- দে । শ
- আগস্ট ১০, ২০২৬
বিজেপি রাজ্য সভাপতির নাম ব্যবহার করে ভুয়ো ফোন ! তোলাবাজি ? ধৃত ভুয়ো সিমচক্রের সদস্য
হাতে প্যাকেট নিয়ে সরাসরি বঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কাছে হাজির এক রিয়েল এস্টেট সংস্থার কর্তা। তাঁর দাবি, শমীকের অফিস থেকে ফোন করে টাকা চাওয়া হয়েছিল। তাই কোনও ‘মধ্যস্থ’ ছাড়াই সরাসরি টাকা দিতে এসেছেন তিনি। ঘটনাটি শুনে কার্যত বিস্মিত শমীক। তাঁর দাবি, তাঁর নাম ও ছবি ব্যবহার করে ভুয়ো সিম তুলে ওই ফোন করা হয়েছিল। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে নেমে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ।
রবিবার দুপুরে ইএম বাইপাস সংলগ্ন একটি হোটেলে নির্মাতা ও রিয়েল এস্টেট সংস্থাগুলির সংগঠনের এক অনুষ্ঠানে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আনেন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি নিজেই। শমীক জানান, ওই রিয়েল এস্টেট কর্তা তাঁর কাছে এসে বলেন, ‘‘আপনার অফিস থেকে ফোন এসেছে। ফোনে বলেছে, কিছু তো পাঠালেন না, টাকা লাগবে। আমরা তাই দেখা করতে এলাম। মাঝখানে অন্য লোক কেন থাকবে, আমরা সরাসরি দিতে এসেছি।’’
বিষয়টি শুনে শমীক তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘‘এই গ্রুপের নাম শুনেছি, কিন্তু আপনাকে আমি চিনি না। আপনার সঙ্গে পরিচয় না থাকলে কী ভাবে টাকা চাইব? পার্টির অন্য কেউ চেয়েছে?’’ জবাবে ওই ব্যবসায়ী জানান, ‘‘আপনার ফোন থেকেই কল এসেছে।’’
এর পর ওই ব্যবসায়ীর মোবাইলের কল রেকর্ড দেখতে চান শমীক। তাঁর কথায়, ফোনে দেখা যায় তাঁর ছবি এবং নাম—‘শমীক ভট্টাচার্য’। তাঁর অভিযোগ, তাঁর নামে ভুয়ো সিম তোলা হয়েছিল। কী ভাবে সেই সিম তোলা হয়েছে, তা তাঁর জানা নেই।
ঘটনার পর রিয়েল এস্টেট সংস্থার ওই কর্তাকে দিয়ে বিধাননগর সাইবার থানায় অভিযোগ দায়ের করান শমীক। তদন্তে দেখা যায়, জলপাইগুড়ি এবং শিলিগুড়ি থেকে ওই নম্বর ব্যবহার করে ফোন করা হচ্ছিল। শমীকের দাবি, ঘটনার সাত দিন পরে সালকিয়া থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গত ৪ মে রাজ্যে পালাবদলের পর গেরুয়া শিবিরের নাম করে তোলাবাজির একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে খোদ বিজেপির রাজ্য সভাপতির নাম ব্যবহার করে টাকা চাওয়ার ঘটনা এবার প্রকাশ্যে এল। শমীক জানান, ঘটনাটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তাঁর কাছে নিয়মিতই এই ধরনের অভিযোগ আসছে।
রবিবারের অনুষ্ঠানে রাজ্যের বড় ও মাঝারি নির্মাণ সংস্থার কর্তাদের উদ্দেশে শমীকের বার্তা, দলের নাম করে কেউ তোলা চাইলে সরাসরি তাঁকে বা তাঁর অফিসকে জানাতে হবে। তিনি বলেন, ‘‘এই ধরনের ঘটনা সব জায়গায় ঘটছে। পার্টির নামে যদি কোনও তোলাবাজির কথা শুনতে পান, তা হলে আমাকে জানাবেন। আমার অফিসকে জানাবেন। আমরা দলের পক্ষ থেকে যা ব্যবস্থা নেওয়ার, নেব। মুখ্যমন্ত্রীও ইতিমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করেছেন।’’
তোলাবাজি বন্ধ করতে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার একটি টোল-ফ্রি নম্বরও চালু করেছে। যদিও বিরোধী তৃণমূলের দুই শিবিরই বার বার অভিযোগ করেছে, জরিমানা আদায় ও তোলাবাজি বন্ধ হয়নি। রবিবার তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘শমীক ভট্টাচার্যের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনি সভাপতি পদে বসে নিজের বদনাম কুড়োচ্ছেন।’’
অন্য দিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনে তৈরি হওয়া ‘তোলাবাজি সংস্কৃতি’ বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি—এ কথা গেরুয়া শিবিরের নেতারাও অস্বীকার করছেন না। শমীকের বক্তব্যেও তারই ইঙ্গিত মিলেছে।
এ দিন বণিকসভার মঞ্চে শমীক জানান, তাঁর নাম করে নিউ টাউনে একটি প্রকল্প বন্ধ করে রাখার অভিযোগও তিনি রবিবার সকালে শুনেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আজ সকালে শুনলাম, আমার নাম করে নিউ টাউনে একটি প্রজেক্ট বন্ধ করে রেখেছে। আমি গ্রেপ্তার করার জন্য খবর দিয়েছি। পুলিশ বলেছে, বিকেল ৪টের মধ্যে জানাবে, কী পদক্ষেপ করা হয়েছে।’’
নির্মাতা, প্রোমোটার ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের সংগঠনের ওই অনুষ্ঠানে গত দেড় দশকে তোলাবাজি ও ‘সিন্ডিকেট-রাজ’-এর জেরে ব্যবসায়ীদের সমস্যার প্রসঙ্গও ওঠে। তৃণমূল আমলে প্রোমোটার, বিল্ডার, রিয়েল এস্টেট কর্তা এবং ঠিকাদারদের একাংশের উপর তোলাবাজি ও সিন্ডিকেটের দাপটের অভিযোগ উঠেছিল বার বার। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও সেই প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং নতুন সরকারের আমলে গেরুয়া শিবিরের নাম করেও বিভিন্ন জায়গায় তোলা চাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে শমীক বলেন, ‘‘ফুলপ্রুফ সিস্টেম বলে কিছু হয় না। তবে আপনারা নির্ভয়ে ব্যবসা করবেন। কাউন্সিলার কোথাও ঝামেলা করলে টোল ফ্রি নম্বরে জানাবেন। যারা বিজেপি সেজে পৌঁছে গিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করেছি। কিন্তু প্রতিটি কোণার খবর নেওয়ার মতো পরিকাঠামো দলের থাকে না। আপনারাও যে খবর পাবেন, তা আমাদের জানাবেন।’’
তোলাবাজি ও ‘থ্রেট কালচার’-এর কারণে বাংলায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার উদাহরণও দেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। তাঁর দাবি, নদিয়ার এক ঠিকাদার তোলাবাজির চাপে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। আবার গুজরাটের এক বড় ব্যবসায়ীও বাংলায় বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাননি।
শমীকের বক্তব্য, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রের স্বর্ণশিল্প এবং হিরেশিল্পের সঙ্গে বাংলার কারিগরদের দীর্ঘদিনের যোগ রয়েছে। বাংলার দক্ষ কারিগরদের উপর নির্ভরশীল হলেও সুরাটের এক বড় ব্যবসায়ী তাঁকে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে ‘থ্রেট কালচার’-এর কারণে এত দিন তাঁরা এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হননি।
শমীক বলেন, ভিন্রাজ্যের ওই শিল্পপতি ও উদ্যোগপতিদের পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসার দায়িত্ব বর্তমান রাজ্য সরকারের। একই সঙ্গে তিনি জানান, বহুতল ও রিয়েল এস্টেট নির্মাণের ক্ষেত্রে নবান্ন সম্প্রতি কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর ফলে নির্মাণশিল্পে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত মিটে যাবে বলেও ব্যবসায়ীদের আশ্বাস দেন তিনি।
❤ Support Us






