Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬

‘জোড়াফুল’ নিয়ে চার মাস সময় কমিশনকে, ঋতব্রত-সহ ১০ বিধায়কের পদ খারিজেও তিন মাসের ইঙ্গিত সুপ্রিম কোর্টের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘জোড়াফুল’ নিয়ে চার মাস সময় কমিশনকে, ঋতব্রত-সহ ১০ বিধায়কের পদ খারিজেও তিন মাসের ইঙ্গিত সুপ্রিম কোর্টের

তৃণমূলের দুই শিবিরের ‘প্রতীক-যুদ্ধ’-এর মধ্যেই আরও জটিল হল দলের নাম, নির্বাচনী প্রতীক এবং বিধায়কদের সদস্যপদ ঘিরে আইনি লড়াই। এক দিকে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক এবং ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম নিয়ে কালীঘাট তৃণমূল ও ঋতব্রত তৃণমূলের বিরোধ। অন্য দিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ ১০ ‘বিদ্রোহী’ বিধায়কের বিধায়কপদ খারিজের দাবি। সোমবার দুটি পৃথক মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট কোনো বিষয়েই তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি করেনি। বরং এক ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে মোট চার মাস সময় দিয়েছে, অন্য ক্ষেত্রে স্পিকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমা না বেঁধেও সাধারণত তিন মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক নীতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

ফলে প্রস্তাবিত নভেম্বরের পুরভোটের আগে ‘জোড়াফুল’ প্রতীকের ভবিষ্যৎ কী হবে, কিংবা ঋতব্রত-সহ ১০ বিধায়কের সদস্যপদ থাকবে কি না—দু’টি প্রশ্নেরই চূড়ান্ত উত্তর এখনই মিলল না। তৃণমূলের দুই শিবিরের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিরোধের নিষ্পত্তিও আপাতত আদালত ও নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের উপর নির্ভরশীল। ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে মামলায় সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনকে প্রথমে দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার জন্য এক মাস সময় দিয়েছে। সেই শুনানি-পর্ব শেষ হওয়ার পরে কমিশনকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আরও তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করার জন্য মোট চার মাস সময় পেল কমিশন।

মামলার শুনানির শুরুতেই কালীঘাট তৃণমূলের হয়ে আইনজীবী কপিল সিব্বল এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় নাম ও প্রতীক সংক্রান্ত বিষয়ে দ্রুত শুনানি করে নিষ্পত্তির আবেদন জানান। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানতে চায়, কমিশনের কাছে দুই পক্ষের বক্তব্য পেশ এবং শুনানির প্রক্রিয়া কতটা এগিয়েছে। কালীঘাট তৃণমূলের তরফে কমিশনের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি না থাকলেও ঋতব্রত তৃণমূলের তরফে আরও সময় চাওয়া হয়। তাদের আইনজীবী মুকুল রোহতগি কমিশনের কাছে নিজেদের বক্তব্য জানানোর জন্য ছয় সপ্তাহ সময় দেওয়ার আবেদন করেন। এর পরেই আদালত জানিয়ে দেয়, এক মাসের মধ্যে দুই পক্ষের বক্তব্য শুনতে হবে কমিশনকে। দুই পক্ষকে হলফনামা এবং তার জবাবে পালটা হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। শুনানি-পর্ব শেষ হলে কমিশনকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আরও তিন মাস সময় দেওয়া হবে। এর অর্থ, আপাতত কোনও পক্ষই ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম বা ‘জোড়াফুল’ প্রতীকের উপর চূড়ান্ত অধিকার পেল না। ফলে নভেম্বরের পুরভোটের আগে প্রতীক-সংক্রান্ত জটিলতা মিটবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই গেল। একই প্রশ্ন রয়েছে উপনির্বাচন ঘিরেও।

বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের অন্দরে গোষ্ঠীগত বিরোধ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে দুই শিবিরের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়। এক দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট তৃণমূল, অন্য দিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের শিবির। দুই পক্ষই নিজেদের তৃণমূল কংগ্রেসের বৈধ রাজনৈতিক সত্তা বলে দাবি করে। সেই বিরোধের জেরেই ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তী নির্দেশে ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক আপাতত ‘ফ্রিজ়’ করে। অর্থাৎ, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনও পক্ষই পুরনো নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। দলের বৈধ পরিচয়, নির্বাচনী প্রতীক, তহবিলের মালিকানা-সহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি নিয়ে শুনানি শেষ হওয়ার পরেই কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এর মধ্যেই ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন। ফলে নির্বাচনের মুখে দুই শিবিরকে অন্তর্বর্তীকালীন পৃথক নাম ও প্রতীকও দিয়েছে কমিশন। মমতা শিবিরের নাম হয়েছে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’, প্রতীক ফুটবল। ঋতব্রত শিবিরের নাম ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’, প্রতীক খাম। নন্দীগ্রামে মমতা শিবিরের প্রার্থী না থাকায় তারা কংগ্রেসকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রতীক ও দলের নাম নিয়ে এই টানাপড়েনের পাশাপাশি সমান্তরালে চলছে বিধায়কদের সদস্যপদ ঘিরে আইনি লড়াইও। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ ১০ বিধায়কের বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইন প্রয়োগ করে তাঁদের বিধায়কপদ খারিজের দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছেন মমতা শিবিরের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। সোমবার সেই মামলারও শুনানি হয় প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য স্পিকার রথীন্দ্র বসুকে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়নি শীর্ষ আদালত। তবে ২০২০ সালের একটি সাংবিধানিক রায়ের নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আদালত জানিয়েছে, দলত্যাগ-বিরোধী আইন অনুযায়ী কোনও বিধায়কের সদস্যপদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা স্পিকারেরই। তাঁকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ‘উপযুক্ত সময়’ দেওয়া উচিত। সাধারণত তিন মাসের মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রত্যাশিত বলেও আদালত উল্লেখ করেছে।

আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর ৮ জুলাই স্পিকারের কাছে শোভনদেবের করা আবেদনের দিকে নজর রয়েছে। সেই হিসাবেই আগামী ৮ অক্টোবরের মধ্যে স্পিকারের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। যদিও আদালত কোনও বাধ্যতামূলক সময়সীমা দেয়নি এবং এই মামলায় নতুন করে আর কোনো নির্দেশও দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। শোভনদেবের আইনজীবী তথা তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য শুনানির পর বলেন, তিন মাসের মধ্যে স্পিকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না হলে তাঁরা ফের আদালতের দ্বারস্থ হবেন কি না, সে বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। এই সদস্যপদ-বিতর্কের সূত্রপাত বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ঘিরে। মমতা শিবিরের ঘোষিত বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এর আগে স্পিকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা করেছিলেন। সেখানে তাঁর হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে কল্যাণের দাবি ছিল, কয়েক জন বিধায়ক আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করে দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন না। তাঁর আরও বক্তব্য ছিল, দলবিরোধী কাজের অভিযোগে তৎকালীন অবিভক্ত তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করা আইনসঙ্গত নয়।

কলকাতা হাই কোর্ট অবশ্য স্পিকারের সিদ্ধান্তের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয়নি। ১৮ অগস্ট বিচারপতি শম্পা সরকারের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিল, দু’মাসের মধ্যে বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের সিঙ্গল বেঞ্চে মামলাটির নিষ্পত্তি করতে হবে। সেই সময়ের আগে স্পিকারের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা যাবে না বলেও জানানো হয়েছিল। এর পরেই নতুন করে সুপ্রিম কোর্টে যায় মমতা শিবির। ঋতব্রত-সহ ১০ বিধায়কের বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইন প্রয়োগ করে তাঁদের সদস্যপদ খারিজের আবেদন জানানো হয়। সেই আবেদনের প্রেক্ষাপটেই স্পিকার ১৬ সেপ্টেম্বর ওই ১০ বিধায়ককে তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি এখন স্পিকারের বিবেচনাধীন।

অন্যদিকে, দলের নাম ও প্রতীক ‘ফ্রিজ়’ করার কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়েও মমতা শিবিরের তরফে রাজনৈতিক আক্রমণ অব্যাহত। বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। আগামী পুরভোটকে তিনি ‘ইমানদার বনাম গদ্দার’-এর লড়াই হিসাবেও উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যারা ‘ইমানদারদের’ সঙ্গে থাকতে চান, তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেনেন এবং তাঁদের পাশে থাকবেন। তাঁর দাবি, ‘গদ্দারদের’ কোনও জায়গা থাকবে না। ফলে একই সময়ে তৃণমূলের দুই শিবিরের সামনে দুটি আলাদা সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রশ্ন ঝুলে রইল। নির্বাচন কমিশনের কাছে এক দিকে দলের নাম ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীকের চূড়ান্ত অধিকার নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে, অন্য দিকে বিধানসভার স্পিকারের বিবেচনায় রয়েছে ঋতব্রত-সহ ১০ বিধায়কের সদস্যপদ সংক্রান্ত অভিযোগ। উপনির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী নাম ও প্রতীক নির্ধারিত হলেও দীর্ঘমেয়াদি নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। ফলে ‘জোড়াফুল’-এর মালিকানা থেকে শুরু করে বিধায়কদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—তৃণমূলের দুই শিবিরের সংঘাতের একাধিক অধ্যায়েরই চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষা এখন আদালত, কমিশন এবং স্পিকারের সিদ্ধান্তের দিকে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!