Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ২৩, ২০২৫

অরুণাচলে মূলনিবাসী মানুষের বিদ্রোহ ! ধর্মান্তরণ-বিরোধী আইন কার্যকরের দাবিতে উত্তাল বিজেপি শাসিত রাজ্য

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
অরুণাচলে মূলনিবাসী মানুষের বিদ্রোহ ! ধর্মান্তরণ-বিরোধী আইন কার্যকরের দাবিতে উত্তাল বিজেপি শাসিত রাজ্য

উত্তর-পূর্ব ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে বিদ্রোহের আগুন। এ আগুন ধর্মের নামে, সংস্কৃতির রক্ষায়, আদিবাসী অস্তিত্বের দাবিতে। রাজ্যের রাজধানী ইটানগরের রাস্তায় দেখা গেছিল অভূতপূর্ব দৃশ্য। হাজার হাজার আদিবাসী পুরুষ-মহিলা, মাথায় ঐতিহ্যবাহী টুপি, গায়ে রঙিন পোশাক, হাতে ধরা ব্যানার—‘এপিএফআরএ আইন কার্যকর করুন, আদিবাসী সংস্কৃতি বাঁচান’—এই স্লোগানে মুখর হয়ে উঠছে রাজ্যের আনাচ-কানাচ। গত সপ্তাহে, শহরের প্রাণকেন্দ্রে এ বিশাল এক মিছিলের নেতৃত্বে ছিল ইন্ডিজেনাস ফেইথ অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি অফ অরুণাচল প্রদেশ।

জানা যাচ্ছে, সেদিন রাজ্যের ২৭টি জেলার ২৬টি প্রধান জনজাতি এবং শতাধিক উপ-জনজাতির মানুষ একত্রিত হয়ে এই শান্তিপূর্ণ, কিন্তু শক্তিশালী র‍্যালিতে অংশ নেন। তাঁদের একটাই দাবি— ১৯৭৮ সালে পাশ হওয়া, কিন্তু এখনো অকার্যকর অরুণাচল প্রদেশ ফ্রিডম অফ রিলিজিয়ন অ্যাক্ট দ্রুত কার্যকর করা হোক। আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল এক গভীর ক্ষোভ— ধর্মান্তরণকে ঘিরে দীর্ঘ দিনের হতাশা। ডোনি-পোলো, বৌদ্ধধর্ম, বৈষ্ণবধর্ম এবং প্রকৃতি উপাসনার মতো ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাসগুলি আজ ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ। আদিবাসী সমাজের অভিযোগ, খ্রিস্টধর্মের প্রসার কোনো স্বাভাবিক ধর্মীয় পরিবর্তন নয়, বরং তার পেছনে রয়েছে প্রলোভন, জোর এবং প্রতারণার এক কৌশলী নকশা। সংগঠনের সভাপতি ডঃ এমি রুমি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ আইন রাজ্যের প্রথম বিধানসভার অধিবেশনেই পাশ হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনও পেয়েছিল। কিন্তু চার দশক পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত কেউ তার বাস্তবায়নের কথা ভাবেনি। প্রতিশ্রুতি মিলেছে অনেক, কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপ একটাও গ্রহণ করা হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই আইন কার্যকর হলে আমরা আমাদের সমাজের মূল ভিত্তি— সংস্কৃতি, ধর্ম, আচার, এগুলো রক্ষা করতে পারব। ধর্মান্তর বন্ধ না হলে, আগামী প্রজন্ম শুধু বইয়ে পড়বে আমাদের বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের কথা। বাস্তবে তার কিছু থাকবে না। এটা কোনো ধর্ম-বিরোধী আইন নয়। আমরা কারোর ধর্ম পালনে বাধা দিতে চাই না। কিন্তু বাইরের মিশনারিদের প্রভাব এখানে এতটাই বেড়েছে যে, আমাদের যুব সম্প্রদায় প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে ধর্মান্তরিত হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সমাজ বিভক্ত হচ্ছে, ঐতিহ্য হারাচ্ছে।’

বিক্ষোভে সামিল প্রধানত ডোনি-পোলো বিশ্বাসের অনুসারীরা, তাঁরাই এই আইনের পক্ষে সওয়াল করছেন। তাঁদের মতে, ‘ডোনি’ অর্থাৎ সূর্য আর ‘পোলো’ অর্থাৎ চাঁদ— প্রকৃতির এই উপাদানগুলির উপাসনাই তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়ের মূল। এই বিশ্বাস আজ গভীর সংকটে, কারণ খ্রিস্টান ধর্মের ব্যাপক প্রসারে বহু মানুষ ধর্মান্তরিত হচ্ছেন। অন্যদিকে, এই আইনের বিরুদ্ধে জোরদার সুর তুলেছে অরুণাচল ক্রিশ্চিয়ান ফোরাম । সংগঠনের সভাপতি তার হ মিরি অভিযোগ করেছেন, ‘এ আইন আসলে সংবিধান স্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী। মানুষের ধর্ম বদলানোর অধিকার আছে। সরকার যদি এই আইন চাপিয়ে দেয়, তা হলে রাজ্যে বিভাজনের রাজনীতি শুরু হবে। ঘৃণা বাড়বে।’ চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি এই আইন প্রত্যাহারের দাবিতে আট ঘণ্টার অনশন করেছিলেন এসিএফ-এর সদস্যরা। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন একাধিক বিধায়কও। তাঁদের বক্তব্য, এই আইন কার্যকর হলে শুধু খ্রিস্টান মিশনারিদের কাজ নয়, সাধারণ বিশ্বাসীদের ধর্মপালনেও বাধা সৃষ্টি হবে।

প্রশ্ন উঠছে, এতদিন এই আইন কার্যকর হয়নি কেন? তার উত্তর আংশিক ভাবে মিলেছে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে। মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু জানিয়েছেন, একটি জনস্বার্থ মামলার ভিত্তিতে হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নির্দেশ দেয়, ৬ মাসের মধ্যে এপিএফআরএ-র খসড়া বিধি তৈরি করতে হবে। সে সময়সীমা শেষ হতে চলেছে এই অক্টোবরেই। আদালতের সেই নির্দেশেই এখন সরকার বাধ্য হয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। বিক্ষোভ মিছিলের প্রধান বক্তা, বিশিষ্ট আইনজীবী এস. ডি. লোডা বলেছেন, ‘আমরা চাই না অরুণাচল মিজোরাম বা নাগাল্যান্ড হয়ে উঠুক। সেখানকার মানুষেরা প্রায় সবাই ধর্মান্তরিত হয়ে পড়েছেন। তাঁদের প্রাচীন বিশ্বাস আজ আর কোথাও অবশিষ্ট থাকছে না। আমরাও যদি আজ জেগে না উঠি, তাহলে আমদের ভবিষ্যৎও সে দিকেই এগোবে।’ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মূলনিবাসীদের প্রলোভন দেখিয়ে, বাইরের প্ররোচনায় বা প্রভাব খাটিয়ে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। আইন কার্যকর হলে তেমন অপচেষ্টা বন্ধ হবে।

উল্লেখ্য, এপিএফআরএ আইন অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তিকে জোর করে, লোভ দেখিয়ে বা প্রতারণা করে ধর্মান্তর করা যাবে না। যদি কেউ স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন করেন, তবে সে তথ্য জেলা প্রশাসনকে জানাতে হবে। আইন ভাঙলে রয়েছে শাস্তির ব্যবস্থাও।এই আইন বিশেষ ভাবে স্বীকৃতি দেয় রাজ্যের আদি ধর্মগুলিকে— যেমন ডোনি-পোলো, বৌদ্ধধর্ম ও বৈষ্ণবধর্ম (নোকটে ও আকা জনজাতির মধ্যে প্রচলিত)। তবে এখন রাজ্যের রাজনীতি এবং সমাজ দু-ভাগে বিভক্ত— একদিকে যারা এই আইনকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার ঢাল মনে করছেন, অন্যদিকে আছে বিশাল খ্রিস্টান জনসংখ্যা, যারা এই আইনকে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী বলেই মনে করছে। মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ মেনে সরকার দ্রুত আইন কার্যকর করার দিকে এগোবে। আগামী দিনগুলিতে, আদালতের নির্দেশ মেনে সরকার এই আইন কার্যকর করলে কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তা নিয়ে উত্তর-পূর্বের রাজ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!