- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- ডিসেম্বর ১৭, ২০২৫
ভেনেজুয়েলা দখলের পথে ট্রাম্প ? তেল-রাস্তায় ‘সম্পূর্ণ অবরোধে’ মার্কিন নৌ-বহরের, বিশ্ব বাজারে অস্থিরতা
ভেনেজুয়েলার তেল ঘিরে সংঘাত নতুন মোড় নিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় কার্যত স্তব্ধ হয়ে গেল সেদেশ থেকে থেকে তেল রফতানির পথ। মঙ্গলবার রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক ঘোষণায় ট্রাম্প জানালেন, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ থেকে আসা ও যাওয়া সমস্ত ‘নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত’ তেল ট্যাঙ্কারের উপর জারি হচ্ছে ‘সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক’ নৌ অবরোধ। অর্থাৎ, ভেনেজুয়েলার উপকূল পেরিয়ে কোনো তেলবাহী জাহাজ আর যাতায়াত করতে পারবে না।
হোয়াইট হাউসের যুক্তি, ভেনেজুয়েলার খনি থেকে তেল ‘চুরি’ করে তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে এবং সে অর্থ ব্যবহার হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার ও মানব পাচারের মতো অপরাধমূলক কাজে। ট্রাম্পের দাবি, এ কারণেই নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে আমেরিকা। তাঁর ঘোষণার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবেই নৌ অবরোধ, এমনটাই স্পষ্ট করেছেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় করা পোস্টে কার্যত হুমকির সুরে ট্রাম্প লেখেন, ভেনেজুয়েলা বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো যুদ্ধজাহাজের বহর দিয়ে ঘেরা। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকার তেল, জমি ও অন্যান্য সম্পদ ফেরত না দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য শুধু কূটনৈতিক চাপ নয়, সরাসরি সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ইঙ্গিতও বহন করছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, বাইডেন প্রশাসনের সময় ভেনেজুয়েলা সরকার যে অবৈধ অভিবাসী ও অপরাধীদের যুক্তরাষ্ট্রে ‘পাঠিয়েছিল’, তাঁদের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে পুরনো অভিযোগগুলিকে নতুন করে সামনে আনতে চেয়েছেন তিনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণার পরই আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে চলতে থাকা উত্তেজনা তুঙ্গে। কারাকাস থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। মাদুরো প্রশাসনের অভিযোগ, আসল লক্ষ্য তেল এবং চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সরকার পরিবর্তন। ভেনেজুয়েলার সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তথাকথিত নৌ অবরোধ আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি রাষ্ট্রীয় জলদস্যুতার সামিল। মাদুরো নিজেও সরাসরি অভিযোগ করেছেন, তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরাতেই এই আগ্রাসী পদক্ষেপ। মার্কিন কংগ্রেসের অন্দরেও এই সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রবল বিতর্ক। টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট সাংসদ জোয়াকিন কাস্ত্রো স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে যুদ্ধ ঘোষণা।’ তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই প্রেসিডেন্ট এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা আমেরিকান জনগণ চান না। কাস্ত্রোর দাবি, বৃহস্পতিবার হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে একটি প্রস্তাবে ভোট হবে, যেখানে প্রেসিডেন্টকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সব ধরনের সামরিক শত্রুতা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাল্টা, ওয়াশিংটনের দাবি, ভেনেজুয়েলার উপকূলে বিপুল সেনা ও নৌবহর মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য মাদক পাচার দমন। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এ অভিযান প্রশ্নের মুখে। সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একাধিক নৌযানে হামলায় অন্তত ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রথম হামলায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় দফায় হত্যা করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শামিল হতে পারে।
ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এর প্রভাব পড়বে কি বিশ্ব অর্থনীতিতে? বিশেষ করে তেলনির্ভর দেশগুলিতে। ভারত ভেনেজুয়েলা থেকে সরাসরি অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারত ভেনেজুয়েলা থেকে প্রায় ২ কোটি ২০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল কিনেছিল। নয়া অবরোধ কার্যকর হলে সেই আমদানিতে টান পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব বাজারেও এর প্রাথমিক প্রভাব দেখা যেতে শুরু করেছে। গত পাঁচ মাসে যেখানে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল তুলনামূলক ভাবে নিম্নমুখী, সেখানে হঠাৎ করেই দামের গ্রাফে ঊর্ধ্বগতি। মাত্র ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ডব্লিউটিআই ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় এক ডলার বেড়েছে। কিছু সময় আগেও যেখানে দাম ছিল ৫৫ ডলারের আশেপাশে, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ ডলারে। স্বাভাবিক ভাবেই আশঙ্কা, বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে ভারতেও। পেট্রল ও ডিজেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। দামবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে সময় লাগবে এবং তা অনেকটাই নির্ভর করবে এই অবরোধ কত দিন স্থায়ী হয় এবং সংঘাত কোন দিকে গড়ায় তার উপর। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, ভেনেজুয়েলার তেল ঘিরে ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান শুধু লাতিন আমেরিকাই নয়, গোটা বিশ্বের শক্তির সমীকরণে নতুন করে ঢেউ তুলেছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আরোপিত এবং দ্বিতীয় মেয়াদে আরও কঠোর করা তেল নিষেধাজ্ঞায় এমনিতেই বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি। তার উপর সম্প্রতি মার্কিন আদালতের নির্দেশে ভেনেজুয়েলার তেল সংস্থা সিটগো বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যাতে কয়েকশো কোটি ডলারের দেনা মেটানো যায়। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি শুধুই নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি, না কি তেলের দখল নিতে আরো বড়ো সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে ওয়াশিংটন ?
❤ Support Us






