- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ২৯, ২০২৫
সীমান্ত থেকে শ্রেণিকক্ষে, দরিদ্র শিশুদের শিক্ষায় সৈনিক শক্তি পালের অদম্য লড়াই
দেশরক্ষার শপথ নিয়ে সেনা পোশাক পরেছিলেন তিনি। হাতে রাইফেল, কাঁধে দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব। সেই বীর সৈনিক, সীমান্তের কঠিন জীবনের ফাঁকে কলম তুলে নিলেন আরও এক যুদ্ধের জন্য— দারিদ্র্য ও অশিক্ষার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামে নামলেন। অসম রাইফেলসের রাইফেলম্যান শক্তি পাল আজ তাই শুধু একজন সৈনিক নন, তিনি অসংখ্য দরিদ্র শিশুর ‘শিক্ষক’, অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে ছড়িয়ে প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে দিচ্ছেন আলোর দিশা।
১৯৯১ সালে শিলিগুড়ির এক সাধারণ পরিবারে জন্ম শক্তি পালের। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারান। সংসারের সমস্ত ভার এসে পড়ে মায়ের কাঁধে। মা কখনো কেরোসিন তেল বিক্রি করেছেন, কখনো ডিম বিক্রি করে সংসার টেনেছেন। শক্তির পড়াশোনার সঙ্গী ছিল হারিকেনের ক্ষীণ আলো আর মায়ের অদম্য আশা। অনাহার, কষ্ট, অভাব— সব কিছুর মাঝেও তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এক আলোকিত জীবনের। তাঁর সেই অক্লান্ত অধ্যবসায়ের ফলেই ২০০৯ সালের নভেম্বরে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায় সফল হন এবং যোগ দেন দেশের সেবায়। সেনা জীবনের প্রথম কয়েক বছর কেটেছে মায়ানমার সীমান্তে। তারপরে দায়িত্ব পড়ে আসাম ও মণিপুরে। প্রতিকূল আবহাওয়া, কঠিন ভূপ্রকৃতি বা ক্রমাগত বিপদের আশঙ্কা, কোনো কিছুই তাঁর সাহসিকতাকে টলাতে পারেনি। পরবর্তীতে ২০২২ সালের প্রজাতন্ত্র দিবস প্যারেডে নয়াদিল্লির রাজপথে সৈন্যদলের নেতৃত্ব দেওয়ার সম্মানও অর্জন করেন তিনি। এত সাফল্যের মাঝেও তাঁর মনের কোণে রয়ে গিয়েছিল একটাই চিন্তা, যদি তাঁর মতো আর কোনো শিশু অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ?
আর এই ভাবনা থেকেই শিকড়ের কাছে ফেরা, জন্ম নেয় তাঁর প্রাণের উদ্যোগ, ‘বিদ্যাছায়া পাঠশালা’। শিলিগুড়ির কাওয়াখালিতে প্রতিষ্ঠিত এই ছোট্ট বিদ্যালয়টি গত দশ বছর ধরে প্রায় ৮০ জন দরিদ্র শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছে। এখানে বই, খাতা, পেনসিল, সবই বিনামূল্যে দেওয়া হয়। কাউকে দিতে হয় না ফি, প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে খুলে যায় স্কুলের উন্মুক্ত দরজা। যাদের ভবিষ্যৎ একসময় অন্ধকারে ঢাকা ছিল, সেইসব শিশুদের প্রাণোচ্ছল কলরবে মেতে ওঠে চত্বর। রাইফেলম্যান শক্তি পাল জানিয়েছেন, ‘আমি জানি, অভাব কাকে বলে। যদি আমার প্রচেষ্টায় একটিও শিশু তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, আমি মনে করব, আমার ইউনিফর্মের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেছি।’ তাঁর উদ্যোগ শুধু শিলিগুড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়। কলকাতার দমদম ক্যান্টনমেন্ট-এর পরিত্যক্ত রেল কোয়ার্টারের পাশে বস্তির শিশুদের জন্যও তিনি বিনামূল্যে পাঠশালার ব্যবস্থা করেছেন। স্থানীয় এনজিও ‘আশার আলো’-এর সহযোগিতায় সেখানে নিয়মিত ক্লাস নেন তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা। শিশুরা পড়াশোনার পাশাপাশি শেখে শৃঙ্খলা, স্বপ্ন দেখা আর জীবনের প্রতি বিশ্বাস রাখতে। পাশাপাশি, উত্তরবঙ্গের চা-বাগান এলাকায় দরিদ্র পরিবারগুলির জন্য শক্তি ও তাঁর দল নিয়মিতভাবে পোশাক, শীতবস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
শক্তি পালের কাছে শিক্ষা এবং সেনা দায়িত্ব, দুটোই দেশ সুরক্ষার অঙ্গ। তাঁর বিশ্বাস, দেশরক্ষার অর্থ শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জ্ঞান ও সচেতনতার আলোয় গড়ে তোলাও দেশসেবা। তিনি বলেন, ‘দেশকে সত্যিকারের শক্তিশালী করতে হলে বইয়ের আলোর সঙ্গে বন্দুকের শৃঙ্খলা দুটোই প্রয়োজন।’ রাইফেলম্যান শক্তি পালের জীবন এক অনন্য উদাহরণ। সীমান্তে তিনি যেমন দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করেন, তেমনই শ্রেণিকক্ষে গড়ে তোলেন দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক। ইউনিফর্মের গর্ব তাঁর মনে যেমন আছে, তেমনি আছে শিক্ষকতার মমতা। সীমান্ত ও শ্রেণিকক্ষ—দু টোই তাঁর যুদ্ধক্ষেত্র, দুটোর অস্ত্র আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য একটাই —ভারতকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, আলোকিত করা।
❤ Support Us






