- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ১০, ২০২৬
একশো দিনের কাজের বদলে ‘জি-রাম-জি’: প্রথম মাসেই প্রায় ৫০ শতাংশ কমল গ্রামীণ কর্মসংস্থান
গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের কাজের ‘ভরসা’ বদলেছে। সরকার পরিবর্তনের পর, ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে ‘একশো দিনের কাজ’ বা ‘মনরেগা’-র পরিবর্তে শুরু হয়েছে কেন্দ্রের ‘বিকশিত ভারত—গ্যারান্টি ফর রোজগার ও জীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’, সংক্ষেপে ‘ভিবি-জি রাম-জি’। পরিসংখ্যান বলছে, নতুন প্রকল্পের প্রথম পূর্ণ মাস জুলাইয়ে কর্মসংস্থান তৈরির পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ‘জি-রাম-জি’-র অধীনে তৈরি হয়েছে ৭.৬৭ কোটি ‘পার্সন-ডে’ বা কর্মদিবস। গত বছরের জুলাইয়ে ‘মনরেগা’-র অধীনে এ সংখ্যা ছিল ১৫.৩৩ কোটি। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে কর্মসংস্থান কমেছে ৪৯.৯৪ শতাংশ। একজন মানুষ এক দিন কাজ করলে তাকে এক ‘পার্সন-ডে’ হিসাবে ধরা হয়। গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে কতটা কাজ তৈরি হয়েছে, তার হিসাব করার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি এই শুধু কাজের দিন নয়, কাজ নেওয়া পরিবারের সংখ্যাতেও একই ছবি। চলতি বছরের জুলাইয়ে ৬৮.৯৪ লক্ষ পরিবার নতুন প্রকল্পের অধীনে কাজ পেয়েছে। গত বছরের একই মাসে পুরনো প্রকল্পে কাজ পেয়েছিল ১.৪২ কোটি পরিবার। অর্থাৎ, এক বছরে কর্মসংস্থান নেওয়া পরিবারের সংখ্যা কমেছে ৫১.৪৫ শতাংশ।
গত পাঁচ বছরের হিসাবেও জুলাইয়ের এ সংখ্যা নজর কাড়ার মতো কম। গত চার বছরে প্রতি মাসে গড়ে ১.৭২ কোটি পরিবার গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের সুবিধা নিয়েছে। সেখানে এ বছরের জুলাইয়ে সে সংখ্যা নেমে এসেছে ৬৮.৯৪ লক্ষে, যা গড়ের ৪০ শতাংশেরও কম। একইভাবে, গত চার বছরে গড় ‘পার্সন-ডে’ ছিল ২১.৫৬ কোটি। জুলাইয়ে নতুন প্রকল্পে হয়েছে মাত্র ৭.৬৭ কোটি, অর্থাৎ গড়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ। তবে কর্মসংস্থান কমার প্রবণতা একেবারে নতুন নয়। ‘মনরেগা’-র শেষ দিকেও এক বছরের তুলনায় কর্মসংস্থান তৈরির পরিমাণ কমছিল। ২০২৫ সালের মার্চে ওই প্রকল্পে তৈরি হয়েছিল ১৭.৫৬ কোটি পার্সন-ডে। ২০২৪ সালের মার্চে হয়েছিল ১৭.৬৯ কোটি। অর্থাৎ, পতন হয়েছিল ০.৭০ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত, এক বছরের তুলনায় কর্মসংস্থান কমার প্রবণতা বজায় ছিল।
চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে শুরু হয় নতুন প্রকল্প। কেন্দ্রের বক্তব্য, পুরনো প্রকল্প থেকে নতুন প্রকল্পে বদলের কাজ হয়েছে নির্বিঘ্নেই। প্রশাসনিক এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোও প্রথম দিন থেকেই তৈরি ছিল। গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের এক আধিকারিকের দাবি, কর্মসংস্থানের দাবি জানানো গ্রামীণ পরিবারের ৯৮ শতাংশেরও বেশি পরিবারকে কাজের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম মাসে প্রায় ৯ কোটি ‘পার্সন-ডে’ তৈরি হয়েছে। ১.৩৩ কোটিরও বেশি গ্রামীণ শ্রমিককে তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী কাজের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ৯ লক্ষেরও বেশি সক্রিয় কর্মস্থলে কাজ চলছে বলেও দাবি মোদি সরকারের। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ৯ আগস্ট পর্যন্ত জুলাইয়ের ‘পার্সন-ডে’-র সংখ্যা ৭.৬৭ কোটি। ফলে মন্ত্রকের দেওয়া প্রায় ৯ কোটি এবং পরিসংখ্যানের ৭.৬৭ কোটির মধ্যে ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
নতুন প্রকল্পে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। ‘ন্যাশনাল মোবাইল মনিটরিং সিস্টেম’ বা ‘এনএমএমএস’-এর মাধ্যমে মুখের পরিচয় শনাক্ত করে শ্রমিকদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা হয়েছে। প্রকৃত কারণে যেখানে সে প্রযুক্তি প্রয়োগ সম্ভব নয়, সেখানে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে কেদ্রীয় শ্রম মন্ত্রক। কেন্দ্রের দাবি, এখনো পর্যন্ত তৈরি হওয়া মোট ‘পার্সন-ডে’-র প্রায় ৬৩ শতাংশই মহিলাদের অংশগ্রহণ থেকে এসেছে। অর্থাৎ, আইন অনুযায়ী এক-তৃতীয়াংশ মহিলার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার যে বিধান রয়েছে, তার তুলনায় এ হার অনেকটাই বেশি। তবে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। নতুন প্রকল্পের প্রথম মাসেই যখন কাজের পরিমাণ অর্ধেকের কাছাকাছি কমে গেল, তখন ১২৫ দিনের কর্মসংস্থানের আইনি নিশ্চয়তা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে?
কর্মসংস্থানের এ পতনের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ বার বর্ষা একেবারে স্বাভাবিক ছন্দে নেই। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ৩ আগস্টের মধ্যে দেশের ৭৪১টি জেলার অর্ধেকেই বৃষ্টির পরিমাণ ঘাটতি থেকে গুরুতর ঘাটতির পর্যায়ে রয়েছে। গ্রামের কৃষিশ্রমিকদের কাছে এ পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মসংস্থান প্রকল্পের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। চাষের কাজ কমলে বা কৃষি মরশুম অনিশ্চিত হলে সরকারি প্রকল্পই অনেক পরিবারের বিকল্প আয়ের পথ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু খারিফ চাষের ক্ষেত্রেও এ বার পিছিয়ে রয়েছে দেশ।
কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ জুলাই পর্যন্ত খারিফ ফসলের আওতায় এসেছে ৮৯৪.২২ লক্ষ হেক্টর জমি। গত বছর একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৯২০.৭২ লক্ষ হেক্টর। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে খারিফ চাষের আওতা কমেছে ২৬.৫০ লক্ষ হেক্টর। এ পরিস্থিতিতে কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগ কমলে সরকারি কর্মসংস্থান প্রকল্পের চাহিদা বাড়ারই কথা। কিন্তু জুলাইয়ের পরিসংখ্যানে উল্টো ছবিই দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এর পিছনে খারিফ চাষের মরসুমে প্রকল্পে সাময়িক বিরতি একটি কারণ হতে পারে। তবে সে বিরতির ফলে ঠিক কতটা কর্মসংস্থান কমেছে, তার কোনো নির্দিষ্ট তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। কেন্দ্রের নতুন আইনে অবশ্য বীজ বোনা এবং ফসল কাটার সর্বোচ্চ কৃষি মরসুম মিলিয়ে একটি অর্থবর্ষে মোট ৬০ দিন পর্যন্ত কর্মসংস্থান প্রকল্পে বিরতির সুযোগ রাখা হয়েছে। স্থানীয় কৃষি এবং জলবায়ু পরিস্থিতি অনুযায়ী রাজ্যগুলি সে সময় নির্ধারণ করবে।
নতুন ‘ভিবি-জি রাম-জি’ প্রকল্পেরর সবচেয়ে বড়ো ঘোষণাগুলির একটি হলো কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বাড়ানো। ‘মনরেগা’-তে একটি গ্রামীণ পরিবার বছরে ১০০ দিনের মজুরি-ভিত্তিক কাজের নিশ্চয়তা পেত। নতুন প্রকল্পে তা বেড়ে হয়েছে ১২৫ দিন। শুধু কর্মসংস্থানের দিন নয়, প্রকল্পের কাজের ধরন আর পরিকল্পনাতেও বদল আনা হয়েছে। জল সংরক্ষণ, গ্রামীণ পরিকাঠামো, জীবিকার সঙ্গে যুক্ত পরিকাঠামো, চরম আবহাওয়ার প্রভাব মোকাবিলার মতো ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ‘এমজিএনআরইজিএস’-এ গ্রামসভা বা ওয়ার্ড সভার মাধ্যমে কাজ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে গ্রাম পঞ্চায়েতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। নতুন প্রকল্পে ‘বিকশিত গ্রাম পঞ্চায়েত পরিকল্পনা’র মাধ্যমে কাজ বাছাই হবে। সে পরিকল্পনাকে ‘পিএম গতিশক্তি ন্যাশনাল মাস্টার প্ল্যান’-এর সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে পঞ্চায়েতগুলিকে এ, বি এবং সি—তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। বায়োমেট্রিক পরিচয় যাচাই, জিপিএস বা মোবাইলের মাধ্যমে কর্মস্থল পর্যবেক্ষণ, প্রকাশ্যে তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি পরিকল্পনা, অডিট এবং জালিয়াতির ঝুঁকি চিহ্নিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। শুধু প্রকল্পের নাম বা কর্মসংস্থানের দিনের সংখ্যাই বদলায়নি। বদলেছে অর্থের কাঠামোও। ‘মনরেগা’ ছিল মূলত চাহিদাভিত্তিক প্রকল্প। শ্রমিকেরা বছরের যে কোনো সময়ে কাজ চাইতে পারতেন। নতুন প্রকল্পে রাজ্যগুলির জন্য একটি নির্দিষ্ট বরাদ্দের ব্যবস্থা রয়েছে। সেই বরাদ্দের অতিরিক্ত খরচের দায়িত্ব রাজ্যগুলির উপর পড়বে। ‘মনরেগা’-য় মজুরির সম্পূর্ণ খরচ কেন্দ্র বহন করত। উপকরণ বাবদ খরচ কেন্দ্র ও রাজ্য ৭৫:২৫ অনুপাতে ভাগ করে নিত। নতুন প্রকল্পে অধিকাংশ রাজ্যের ক্ষেত্রে মোট আর্থিক দায় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ৬০:৪০ অনুপাতে ভাগ হবে। উত্তর-পূর্ব এবং হিমালয় সংলগ্ন রাজ্যগুলির জন্য সেই অনুপাত ৯০:১০। বিধানসভাহীন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ক্ষেত্রে অবশ্য পুরো খরচই বহন করবে কেন্দ্র। অর্থাৎ, নতুন প্রকল্পে রাজ্যগুলির আর্থিক দায় আগের তুলনায় বাড়ছে। সে কারণে রাজ্যগুলি কতটা আগ্রহের সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়েও ভবিষ্যতে নজর থাকবে।
তাই প্রশ্ন এখন একটাই— কাগজে ১২৫ দিনের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকলেই কি গ্রামের মানুষের হাতে বাস্তবে ১২৫ দিনের কাজ পৌঁছবে? সরকারের দাবি, নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের চরিত্র বদলাবে, তৈরি হবে আরও টেকসই সম্পদ, বাড়বে জীবিকার সুযোগ। কিন্তু প্রথম মাসের পরিসংখ্যান মোদি সরকারেরর সে দাবির সামনে বড়ো প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। আগামী কয়েক মাসের তথ্যই শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট করবে, জুলাইয়ের এ পতন কি শুধুই নতুন প্রকল্পে পরিবর্তনের ধাক্কা, খারিফ মরসুমের সাময়িক প্রভাব, না কি ‘ভিবি-জি রাম-জি’-র নতুন অর্থায়ন, প্রশাসনিক কাঠামো আর কৃষি মরসুমে কাজ বন্ধ রাখার বিধানের ফলে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগই কমে যাচ্ছে!
❤ Support Us






