- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ৪, ২০২৬
পাথর-কয়লা পাচারে পুলিশ যোগের অভিযোগ, দুই সাব-ইনস্পেক্টরের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, তদন্তের আওতায় উচ্চপদস্থ কর্তারাও
বীরভূমের পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের বেআইনি পাথর পাচার ও বিপুল সম্পত্তি গড়ে তোলার ঘটনায় পুলিশের প্রত্যক্ষ মদতের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছিল, পুলিশের ‘আশকারা’ এবং ‘প্রত্যক্ষ যোগসাজশ’ ছাড়া এত বড়ো আকারে কয়লা, গরু, পাথর কিংবা বালি পাচারের মতো বেআইনি কারবার চালানো সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল আমলে এ ধরনের একাধিক পাচারকাণ্ডে বারবার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কয়লা ও বালি পাচারের তদন্তে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। ইডি ইতিমধ্যেই রাজ্যের একাধিক আইপিএস আধিকারিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
এবার টুলু মণ্ডলের মামলাতেও পুলিশের দীর্ঘদিনের যোগসাজশের অভিযোগ সামনে এসেছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে মহম্মদবাজার থানার দুই সাব-ইনস্পেক্টর সানাউর হোসেন ও আব্দুল আলিমকে সোমবার পুলিশ লাইনে ‘ক্লোজ’ করা হয়েছে। যদিও প্রশাসনের একাংশের মতে, এই দুই অফিসার প্রকৃত অর্থে বড়ো চক্রের সামান্য অংশ মাত্র। তাঁদের দাবি, পুলিশ-প্রশাসনের নাকের ডগায় বসেই টুলু মণ্ডল কয়েকশো কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। অভিযোগ, তাঁর দখলে ছিল বিপুল নগদ অর্থ, প্রায় ১৫ কেজি সোনা, প্রায় ২৫০টি গাড়ি এবং প্রায় ৩০০ একর জমি। এত বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পুলিশের নিচুতলা থেকে উচ্চপদস্থ একাংশেরও সুবিধাভোগী হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, উচ্চপদস্থ কর্তাদের বাদ দিয়ে কেন শুধুমাত্র দুই সাব-ইনস্পেক্টরের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হলো?
বীরভূম পুলিশের একাংশের দাবি, সানাউর হোসেন ও আব্দুল আলিম টুলু মণ্ডলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পুলিশি যোগাযোগের মধ্যে ছিলেন। অভিযোগ, জমি দখল, ভয় দেখিয়ে প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষ থানায় গেলে তাঁদের এই দুই অফিসারের কাছেই পাঠানো হতো। অভিযোগ, টুলুর হয়ে অভিযোগ ‘ম্যানেজ’ করার কাজও তাঁরাই করতেন। এমনকি পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, কোন পদস্থ অফিসারের কাছে কত বড় ‘প্যাকেট’ পৌঁছাবে, সেই ব্যবস্থাপনাও নাকি এই দুই অফিসারের মাধ্যমেই হতো।
এদিকে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে টুলুর ম্যানেজার সীতেশ প্রামাণিক গ্রেপ্তার হওয়ার পর। রবিবার রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর কাছ থেকে একটি ডায়েরি উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। সেই ডায়েরিতে বহু পুলিশ আধিকারিক, নেতা-মন্ত্রী এবং আমলার নাম রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ওই তথ্য তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এরই মধ্যে নলহাটিতে রবিবার গভীর রাতে গুলির ঘটনাও নতুন করে রহস্য বাড়িয়েছে। অভিযোগ, পাথর খাদানে বিস্ফোরক সরবরাহকারী শাহে আলম এবং তাঁর দুই সহযোগীকে লক্ষ্য করে মোট ১১ রাউন্ড গুলি চালানো হয়। তিনজনই গুলিবিদ্ধ হন, যার মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। পুলিশের সন্দেহ, এই হামলার সঙ্গেও টুলু মণ্ডলের ব্যবসায়িক স্বার্থের যোগ থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সোমবার রাতে সাংবাদিক বৈঠকে বীরভূমের পুলিশ সুপার বিদিত রাজ ভুন্দেশ জানান, এখনও পর্যন্ত টুলু মণ্ডলের প্রায় ২২০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ, সোনা, জমি এবং বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ। ইতিমধ্যেই টুলুর আত্মীয় মিনার মণ্ডল এবং তাঁর ম্যানেজার সীতেশ প্রামাণিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৯ জুলাই মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে প্রায় সাড়ে ২৮ কোটি টাকা নগদ এবং ১৫ কেজি সোনা উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, মিনারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই সীতেশ প্রামাণিকের নাম উঠে আসে। জানা গিয়েছে, মুর্শিদাবাদের সালার এলাকার বাসিন্দা সীতেশ পাঁচামি ও ডেউচার পাথর খাদান এবং ক্রাশার সাপ্লাই অফিসের দায়িত্বে ছিলেন। টুলুর পাথর ব্যবসার সমস্ত আর্থিক হিসাব তাঁর কাছেই সংরক্ষিত থাকত বলে তদন্তকারীদের দাবি।
সোমবার সীতেশকে আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাঁকে সাত দিনের পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। তদন্তকারীদের দাবি, মিনার ও সীতেশকে জেরা করেই টুলু মণ্ডলের একটি গোডাউন থেকে বেআইনি প্রিন্টিং মেশিন উদ্ধার হয়েছে। পুলিশের দাবি, টুলুর মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত রিস্ট ব্যান্ডও এই মেশিনেই ছাপানো হয়েছিল। তবে তদন্তকারীদের এখন বড় প্রশ্ন, এই একই মেশিনে কি জাল ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিট) ছাপানো হতো? সেই রহস্যের উত্তর খুঁজতেই মেশিনটি ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে পুলিশ। টুলু মণ্ডল কাণ্ডে উদ্ধার হওয়া ডায়েরি, বিপুল সম্পত্তি, বেআইনি প্রিন্টিং মেশিন এবং পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ—সব মিলিয়ে তদন্ত এখন আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হতে পারে বলে মনে করছে তদন্তকারী মহল।
❤ Support Us







