Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুন ২৭, ২০২৫

কসবার ঘটনায় অভিযুক্তরা শাসক দলের ঘনিষ্ঠ, বিরোধীদের অভিযোগের পাল্টা যুক্তি পেশ তৃণমূলের। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গড়লো বিশ্ববিদ্যালয়

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কসবার ঘটনায় অভিযুক্তরা শাসক দলের ঘনিষ্ঠ, বিরোধীদের অভিযোগের পাল্টা যুক্তি পেশ তৃণমূলের। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গড়লো বিশ্ববিদ্যালয়

দক্ষিণ কলকাতার কসবা ল-কলেজ চত্বরে এক তরুণী ছাত্রীকে গার্ডরুমে একাধিক ব্যক্তি যৌন নির্যাতন চালিয়েছে, এই অভিযোগে রাজ্য জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় চলছে। ভয়াল ঘটনার পর ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছে ৩ অভিযুক্ত। বর্তমানে তারা পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক। কলেজের ওই প্রাক্তনী শাসক দলের যুব সংগঠনের ‘ঘনিষ্ঠ’ যুবনেতা বলেই পরিচিত। সূত্র অনুযায়ী, অভিযুক্ত গত ৪৫ দিন ধরে কলেজে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। বাকিরা কলেজেরই বর্তমান ছাত্র বলে জানিয়েছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই তাঁদের মোবাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল কলেজ চত্বর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত ২৫ জুন সন্ধে সাড়ে সাতটা থেকে রাত একটার মধ্যে কলেজ চত্বরে ওই ছাত্রীর উপর নৃশংসভাবে যৌন নির্যাতন চালানোর হয় বলে অভিযোগ। কসবা থানায় অভিযোগ দায়ের হওয়ার পরই পুলিশ নির্যাতিতাকে নিয়ে যায় মেডিকেলে। ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর মধ্যেই নমুনা সংগ্রহ করে নেওয়া হয়েছে বলে জানাচ্ছে লালবাজার। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্য রাজনীতি তেতে উঠেছে। বিরোধী দলগুলি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নারী নিরাপত্তা ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে। বিজেপি, কংগ্রেস, বামেদের ছাত্র-যুব সংগঠন এসএফআই-ডিওয়াইএফআই সহ একাধিক দল কসবা থানার সামনে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। বিজেপি যুব মোর্চা টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে, কংগ্রেসের প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এবং সিপিএমের ছাত্র সংগঠন কসবা কলেজের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন।

বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য, ‘তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতারা শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করছে। এমন দৃষ্টান্ত তৃণমূল আমলে বারবার দেখা যাচ্ছে।’ রাজ্যের নারীসুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘মমতার আমলে যে নারীসমাজ সুরক্ষিত নয়, তা দক্ষিণ কলকাতার কলেজের বোনের উপর নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করে দিচ্ছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতার কমিশনার এখন মমতার সঙ্গে দিঘার রথের উৎসবে ব্যস্ত। নিরাপত্তা নিয়ে কাজের সময় কোথায় ? রথের দিনে এমন বেদনার খবর শুনতে হচ্ছে। ’ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেন, ‘যখন শাসক দলের নেতারা প্রকাশ্যে পুলিশকে হুমকি দেয়, তখন পুলিশেরও শিরদাঁড়া ভেঙে পড়ে। এই ঘটনাও তারই প্রমাণ।’ এসএফআই-এর রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে-র বক্তব্য, ‘সাউথ কলকাতা ল’ কলেজকে কেন্দ্র করে অপরাধচক্র চালিয়ে এসেছে তৃণমূল। পুলিশ-প্রশাসন সকলে চুপ থাকে। আরজি করের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, এ রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা কোনো কলেজ ক্যাম্পাসে সুরক্ষিত নন।’ মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কলেজে ২০-৩০টি দুর্নীতির অভিযোগ, ধর্ষণের হুমকি, শ্লীলতাহানির অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছে এসএফআই। ঘটনার পর থেকেই কলেজের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন । ইতিমধ্যেই বিক্ষোভরত ৭ এসএফআই সমর্থককে আটক করেছে কসবা থানার পুলিশ।

নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির ঘটনা সামনে আনে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য বলেন, ‘ওই অভিযুক্ত যদি এক সময় ছাত্র পরিষদের সদস্যও হয়ে থাকেন, তাহলেও তাঁকে আড়াল করা হবে না। অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই দেখা হোক, রাজনৈতিক রং না দেখে।’ তিনি আরো জানান, কলেজে বর্তমানে কোনও সক্রিয় ইউনিট নেই। অভিযুক্তেরা সংগঠনের কোনও পদে নেই বলে দাবি করে দক্ষিণ কলকাতা তৃণমূল ছাত্রপরিষদ ও যুব সংগঠনের সভাপতি সার্থক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘যে অভিযুক্তদের সঙ্গে টিএমসিপির যোগের কথা বলা হচ্ছে, তাঁরা ছাত্র পরিষদের পদাধিকারী নন। আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

ঘটনার তীব্র নিন্দা করে দোষীদের সাজার পক্ষে সওয়াল করেছে তৃণমূল কংগ্রেসও। তবে এক্ষেত্রেও টেনে আনা হয়েছে বিজেপি শাসিত রাজ্যের তুলনা। দলের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘কোনো অপরাধীকে আমরা মিষ্টিমুখ করাই না। পুলিশ ১২ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছে।’ রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। তবে বাংলায় নির্যাতকদের পুষে রাখা হয় না। অন্য রাজ্যের মতো তাদের মালা পরিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয় না। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘জানোয়ারদের চামড়া গুটিয়ে দেওয়া উচিত। সমাজকে কলঙ্কিত করেছে ওরা। তবে বিরোধীদের মুখ খোলার অধিকার নেই, ওদের অতীতও ঘোলাটে।’ অনেকে বলছেন, তার মানে বিজেপি বা বিরোধীরা খারাপ কিছু করলে তৃণমূল সরকারও সেটা করবার লাইসেন্স পেয়ে যায় ! কসবার এই ঘটনার সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে আরজি কর হাসপাতালের নির্যাতন-হত্যাকাণ্ডের। প্রশ্ন উঠছে— শিক্ষাঙ্গনে সুরক্ষা কোথায় ? রাজনৈতিক মদতপুষ্ট অপরাধের শিকড় কতটা গভীরে ?

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই কলেজ কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তৈরি হচ্ছে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি। কলেজের অধ্যক্ষা নয়না চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘কলেজের ওই প্রাক্তনী জিবি-রেজোলিউশনের মাধ্যমে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে যুক্ত ছিল। গভর্নিং বডিকে জানিয়েছি। তদন্তে কাউকে রেয়াত করা হবে না।’ অন্যদিকে, কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। অভিযুক্তদের মোবাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি গার্ডরুমে কীভাবে কলেজের প্রাক্তন ছাত্র প্রবেশ করল, নিরাপত্তারক্ষীরা কী করছিলেন— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী দল। অভিযুক্তদের আজ আলিপুর আদালতে তোলা হলে আগামী ১ জুলাই পর্যন্ত তাঁদের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছেন বিচারক ৷


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!