- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- আগস্ট ৪, ২০২৬
পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনার আবহে ইরানে রাষ্ট্রদূত বদল ভারতের, হরমুজ ঘিরে বাড়ছে চাপানউতোর
পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালী ঘিরে আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন এবং ইরান–আমেরিকার সম্পর্কের নতুন সমীকরণের আবহে ইরানে রাষ্ট্রদূত বদল করল ভারত। অভিজ্ঞ কূটনীতিক বিশ্বেশ নেগিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে ভারতের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমান রাষ্ট্রদূত রুদ্র গৌরবকে ইতিমধ্যেই তুরস্কে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রকের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত ২০০২ ব্যাচের ভারতীয় বিদেশ পরিষেবা (আইএফএস)-এর কর্তা বিশ্বেশ নেগিকে ইরানে ইরানে ভারতের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই তিনি তেহরানে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।
ভারত ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং জ্বালানি সহযোগিতার উপর দাঁড়িয়ে। পশ্চিম এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই নিয়োগকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। কারণ, একদিকে ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে চাবাহার বন্দর, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পে ভারতের স্বার্থও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিশ্বেশ নেগির সামনে তেহরানের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার বড় দায়িত্ব থাকবে।
কূটনৈতিক জীবনে বিশ্বেশ নেগির অভিজ্ঞতা যথেষ্ট বিস্তৃত। বর্তমানে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এর আগে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব (আন্তর্জাতিক সহযোগিতা) পদে কর্মরত ছিলেন। সেই সময়ে প্রতিরক্ষা কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা আলোচনায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর্মেনিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক অংশীদারিত্ব এবং প্রতিরক্ষা শিল্প সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাতেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
শুধু প্রতিরক্ষা কূটনীতিই নয়, জাতিসংঘের রাজনৈতিক বিভাগের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে নেগির। সেখানে আন্তর্জাতিক নীতিগত বিষয় এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সংক্রান্ত বিষয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ওশেনিয়া বিভাগের যুগ্ম সচিব হিসেবে ভারত–পাপুয়া নিউ গিনি পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ বৈঠক-সহ একাধিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন এক সময়ে নেগি ইরানের দায়িত্ব নিতে চলেছেন, যখন পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ইজরায়েল–ইরান সংঘাত, মার্কিন চাপ, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার আবহে ভারতের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা মোটেই সহজ হবে না।
এদিকে, একই দিনে ইরান আরও দুই নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। ইজরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ওমিদ বেহজাদ এবং পুরিয়া সাফভাত নামে দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি প্রশাসন। অভিযোগ, সাম্প্রতিক সংঘাত চলাকালীন তাঁরা ইজরায়েলের কাছে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছবি ও তথ্য পাঠিয়েছিলেন। এই দুই মৃত্যুদণ্ডের পর গত চার মাসে গুপ্তচরবৃত্তি ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগে ইরানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তের সংখ্যা প্রায় ৫০-এ পৌঁছেছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও গত কয়েক মাসে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের পর ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের উপর নতুন করে হামলা চালায়। ইজরায়েলি সামরিক কৌশল সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের দাবি, মার্চ মাসে গুপ্তচরদের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-এর একাধিক চেকপয়েন্টকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। ২৪ জুলাই প্রকাশিত ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত চার মাসে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগে অন্তত ৫০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ইরান। তাঁদের মধ্যে ১৮ ও ১৯ বছর বয়সী একাধিক তরুণ-তরুণীও রয়েছেন। যদিও জেনেভায় অবস্থিত ইরানের স্থায়ী মিশন এ বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। অতীতে তেহরান বন্দি নির্যাতনের অভিযোগ যেমন অস্বীকার করেছে, তেমনই মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত অভিযোগও স্বীকার করেনি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানকে নতুন করে কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, মার্কিন হামলা এড়াতে এবং একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছতে ইরানের হাতে এটাই শেষ সুযোগ। ট্রাম্প বলেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং খুব শীঘ্রই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব। তাঁর দাবি, প্রথম ধাপে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার প্রশ্নে সমাধান হওয়া প্রয়োজন। এরপর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কোনও অবস্থাতেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র রাখার অনুমতি দেওয়া হবে না এবং একটি ভাল চুক্তিতে পৌঁছনোর এটিই তেহরানের শেষ সুযোগ। সোমবার আরও একটি বিবৃতিতে ইরানের নেতৃত্বকে ‘দ্বিমুখী’ বলেও আক্রমণ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর অভিযোগ, একদিকে ইরান আলোচনার আগ্রহ দেখায়, আবার বৈঠকের সময় ঘনিয়ে এলে আলোচনার অস্তিত্বই অস্বীকার করে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী নিয়ে প্রকাশ্যে শক্ত অবস্থানের কথাও বলে। ট্রাম্পের দাবি, বাস্তবে হরমুজ প্রণালীর উপর আমেরিকারই নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং ওয়াশিংটন না চাইলে ইরানে কোনও সরবরাহ পৌঁছতে পারবে না।
তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে গুরুত্ব দিতে নারাজ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনেইর জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই। তাঁর বক্তব্য, ইরান ইতিমধ্যেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে এবং হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে হলে নির্ধারিত নিয়মই মানতে হবে। রেজাইয়ের দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একসময় ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের অধীনে হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত ইরানের ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পরে সেই সমঝোতা ভঙ্গ করে এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত প্যানেলের সঙ্গে কোনও আলোচনা না করেই হামলা চালায়। তাঁর কথায়, সেই চুক্তি লঙ্ঘনের জবাব হিসেবেই ১৭ দিনের সংঘাতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করেছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, একদিকে যখন ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে, অন্যদিকে ভারতের রাষ্ট্রদূত পদে এই পরিবর্তন নয়াদিল্লির পশ্চিম এশিয়া নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ, আগামী দিনে ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
❤ Support Us







