Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • নভেম্বর ১২, ২০২৫

‘এসআইআর’-এর চাপে বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে পুনর্মিলন ! ভোটাধিকার হারানোর পথে অনাথ, যৌনকর্মী এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘এসআইআর’-এর চাপে বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে পুনর্মিলন ! ভোটাধিকার হারানোর পথে অনাথ, যৌনকর্মী এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা

মহানগরী কলকাতার জাঁকজমক, আনন্দ-উচ্ছ্বাস, রাজনৈতিক ঘাত-অভিঘাতের তীব্র আলোর ঝলকানির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন ওঁরা। সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। আজকের ‘আধুনিক’ সমাজও তাদের বাঁকা চোখেই দেখে। সমাজের সবচেয়ে সংখ্যালঘু, সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষ তাঁরাই। কেউ সন্তানদের থেকে বিতারিত হয়ে আছেন বৃদ্ধাশ্রমে, কারোর আবার নেই পরিবারের হদিশ, জন্মের ইতিহাস অর্থাৎ অনাথ। বড়ো হয়েছেন অনাথ আশ্রমে। কেউ আবার ছিন্নমূল হয়ে যৌনপল্লীর স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার ঘরের বাসিন্দা। কারোর কারোর আবার দেখা মেলে রাস্তায়, সিগন্যাল লাল হতেই টাকা চেয়ে হাত বাড়িয়ে দেন। প্রতিনিয়ত জোটে তিরস্কার আর লাঞ্ছনা। এর বাইরেও রয়েছেন সমাজের তুলনামূলক ‘ভালো পরিস্থিতি’-তে থাকা রূপান্তরকামী, রূপান্তরিত এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা। সামাজিকভাবে তাদের উপর দমন-পীড়নের ধারাবাহিকতাও নেহাত কম নয়। রাজ্যে ‘এসআইআর’ আর কমিশনের তথ্য যাচাইয়ের মহাযজ্ঞে প্রশ্ন উঠছে— এই মানুষগুলোর কী হবে? ভারতের নাগরিগ হওয়া সত্ত্বেও তারা হারাবেন ভোটাধিকার? নাগরিকত্ব?

একসময় সংসারের অবিচল স্তম্ভ ছিলেন তাঁরা—যাঁদের হাত ধরে সন্তানরা হাঁটতে শিখেছে, খেতে শিখেছে, জীবনের ভাল-মন্দ বোঝেছে। আজ সেই বাবা-মায়েরাই পরিবারের কাছে ‘বোঝা’ হয়ে। এখন তাঁদের ঠিকানা দাঁড়িয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমের ঘরে। কারও চার বছর, কারও পাঁচ বছর কেটে গেছে প্রিয়জনের মুখ না দেখেই। অনেকেই শেষবারের মতো ফোন করেছিলেন, কিন্তু সে যোগাযোগও কেটে গিয়েছিল। জানলার ধারে বসে দিন কাটে অতীতের স্মৃতিতে। সন্তানদের ছোটবেলার দুষ্টুমি, স্কুলের প্রথম দিন, প্রথম জ্বরের রাতের নির্ঘুম প্রহর— এ সবই এখন শুধু স্মৃতির খাতা। কিন্তু হঠাৎ পরিস্থিতির বদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজ্যে চালু হওয়া ‘এসআইআর’-এর ঠেলায় নতুন করে সন্তানেরা বাবা-মায়ের কাছে ফিরবে, এটাই এখন আশ্রমের আবাসিকদের একমাত্র প্রত্যাশা।ভোটার তালিকায় নিজের নাম ঠিক রাখতে প্রয়োজন বাবা বা মায়ের নাম। সে প্রয়োজনে, হঠাৎ অনেক সন্তানই খোঁজ নিতে শুরুও করেছেন তাঁদের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের। নদীয়ার এক বৃদ্ধাশ্রমের সম্পাদক গৌরহরি সরকার জানান, ‘আমাদের এখানে প্রায় ৪০ জন আবাসিক আছেন। বেশিরভাগের সন্তানরা আগে কোনো যোগাযোগ রাখতেন না, টাকা পাঠাতেও কষ্ট হত। কিন্তু ‘এসআইআর’ চালু হতেই সেই নীরব ফোনগুলো আবার বেজে উঠছে। কেউ কেউ সরাসরি আসছেন, নথিপত্রের খোঁজ নিতে।’ অনেকে নিজের ইচ্ছায় আশ্রমে এসেছেন। প্রবীণ বাসিন্দা সুভাষ সাহা বলেন, ‘ছেলের বৌদের সঙ্গে খিটিমিটি থাকত। সম্মান বজায় রাখতে এখানে এসেছি।’ আরেক আবাসিক প্রশান্ত হালদার জানান, ‘বিয়ে-থা করিনি। দাদা-বৌদির মৃত্যুর পরে ভাইপো আমাকে রাখতে চাননি। সংসার ছেড়ে এসে আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছি। আজ এসআইআর-এর কারণে সন্তানদের মুখ দেখতে পারি, এটাই আমার শান্তি।’ তবে বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকরাও জানেন, প্রয়োজন শেষ হলে সন্তানরা আবার চলে যাবে। তবু একবারের জন্য হলেও চোখের সামনে সন্তানদের দেখতে পাওয়ার আশা নিয়ে দিন গুনছেন তাঁরা। আশ্রমের সিঁড়ি, জানলার ধারের কেবিন—সেখানে অতীত আর অপেক্ষা একাকার।

অন্যদিকে, প্রশ্ন ওঠেছে— যারা বাবা-মা হারিয়েছেন, অনাথভাবে বড়ো হয়েছেন, তাঁরা কীভাবে ভোটার হিসাবে বৈধতা নিশ্চিত করবেন? নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করবেন? কমিশনের কর্মকর্তারা এ ক্ষেত্রে বলেন, ‘কোথাও তো তাঁদের বাবা-মা থাকবেন।’ তবে বাস্তবে তা খুঁজে বের করা সহজ নয়। নথি থাকা সত্ত্বেও এ প্রক্রিয়ায় অনেক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের রূপান্তরকামী, রূপান্তরিত এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জীবন এখন এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসআইআর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, তারা বারবার ভাবছেন, তাঁদের ভোটার তালিকায় নাম ওঠার বিষয়ে নিশ্চয়তা থাকবে। অনেকের নাম পরিবর্তন হয়েছে, কেউ লিঙ্গ পরিবর্তন করেছেন, কেউ আবার পারিবারিক সহায়তা হারিয়ে ভিন জায়গায় বেঁচে আছেন। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, প্রয়োজনীয় নথি নেই। এমন পরিস্থিতিতে নিজের পরিচয় প্রমাণ করা, ভোটাধিকার নিশ্চিত করা—সবই হয়ে উঠেছে অসম্ভবের কাছাকাছি। নির্বাচন কমিশনের ১১টি নথির মধ্যে কোথাও ‘ট্রান্সজেন্ডার কার্ড’ বা রূপান্তরিত নাগরিকদের তথ্য গ্রহণের উল্লেখ নেই। জন্ম-সনদ থাকলেও বর্তমান নামের সঙ্গে মিল না থাকার কারণে অনেকেই চিন্তিত। এমনকি অনেকের পরিবারের সদস্যরা জন্ম-সনদ, পুরনো ভোটের নথি সহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে রূপান্তরকামী এবং যৌনকর্মীদের মধ্যে দিশাহারা ভাব তৈরি হয়েছে।

অ্যামিটি ট্রাস্টের সমাজকর্মী অপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এসআইআর সংক্রান্ত সমস্যা সবাই একই নয়। জেলাগুলোতে নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। তবে এখনো কমিশনের তরফে স্পষ্ট নির্দেশিকা মেলেনি। এ বিষয়ে আরো আলোচনা করা দরকার।’ তিনি অভিযোগ তুলেছেন, বারবার কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও যথাযথ সাড়া মেলেনি। রূপান্তরকামীদের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদিও, নির্বাচন কমিশন আশ্বস্ত করেছে যে বৈধ ভোটারের নাম তালিকায় বাদ যাবে না। কিন্তু বাস্তবতায় এনুমারেশন ফর্ম কোথায় পৌঁছাবে, তা নিয়ে এখনও অনেকের মধ্যে সংশয় রয়েছে। বিএলও বাড়িতে গিয়ে নির্দিষ্ট ভোটারের জন্য ফর্ম পৌঁছে দেবেন। বন্দি বা আবাসিক হোমের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে প্রশাসন বা হোম কর্তৃপক্ষ ফর্ম পূরণ ও ভোটাধিকার প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করবে। পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও বাড়ির ঠিকানায় ফর্ম পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হবে।

রাজ্যে ৫০টির বেশি যৌনপল্লিতে প্রায় ৩০,০০০ যৌনকর্মীদের বাস। তাঁদের অধিকাংশের কাছে ভোটার কার্ড নেই, প্রয়োজনীয় নথিও নেই। ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা ছোটবেলায় বাড়ি ছেড়ে এসেছেন, তাঁদের কাছে নথি নেই। ‘এসআইআর’ চালু হওয়ায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যারা মায়ের নথি হারিয়েছেন, তাদের সন্তানের ভোটার হওয়া কি সম্ভব, তা নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, বন্দি, আবাসিক হোমের বাসিন্দা, পরিযায়ী শ্রমিক ও যৌনপল্লির বাসিন্দাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে তৃতীয় লিঙ্গ ও রূপান্তরকামী, অনাথ, যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে নির্দেশিকা এখনো স্পষ্ট নয়। অনাথ আশ্রমের শিশুদের মধ্যেও এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’-র এক পদাধিকারী বলেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নাগরিকত্ব এবং ভোটাধিকার সংরক্ষণই মূল সমস্যা। শুধু বর্তমান প্রজন্মের মানুষ নয়, শিশুদের ভবিষ্যতও সংযুক্ত।’


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!