- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ৪, ২০২৬
‘শক্ত ঘাঁটি’ বাঁকিপুরে অপ্রত্যাশিত হার বিজেপির! জনাদেশ মেনে একাধিক কারণ দর্শালেন নিতিন নবীন
বিহারের রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপির অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর দলের অন্দরে শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনা। দীর্ঘদিনের ‘অভেদ্য দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত এ আসনে জনসুরাজ পার্টির নেতা প্রশান্ত কিশোরের কাছে হার বিজেপিকে স্পষ্ট অস্বস্তিতে ফেলেছে। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের বহু বছরের আসন, ফলে এ ফলাফলকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
দলের প্রাথমিক পর্যালোচনায় বিজেপির একাংশের মতে, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের অহংবোধ এবং ভোটারদের মনোভাব সঠিকভাবে বুঝতে না পারাই পরাজয়ের অন্যতম কারণ। বিহারে বিজেপির দুই শরিক দল— নীতীশ কুমারের জেডিইউ এবং চিরাগ পাসওয়ানের এলজেপিও প্রায় একই মূল্যায়ন করেছে। ফলাফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিহারের এক বিজেপি নেতা বলেন, ‘আমাদের ভোটারেরাও মত বদলাতে পারেন। আমরা যা বলব, তাঁরা সবসময় তা মেনে নেবেন— এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। এই ফলাফল দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।’
ভোটের আগে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা পটনা সাহিবের সাংসদ রবিশঙ্কর প্রসাদের একটি মন্তব্যও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা যদি কুকুর বা বিড়ালকেও বিজেপির টিকিটে দাঁড় করাই, তাহলেও সে বাঁকিপুরে জিতবে।’ রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এ ধরনের মন্তব্য সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এলজেপির এক সাংসদের মন্তব্য, ‘একজন প্রবীণ সাংসদ কীভাবে এমন মন্তব্য করতে পারেন?’ বিজেপির এক সাংসদও আত্মসমালোচনার সুরে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আমরা যা করব, দেশ সেটাই মেনে নেবে, কারণ শক্তিশালী বিরোধী নেই। কিন্তু এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। মানুষ নতুন মুখ চাইছে। জনসুরাজ পার্টির প্রতিবাদী রাজনীতি মানুষের উপর প্রভাব ফেলেছে। ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে শুধু যুবসমাজ নয়, বিজেপির ঐতিহ্যগত ভোটারদের একাংশও এবার আমাদের পাশে থাকেননি।’
এই উপনির্বাচন ছিল বিহারে নীতীশ কুমারের পরিবর্তে সম্রাট চৌধরীকে মুখ্যমন্ত্রী করার পর বিজেপির প্রথম বড়ো রাজনৈতিক পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় দল ব্যর্থ হয়েছে বলেই রাজনৈতিক মহলের মূল্যায়ন। জেডিইউ-র একটি সূত্রের দাবি, নীতীশ কুমার দীর্ঘদিন ধরে উচ্চবর্ণ, দলিত এবং অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়কে এক সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণে বেঁধে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে সম্রাট চৌধরী সফল হননি। বাঁকিপুরে জয়ের পর বিজেপিকে কটাক্ষ করেন জনসুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর। তাঁর বক্তব্য, ‘নির্বাচনী প্রচারের সময় আমরা বলেছিলাম, এটি শুধু একজন বিধায়ক নির্বাচনের ভোট নয়। এটি ছিল বিহারের মানুষের পক্ষ থেকে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বার্তা দেওয়ার সুযোগ। মানুষ চান, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হোক, যিনি সৎ, গ্রহণযোগ্য এবং সম্মানজনক ভাবমূর্তির অধিকারী। অপরাধমূলক পটভূমি রয়েছে বা যার আচরণ ও সুনাম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে— এমন কাউকে তারা রাজ্যের নেতৃত্বে দেখতে চান না।’
বাঁকিপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসও এই পরাজয়কে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। বর্তমান বাঁকিপুর বিধানসভার বড়ো অংশ একসময় পটনা পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ছিল। ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বার ওই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন বর্তমান বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীনের বাবা নবীন কিশোর প্রসাদ সিন্হা। ২০০৮ সালের আসন পুনর্বিন্যাসের পর ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বার বাঁকিপুর থেকে জয়ী হন নিতিন নবীন। ফলে ওই কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির ‘পারিবারিক গড়’ হিসেবেই পরিচিত ছিল।
পরাজয়ের পর সোমবার রাতে সমাজমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান নিতিন নবীন। তিনি লেখেন, ‘বাঁকিপুর এবং মধ্যপ্রদেশের দতিয়া— এই দুই উপনির্বাচনে আমরা প্রত্যাশিত ফল পাইনি। নতুন দায়বদ্ধতার সঙ্গে আমরা এই ফলাফল বিশ্লেষণ করব। মানুষের কাছে পৌঁছানোর কাজ অব্যাহত থাকবে এবং তাঁদের আস্থা অর্জনের জন্য আমরা আরও আন্তরিকভাবে কাজ করব।’ বাঁকিপুরের ফলাফলকে তাই শুধু একটি উপনির্বাচনের হার হিসেবে নয়, বিহারে বিজেপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল, নেতৃত্ব এবং ভোটব্যাঙ্কের সমীকরণ নিয়ে নতুন করে ভাবনার সূচনা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
❤ Support Us






