Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • আগস্ট ১০, ২০২৬

এক ছাতার তলায় ১৬ ট্রাইব্যুনাল, তৈরি হবে জাতীয় কমিশন ! লোকসভায় বিল পেশের সম্ভাবনা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
এক ছাতার তলায় ১৬ ট্রাইব্যুনাল,  তৈরি হবে জাতীয় কমিশন ! লোকসভায় বিল পেশের সম্ভাবনা

দেশের বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালের নিয়োগ এবং কাজকর্মে নজরদারির জন্য এ বার পৃথক জাতীয় কমিশন তৈরির পথে কেন্দ্র। ১৬টি ট্রাইব্যুনাল ও আপিল কর্তৃপক্ষকে এক ছাতার তলায় এনে নিয়োগ প্রক্রিয়াকর্মদক্ষতাঅভিযোগের তদন্ত এবং প্রশাসনিক কাজকর্মে নজরদারি চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালস রিফর্মস বিল২০২৬’-এ। সোমবার লোকসভায় বিলটি পেশ হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত বিল পাশ হলে, ন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালস কমিশন (এনটিসি)এর হাতে থাকবে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের নিয়োগের প্রক্রিয়া পরিচালনাতাঁদের কাজের মূল্যায়ন  তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তের তদারকির দায়িত্ব। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালের মামলাসংক্রান্ত তথ্য এক জায়গায় রাখার জন্য তৈরি হবে ন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালস ডেটা গ্রিড। কেন্দ্রের যুক্তিট্রাইব্যুনালগুলির কাজে দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগপরিষেবার শর্ত এবং প্রশাসনিক কাঠামোয় অভিন্নতা আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালগুলির স্বাধীনতা আর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও এই সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্য।

প্রস্তাবিত আইনের আওতায় আসছে সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল’, ‘ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল’, ‘আর্মড ফোর্সেস ট্রাইব্যুনাল’, ‘সিকিউরিটিজ় অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল’, ‘ডেটস রিকভারি ট্রাইব্যুনাল’, ‘ন্যাশনাল কোম্পানি ল অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল এবং ইনকাম ট্যাক্স অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল-সহ মোট ১৬টি ট্রাইব্যুনাল ও আপিল কর্তৃপক্ষ। তবে তালিকাটি ভবিষ্যতে বদলানোর রাস্তা খোলা রাখছে এই বিল। কেন্দ্র গেজ়েট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আইনের আওতাধীন ট্রাইব্যুনালের তালিকায় নতুন প্রতিষ্ঠান যোগ করতে বা কোনো প্রতিষ্ঠান বাদ দিতে পারবে। অবশ্য সে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে সংসদের সামনে পেশ করতে হবে।

খসড়া অনুযায়ীদিল্লিতে হবে ন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালস কমিশন’-এর সদর দফতর। কমিশনে থাকবেন পাঁচ জন— এক জন চেয়ারম্যানদুই জন বিচারবিভাগীয় সদস্য এবং দুই জন কারিগরি সদস্য। চেয়ারম্যান হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অথবা হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিচারবিভাগীয় সদস্যের পদে বসতে পারবেন হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি বা বিচারপতি। কারিগরি সদস্যদের ক্ষেত্রে সরকারি প্রশাসনঅর্থআইনঅ্যাকাউন্ট্যান্সিব্যাঙ্কিংম্যানেজমেন্ট অথবা প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে অন্তত ২৫ বছরের বিশেষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন। চেয়ারম্যান  সদস্যদের নিয়োগ করবে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে চেয়ারম্যান  বিচারবিভাগীয় সদস্যদের নিয়োগের আগে ভারতের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। এই পরামর্শ’-এর পরিধি নিয়েই অবশ্য প্রশ্ন উঠেছে। কেন্দ্র সরকারের হাতে নিয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকায় বিচারবিভাগের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত হবে, সে প্রশ্নই সামনে আনছেন বিরোধীদের একাংশ।

ট্রাইব্যুনালে শূন্যপদ পড়ে থাকার সমস্যা দীর্ঘ দিনের। নতুন বিলে সে জট কাটানোর জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট সময়সীমার প্রস্তাব করা হয়েছে। ন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালস কমিশন সার্চ-কাম-সিলেকশন কমিটি’-র মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করবে। প্রতিটি শূন্যপদের জন্য কমিটি এক জনের নাম সুপারিশ করবে। পাশাপাশি অপেক্ষমাণ তালিকার জন্য আরও এক জনের নাম রাখা হবে। তবে সুপারিশটি তিন দিনের মধ্যে কেন্দ্রের কাছে পাঠাতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারকে সেই সুপারিশের ভিত্তিতে তিন মাসের মধ্যে নিয়োগ সম্পূর্ণ করতে হবে। সিলেকশন কমিটিতে থাকবেন কমিশনের সদস্যঅবসরপ্রাপ্ত হাই কোর্টের বিচারপতিকেন্দ্রীয় সরকারের এক জন সচিব এবং তালিকাভুক্ত বিশেষজ্ঞেরা। রাজ্য প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যসচিবও কমিটিতে থাকবেন।

চেয়ারম্যান পদের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত পদে থাকার সর্বোচ্চ বয়সসীমাও রয়েছে।সদস্যদের ক্ষেত্রে মেয়াদ পাঁচ বছর এবং ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত। তবে, দুক্ষেত্রেই পুনর্নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। অন্যদিকেচেয়ারম্যান বা সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে সরানোর ক্ষমতাও থাকবে কেন্দ্রের হাতে। নৈতিক স্খলন-সংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়াঅক্ষমতাস্বার্থের সংঘাতক্ষমতার অপব্যবহারঅযোগ্যতা বা অদক্ষতা এবং মেয়াদকালীন বেতনভুক অন্য কোনো দায়িত্ব নেওয়ার মতো কারণে অপসারণ করা যেতে পারে। কমিশনের কাজ শুধু নিয়োগেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালের কাজের মূল্যায়ন করে রিপোর্ট তৈরিকেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বার্ষিক রিপোর্ট পেশচেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তের তদারকি এবং জাতীয় তথ্যভান্ডার পরিচালনাও কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। কমিশন এবং তার সচিবালয় চালাতে বছরে প্রায় ২৭.১৪ কোটি টাকা খরচ হবে বলে বিলে জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত এ বিলের পিছনে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ। মাদ্রাজ বার অ্যাসোসিয়েশন বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় শীর্ষ আদালত ২০২১ সালের ট্রাইব্যুনালস রিফর্মস অ্যাক্ট-এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান খারিজ করেছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিলওই বিধানগুলি বিচারবিভাগের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।  ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বরের সেই রায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমাসদস্যদের মেয়াদ এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে কেন্দ্রের করা বেশ কিছু পরিবর্তন বাতিল করে দেয় আদালত। ২০২১ সালের আইনে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫০ বছরের ন্যূনতম বয়সের বিধান রাখা হয়েছিল। এর ফলে অপেক্ষাকৃত কম বয়সি হলেও যোগ্য আইনজীবীদের ট্রাইব্যুনালে নিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট সেই বিধান বাতিল করে।

চার বছরের মেয়াদের পরিবর্তে সদস্যদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পুনর্বহাল করা হয়। একই সঙ্গে প্রতি শূন্যপদের জন্য দুটি নাম সুপারিশের নিয়মও খারিজ করে একটি নাম সুপারিশের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনে আদালত। এর ফলে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার পরিসর কমানোর চেষ্টা করা হয়।  শীর্ষ আদালত কেন্দ্রকে চার মাসের মধ্যে ন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালস কমিশন গঠনের নির্দেশও দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ট্রাইব্যুনালগুলির প্রশাসনে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং নিয়োগ ও কাজকর্মে আরও স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

এদিকে, বিলটি নিয়ে কংগ্রেসের তরফে ইতিমধ্যেই সমর্থনের কথা জানানো হয়েছে। কংগ্রেস সাংসদ জয়রাম রমেশের মতেদেশের ১৬টি আধা-বিচারবিভাগীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য এ বিল নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও এর আওতায় আসবে। বিশেষ করে গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ প্রকল্প নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনার ক্ষেত্রেও ট্রাইব্যুনাল আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবে বলে তিনি আশা করছেন। রমেশের বক্তব্যসুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেই কেন্দ্রকে এই পথে এগোতে হচ্ছে। ২০২১ সালের আইন নিয়ে সরকার যে অবস্থান নিয়েছিলতারও সমালোচনা করেছেন তিনি। রমেশ বলেনসুপ্রিম কোর্টে ২০২১ সালের আইনকে রক্ষা করার পর শেষ পর্যন্ত সরকারকে সেই সংস্কারের পথেই হাঁটতে হচ্ছেযার প্রয়োজনীয়তার কথা এত দিন ধরে বলা হচ্ছিল। একই সঙ্গে তাঁর সতর্কবার্তাভবিষ্যতে নির্বাহী বিভাগ যাতে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী চেয়ারম্যান বা সদস্যদের মেয়াদ বাড়ানো-কমানো কিংবা পরিষেবার শর্ত বদলাতে না পারেবিলটিতে তার নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, প্রস্তাবিত বিলের আর একটি জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিনিয়র আইনজীবী রাজ পানজওয়ানি। তাঁর মতেবিলটি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করার পাশাপাশি ২০২১ সালের আইনের ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা করছে ঠিকইকিন্তু একে পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত বলা যায় না। বিশেষ করে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে তাঁর মত। বিলে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ নিয়ে কেন্দ্র নিয়োগ। পানজওয়ানির প্রশ্ন, ‘পরামর্শ’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছেতার একাধিক ব্যাখ্যা হতে পারে। 

তাঁর মতে, পরামর্শ ও সম্মতি’-র মতো স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা উচিত ছিল। তবে সামগ্রিক ভাবে বিলটির কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতেসমস্ত ট্রাইব্যুনালের জন্য একই ধরনের পরিষেবার শর্ত এবং নিয়োগ পদ্ধতি তৈরি হলে প্রতিটি পৃথক আইনে বার বার সংশোধন করার প্রয়োজন কমবে। ফলে বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় নিয়োগ প্রক্রিয়া কম জটিল হতে পারে। তবু বিলটি সরাসরি পাশ না করে সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠিয়ে বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালের উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেই মত পানজওয়ানির। ফলে সোমবার লোকসভায় বিলটি পেশ হলে শুধু ট্রাইব্যুনালের প্রশাসনিক কাঠামো বদল নয়বিচারবিভাগের স্বাধীনতা বনাম নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের পুরনো বিতর্কও ফের সংসদের আলোচনায় উঠে আসতে পারে। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!