- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ১০, ২০২৬
বর্ষার দাপটে বিপর্যস্ত পাহাড় থেকে সমতল, বন্যা-ধসে বিপন্ন উত্তর-পূর্ব: বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, ছিন্ন যোগাযোগ
বর্ষা এলেই উত্তর-পূর্ব ভারত এবং হিমালয়ের পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে বন্যা, ধস, হড়পা বান, রাস্তা বন্ধ এবং ঘরছাড়া মানুষের বিধস্ত জনজীবন যেন পরিচিত ছবি হয়ে উঠেছে। এ বারও তার ব্যতিক্রম হলো না। প্রবল বৃষ্টি, হরপা বান, ভূমি ধসে বিপর্যস্ত উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, অসম, অরুণাচল প্রদেশ সহ একাধিক রাজ্য। এই মুহূর্তে হিমাচল প্রদেশে ১১৮টি সড়ক অবরুদ্ধ। উত্তরাখণ্ডে ধসজাত স্রোতের সম্ভাব্য বিপদ চিহ্নিত করে ৪৯টি এলাকা চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। অসমে বন্যায় মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১০০ ছুঁয়েছে, প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ জলবন্দি। মণিপুরে হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৫০০ পরিবার এবং ৩০০ একরেরও বেশি কৃষিজমি। সিকিমেও প্রবল বৃষ্টিতে বন্ধ হয়ে গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এনএইচ-১০-এর একটি অংশ। সব মিলিয়ে বর্ষার দাপটে পাহাড় থেকে সমতল—বিস্তীর্ণ এলাকায় বিপর্যস্ত জনজীবন। প্রশ্ন উঠছে, প্রতি বছর একই ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি সত্ত্বেও স্থায়ী প্রতিরোধের ব্যবস্থা কতটা হচ্ছে ?
হিমাচল প্রদেশের বিলাসপুর জেলার মেহলা গ্রামের কাছে ধসের জেরে কিরাতপুর-মানালি চার লেনের জাতীয় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রাস্তার উপর পাথর ও ধসের মাটি এসে পড়ায় আপাতত সব ধরনের যানবাহনের চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে বিলাসপুর পুলিশ মান্ডি ভারারি চকের পর থেকে যান চলাচল স্থগিত করেছে। বিলাসপুর, হামিরপুর, মান্ডি ও কুল্লু থেকে চণ্ডীগড়গামী যানবাহনকে মান্ডি ভারারি সেতু হয়ে নওনি চকের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে এনএইচ-২০৫ ধরে স্বরঘাট হয়ে কিরাতপুরের দিকে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ঘটনায় এ পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর নেই। বিলাসপুরের পুলিশ সুপার অভিষেক ধীমান সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত বিকল্প পথ ব্যবহার করার পাশাপাশি ঘটনাস্থলে মোতায়েন পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করার আবেদন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় ভাবে কিরাতপুর-মানালি জাতীয় সড়কে যাতায়াত না করার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।
‘স্টেট ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’-এর হিসাব বলছে, প্রবল বৃষ্টির জেরে হিমাচল প্রদেশে এখনও ১১৮টি রাস্তা বন্ধ। তার মধ্যে মান্ডিতে ৪৪টি, কুল্লুতে ৩৯টি, শিমলায় ১৩টি, চাম্বায় সাতটি, সিরমৌরে ৬টি, কাংড়ায় ৫টি, উনায় ৩টি এবং সোলানে ১টি রাস্তা রয়েছে। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ১০ আগস্ট কাংড়া ও সিরমৌরে কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সেখানে বিচ্ছিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সোলান, মান্ডি এবং বিলাসপুরে জারি হয়েছে হলুদ সতর্কতা। পাহাড়ি রাজ্য উত্তরাখণ্ডেও বর্ষার বিপদ নতুন করে সামনে এসেছে। উত্তরকাশী, চামোলি এবং পিথোরাগড়— তিন জেলায় ৪৯টি এলাকা চিহ্নিত করেছে রাজ্য রকার, যেখানে ধস ও নদীস্রোত বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে। বিপন্ন হতে পারে জাতীয় সড়ক, সেতু আর জনবসতি। ভূপ্রকৃতি, ধসের চিহ্ন, হিমবাহ, জলনিকাশি পথ, জলগ্রহণ এলাকা, বসতি এবং পরিকাঠামো খতিয়ে দেখে বিশেষ সমীক্ষার মাধ্যমে এ তালিকা তৈরি হয়েছে। ৪৯টি জায়গার মধ্যে ১১টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, ৩০টি মাঝারি এবং ৮টি কম ঝুঁকিপূর্ণ।
উত্তরাখণ্ডের বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের সচিব বিনোদ কুমার সুমনের বক্তব্য, বিপদ শুধু পাহাড়ের ঢাল ভেঙে পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোথাও হিমবাহ, কোথাও পুরনো ধসের এলাকা, কোথাও প্রাকৃতিক জলপথ এবং তারই পাশে জনবসতি—একই অঞ্চলে একাধিক বিপদের উৎস মিলিত হওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে। চামোলিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে ২২টি এলাকা চিহ্নিত হয়েছে। হনুমান চট্টি, জলম, পুলনা ও ঘাস্তোলিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চার এলাকাতেই জনবসতির পাশাপাশি রাস্তা ও সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রয়েছে। জোশীমঠ, সুরাহি থোটা, পাণ্ডুকেশ্বর, ঘাংরিয়া, বদ্রীনাথ, প্রণমতী গ্যাড, চেপ্রন, কোঠি, মালারি, রেওয়াড় চাক কুরকুটি, মাণ্ডল, দ্রোণাগিরি, অরুরাহি পাতুরি এবং গৌনাকে মাঝারি ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। হনুমান চট্টিতে পুরনো ধসের চিহ্ন এবং সম্ভাব্য ধসজাত স্রোতের গতিপথ চিহ্নিত হয়েছে। ফলে বদ্রীনাথগামী তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।উত্তরকাশীতে ১১টি এবং পিথোরাগড়ে ১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত হয়েছে। উত্তরকাশীর স্যানাচট্টিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। সেখানে জাতীয় সড়ক, সেতু এবং জনবসতি একই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে। পিথোরাগড়ের সোবলা, দাফা, সুয়া, সুন্দুং, ধুনামানি এবং গালাটিও উচ্চ ঝুঁকির তালিকায়।
পাহাড়ের ধসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে অসমের বন্যা পরিস্থিতিও। চলতি বছরের বন্যায় রাজ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০০। গত ২৪ ঘণ্টায় গোলাঘাট এবং কার্বি আংলংয়ে আরও দু–জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৭টি জেলার প্রায় ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫০০ মানুষ এখন বন্যার কবলে। ৪৫৬টি গ্রাম জলের তলায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১১,৯৩৩.৪৬ হেক্টর কৃষিজমি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গোলাঘাট। সেখানে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ বন্যায় আক্রান্ত। শিবসাগরে প্রায় ৪০ হাজার এবং জোরহাটে ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ বন্যার জেরে বিপর্যস্ত। গোলাঘাট ও নুমালিগড়ে ধানসিড়ি নদী, শ্রীভূমিতে কুশিয়ারা নদী বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। এই মুহূর্তে ৬টি জেলায় ১২৫টি ত্রাণশিবির এবং ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৪৯ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বা ত্রাণ পরিষেবা পাচ্ছেন।
গোলাঘাটের নুমালিগড় ও মরঙ্গি এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। রবিবার বিকেল ৪টেয় নুমালিগড়ে ধানসিড়ি নদীর জলস্তর ছিল ৭৯.৫৫ মিটার। বিপদসীমা ৭৮.৪২ মিটার। জামুগুড়িতে ডোয়াং নদীর জলস্তরও বিপদসীমার উপর—৯৭.০৫ মিটার, যেখানে বিপদসীমা ৯৬.৯১ মিটার। এরই মধ্যে নাগাল্যান্ডের ডোয়াং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জল ছাড়া হচ্ছে। বিকেল ৫টার হিসাবে জলাধারে জল ছিল ৩২২.৩৩ মিটার। চারটি স্পিলওয়ে গেটের মধ্যে একটি ১.২৫ মিটার এবং বাকি তিনটি এক মিটার করে খোলা ছিল। স্পিলওয়ে দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫৬ ঘনমিটার জল বেরোচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রুগুড়ি এবং কড়দইগুড়ি এলাকায় বাঁধের কাছের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাস্তা ভেঙে গিয়েছে। জল ঢুকে পড়েছে বাড়িঘরেও। গোলাঘাট জেলার ৬টি রাজস্ব চক্রের ১৪৫টি গ্রাম বর্তমানে বন্যাকবলিত। আক্রান্ত ৬৮,২৩৯ জন। ২,০০৬.৫১ হেক্টর কৃষিজমি জলের তলায়। মরঙ্গি এলাকায় ১৪টি গ্রামে বন্যা হয়েছে।
কার্বি পাহাড়ে প্রবল বৃষ্টির জেরে নগাঁও ও কার্বি আংলংয়ের সীমানা দিয়ে বয়ে যাওয়া দিজু নদী ফের উপচে পড়েছে। অমনি রাজস্ব চক্রের শিয়ালেখাইতি, কালাপানি-সহ একাধিক এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। বসতবাড়ি থেকে কৃষিজমি—জলের তলায় চলে গিয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। গত দু’সপ্তাহের মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার বড় ধরনের বন্যার মুখে পড়লেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বার বার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসল। বন্ধ হচ্ছে স্বাভাবিক কাজকর্ম। বাড়ছে ঘরছাড়া হওয়ার আশঙ্কাও। বৃষ্টি আরও কয়েক দিন চললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
মণিপুরের সেনাপতি জেলার লাইই গ্রামে নগাওরেই/লাইনি নদীর হড়পা বানে প্রায় ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলের তলায় চলে গিয়েছে ৩০০ একরেরও বেশি কৃষিজমি। সদ্য রোপণ করা ধানের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপমুখ্যমন্ত্রী লোসিই দিখো এবং সেনাপতির জেলাশাসক ধরুণ কুমার এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কৃষকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছেন দিখো। লাইইকে উখরুলের খারাসোমের সঙ্গে যুক্ত করা লাইনি সেতুও নদীর স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব তৈরি করছে জেলা কৃষি দফতর এবং ইপিডব্লিউডি। স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য, এলাকার ভূপ্রকৃতির কারণে সম্পূর্ণ ভাবে বন্যা আটকানো কঠিন। তাই দীর্ঘমেয়াদি প্রশমন ব্যবস্থার পাশাপাশি আপাতত সেতু মেরামত আর বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ‘ভিলেজ অথরিটি কাউন্সিল’-এর দাবি, প্রায় ৮০-৯০ হাজার টিন সদ্য রোপণ করা ধানের জমি জলের তলায় চলে গিয়ে নষ্ট হয়েছে। দ্রুত ক্ষতিপূরণ, লাইনি সেতু মেরামত এবং চিংজারোই, লোয়ার ফাইবুং ও লাইইয়ের মধ্যে একটি ঝুলন্ত সেতু তৈরির দাবিও উঠেছে।
সিকিমেও রাতভর প্রবল বৃষ্টির জেরে বারডাংয়ের ২০ মাইল এলাকায় এনএইচ-১০-এর উপর ধসের মাটি এবং পাথর এসে পড়েছে। ফলে রাস্তা দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সিকিমের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান এ সড়কটি পর্যটন থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহণ— সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাস্তা বন্ধ হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে। ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে রাস্তা খুলে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে প্রশাসন। তবে টানা বৃষ্টিতে নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা থাকায় রাস্তার অন্য অংশগুলিতেও নজর রাখা হচ্ছে।
প্রতিবছর বর্ষাজনিজ ঘটনাগুলিকে আলাদা আলাদা বিপর্যয় হিসেবে দেখলে ছবির একটি বড়ো অংশ আড়ালে থেকে যায়। উত্তর-পূর্ব ভারতে বর্ষা এখন যেন শুধু বৃষ্টির ঋতু নয়, আতঙ্কেরও নাম। পাহাড়ে ধস, নদীতে হড়পা বান, শহরে জলবন্দি জীবন, ভেঙে পড়া রাস্তা, ছিন্ন সেতু, ডুবে যাওয়া কৃষিজমি— প্রতি বছরই ফিরে ফিরে আসছে একই ছবি। এক সময় বর্ষা উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের কাছে ছিল প্রকৃতির পুনর্জন্মের ঋতু। ভেজা মাটির গন্ধ, সবুজ হয়ে ওঠা পাহাড়, নদীর জলে স্রোত— বর্ষার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। এখন সে বর্ষাই অনেকের ভয়াবহ বিপদের বার্তা।
গুয়াহাটির পরিস্থিতি তার অন্যতম উদাহরণ। শহরটি পাহাড় ও সমতলের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকা থেকে দ্রুত জল নেমে আসে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পাহাড় কাটা, সবুজ কমে যাওয়া, প্লাস্টিক বর্জ্যে জলপথ বন্ধ হওয়া এবং জলাভূমির ক্ষয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণে ‘মিশন ফ্লাড-ফ্রি গুয়াহাটি’-র মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জলাশয় সংরক্ষণ, বিকল্প নিকাশি ব্যবস্থা, পাম্পের সাহায্যে জল সরানো—এ কাধিক পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এগুলি কি মূল সমস্যার মোকাবিলা করছে, নাকি প্রতি বর্ষায় সাময়িক ভাবে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা মাত্র? দীপোর বিলের ঘটনাই সে প্রশ্ন আরও জোরালো করে। গুয়াহাটির বন্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমি আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ‘রামসার সাইট’। অথচ পরিকাঠামো নির্মাণের জেরে বিলের আশপাশে একশোরও বেশি গাছ কাটা হয়েছে, আরও গাছ কাটার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশকর্মী, সংগঠন ও জাতীয় পরিবেশ আদালত পর্যন্ত আপত্তি জানিয়েছে। অর্থাৎ এক দিকে জলাভূমি বাঁচিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, অন্যদিকে পরিকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনে সে পরিবেশ ব্যবস্থার উপরই চাপ— এই দ্বন্দ্বই উত্তর-পূর্বের উন্নয়ন পরিকল্পনার সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গুয়াহাটি একা নয়। উত্তরাখণ্ড, হিমাচল, অরুণাচল প্রদেশে সাম্প্রতিক ধস ও হড়পা বানে প্রাণহানি, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিজনিত বিপর্যয়, সিকিমে রাস্তা বন্ধ, মণিপুরে কৃষিজমি ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া— সব মিলিয়ে ছবিটা একই। প্রতি বছর বিপর্যয়ের পরে উদ্ধার হয়, ত্রাণ পৌঁছয়, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা হয়। জল নামলে পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। তার পর শুরু হয় অপেক্ষা— পরের বর্ষার। এ চক্র ভাঙতে হলে শুধু বিপর্যয়ের পরে ত্রাণ নয়, বিপর্যয়ের আগেই প্রস্তুতি প্রয়োজন। পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট, নদীর স্বাভাবিক গতিপথে হস্তক্ষেপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ; প্রতিটি সিদ্ধান্তের পরিবেশগত প্রভাব নতুন করে ভাবতে হবে। উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য প্রয়োজন এমন উন্নয়ন পরিকল্পনা, যেখানে রাস্তা, সেতু, শহর এবং পর্যটন পরিকাঠামোর সঙ্গে পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। না হলে পাহাড়ে ধস নামবে, নদী উপচে পড়বে, শহর ডুববে, মানুষ ঘরছাড়া হবে— আর প্রতি বর্ষায় সংবাদপত্রের পাতায় ফিরে আসবে একই চেনা, একই উদ্বেগের শিরোনাম।
❤ Support Us







