমাকে মেরে ফেলুক, তবুও ফিরব।’
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর এ বার্তা শুধু তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে রাজনৈতিক আহ্বান নয়, বরং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের উপরও নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। বুধবার দিল্লিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে হাজির হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার কারণেই তিনি সামনে আসেননি। গোপন ডেরা থেকে অডিও বার্তায় তিনি জানান, বাংলাদেশের বিজয় দিবসের মাস, অর্থাৎ ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন। হাসিনার এই ঘোষণার পরই কূটনৈতিক মহলে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি প্রশ্ন— সত্যিই কি তাঁর বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে, নাকি এটি রাজনৈতিকভাবে সমর্থকদের চাঙ্গা রাখার কৌশল ?
এদিন, অডিও বার্তায় শেখ হাসিনা দাবি করেন, ১৯৮৩ এবং ২০০৭ সালেও তাঁকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। হত্যার হুমকিও এসেছিল। কিন্তু কোনো শক্তিই তাঁকে আটকাতে পারেনি। এবারও পারবে না। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। আওয়ামি লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া উচিত। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। জুলাই আন্দোলনকে তিনি ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন না বলে ‘পরিকল্পিত সরকার পতনের ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন ‘কোটা আন্দোলন’-এর সুযোগ নিয়ে সংগঠিত গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় হামলা চালিয়েছিল এবং সে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল। তদন্ত কমিশন গঠন করলেও পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান বিএনপি সরকারের সরকারি বিবরণের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারেক প্রশাসনের দাবি, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের দায়েই হাসিনা সরকারের পতন হয়েছিল। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী সে দমন অভিযানে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন বলে আন্তর্জাতিক মহলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, হাসিনার বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ সম্ভবত ভারতকে ঘিরে। এদিন তিনি বলেছেন, ‘ভারত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু ছিল, আছে, থাকবে। সংকটের সময় আবারও সে ভারতই আশ্রয় দিয়েছে।’ তাঁর, এ মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ গত দুই বছর ধরে ঢাকা একাধিকবার দিল্লির কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু ভারত এ পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে জানায়নি। বরং ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ধারাবাহিকভাবে বলেছে, এটি সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়, সরকারের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
হাসিনার সাম্প্রতিক ভার্চুয়াল ভাষণ নিয়েও বাংলাদেশের তরফে কড়া আপত্তি জানানো হয়েছে। ঢাকার বক্তব্য, ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশের পলাতক এক নেতার রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে দিল্লির বক্তব্য, এটি সরকারের অনুষ্ঠান নয়, ব্যক্তিগত একটি আয়োজন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ঘোষণা আর বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন। বিভিন্ন মামলায় আদালতের রায়ও এসেছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তাঁকে ফাঁসির সাজা শোনানো হয়েছে। বিএনপি সরকার তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে চায়। ফলে তিনি সীমান্ত পার করলেই আইন অনুযায়ী তাঁকে গ্রেফতারের সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল।
অন্যদিকে ভারতের অবস্থান এখনো অপরিবর্তিত। দিল্লি প্রকাশ্যে বলেনি যে, তারা তাঁকে বাংলাদেশে পাঠাবে, আবার স্থায়ী রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার ঘোষণাও করেনি। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তনের আগে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আইনি ও কূটনৈতিক স্তরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রয়োজন হবে। পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা মূলত আওয়ামি লীগের কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে একটি রাজনৈতিক সংকেত। ২০২৪ সালের ক্ষমতাচ্যুতির পর দলটি কার্যত সাংগঠনিক সঙ্কটে পড়েছে। নেতৃত্বের বড়ো অংশ বিদেশে বা আইনি জটিলতায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দলীয় কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরির চেষ্টা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। একই সঙ্গে তিনি আবারও নিজেকে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বার্তাও দিলেন।
শেখ হাসিনা নির্দিষ্ট কোনো দিন ঘোষণা করেননি। তবে বিজয় দিবসের মাসের কথা উল্লেখ করায় রাজনৈতিক মহলের অনুমান, ১৬ ডিসেম্বরের আগে কোনো সময় দেশে ফেরার পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন তিনি। তবে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের উপর—ভারতের আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থান, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও বিচারিক পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনার নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশল। আপাতত এতটুকুই স্পষ্ট, হাসিনার অডিও বার্তা শুধু একটি প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা নয়; এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আওয়ামি লীগের ভবিষ্যৎ—এই তিনটি ক্ষেত্রেই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা করল। ডিসেম্বরে তিনি সত্যিই ঢাকা পৌঁছতে পারবেন কি না, সে উত্তর এখনো সময়ের হাতেই রয়ে গেল।
❤ Support Us








