- দে । শ
- আগস্ট ৪, ২০২৬
অব্যবহৃত ‘সিএসআর’ তহবিল, রাজ্যভিত্তিক ব্যয়েও নেই সমবণ্টনের নীতি : সংসদে জানাল কেন্দ্র
কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা ‘সিএসআর’ খাতে সংস্থাগুলির অব্যবহৃত অর্থের কোনো কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার সরকারের কাছে নেই। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন রাজ্যে ‘সিএসআর’ ব্যয়ের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন নিশ্চিত করার জন্যও কেন্দ্রের কোনো নির্দিষ্ট নীতি নেই। সংসদে এমনটাই জানাল কেন্দ্র সরকার। সরকারের বক্তব্য, এ খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা, অগ্রাধিকার এবং বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের ওপর নির্ভরশীল।
লোকসভায় কংগ্রেস সাংসদ সশীকান্ত সেথিলের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে কর্পোরেট বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হর্ষ মালহোত্রা জানান, গত তিন আর্থিক বছরে রাজ্যভিত্তিক ‘সিএসআর’ ব্যয়ের তথ্য সংস্থাগুলির বার্ষিক রিটার্ন থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু সংস্থাগুলির অব্যবহৃত ‘সিএসআর’ তহবিলে কত টাকা পড়ে রয়েছে, তার কোনো তথ্য কেন্দ্র সরকার সংরক্ষণ করে না। মন্ত্রী জানান, ‘কোম্পানিজ অ্যাক্ট, ২০১৩’-এর ১৩৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো সংস্থার চলমান ‘সিএসআর’ প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ আর্থিক বছর শেষে অব্যবহৃত থেকে গেলে, সে অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে একটি পৃথক ‘আনস্পেন্ট সিএসআর অ্যাকাউন্ট’-এ স্থানান্তর করতে হয়। পরবর্তী তিন আর্থিক বছরের মধ্যে সে অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও অর্থ ব্যয় না হলে, তা ‘কোম্পানিজ অ্যাক্ট’-এর তফসিল-৭–এ উল্লিখিত সরকারি তহবিলগুলির একটিতে জমা করতে হয়।
অন্যদিকে, যে ‘সিএসআর’ প্রকল্পগুলি চলমান নয়, সে ক্ষেত্রে অব্যবহৃত অর্থ আর্থিক বছর শেষ হওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই তফসিল-৭-এ উল্লেখিত তহবিলে জমা করার বিধান রয়েছে। তবে সংসদে কেন্দ্রের আরও একটি বক্তব্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে ‘সিএসআর’ ব্যয়ের অসম বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। শিল্পোন্নত রাজ্যগুলিতে কর্পোরেট সংস্থার উপস্থিতি বেশি হওয়ায় ‘সিএসআর’ ব্যয়ের সিংহভাগও সেখানেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। তুলনায় পিছিয়ে থাকা বা কম শিল্পোন্নত রাজ্যগুলি অনেক কম অর্থ পাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্র সরকার জানায়, ‘সিএসআর’ সম্পূর্ণভাবে ‘বোর্ড-ড্রিভেন প্রসেস’। সংস্থার CSR কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরিচালনা পর্ষদই প্রকল্প নির্বাচন, অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ, বাস্তবায়ন আর নজরদারির দায়িত্ব পালন করে। ‘কোম্পানিজ অ্যাক্ট’-এ সংস্থাগুলিকে তারা যেখানে ব্যবসা পরিচালনা করে, সেই স্থানীয় এলাকা ও অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও, প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে এই বিধান নির্দেশমূলক, বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ কোনো সংস্থাকে আইনত নির্দিষ্ট কোনো রাজ্য, জেলা বা অঞ্চলে এ অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করা যায় না।
হর্ষ মালহোত্রা আরও বলেন, সংস্থাগুলির উচিত স্থানীয় প্রয়োজনের পাশাপাশি জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়গুলিও বিবেচনায় রাখা। তবে সরকার কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় কিংবা কোনো নির্দিষ্ট খাতে ‘সিএসআর’ ব্যয়ের নির্দেশ দিতে পারে না। কেন্দ্রের এ অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রশ্নকারী কংগ্রেস সাংসদ সশীকান্ত সেথিল। তিনি বলেন, সরকারের এই জবাব ‘সিএসআর’ বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও নীতিগত দিশার অভাব স্পষ্ট করে দিয়েছে। সেথিলের অভিযোগ, ‘যে সরকার অব্যবহৃত ‘সিএসআর’ তহবিলের তথ্য সংরক্ষণ করে না, কোথায় সামাজিক বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো নীতিগত দিশাও দেয় না, তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দাবি করতে পারে না।’
সশীকান্ত সেথিলের মতে, ‘সিএসআর’ –কে সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু যথাযথ নজরদারি ও জবাবদিহির অভাবে তা অনেক ক্ষেত্রেই কেবল আনুষ্ঠানিকতা পূরণের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। কেন্দ্রের কাছে তাঁর দাবি, ‘সিএসআর’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও অব্যবহৃত অর্থের উপর নজরদারির জন্য একটি স্বচ্ছ জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলা হোক। পাশাপাশি, যে সব অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে ‘কর্পোরেট সামাজিক বিনিয়োগ’ থেকে বঞ্চিত, সেখানে সংস্থাগুলিকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্যও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ভারতে ‘কোম্পানিজ অ্যাক্ট, ২০১৩’-এর ১৩৫ নম্বর ধারার মাধ্যমে ‘সিএসআর’ ব্যয় বাধ্যতামূলক করা হয়। বিশ্বের প্রথম কয়েকটি দেশের মধ্যে ভারতই অন্যতম, যেখানে আইন করে কর্পোরেট সংস্থাগুলির সামাজিক দায়বদ্ধতার ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, যে সব সংস্থার ‘নিট’ সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা, অথবা বার্ষিক টার্নওভার ১,০০০ কোটি টাকা, কিংবা মুনাফা ৫ কোটি টাকা বা তার বেশি, তাদের আগের তিন আর্থিক বছরের গড় মুনাফার অন্তত ২ শতাংশ এ খাতে ব্যয় করতে হয়। সে অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য দূরীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, গ্রামীণ উন্নয়ন, নারী-পুরুষ সমতা, দক্ষতা উন্নয়ন-সহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করার আইনত বিধান রয়েছে। তবে কোথায়, কীভাবে সে অর্থ ব্যয় হবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের হাতেই রয়ে গেছে।
❤ Support Us





