Advertisement
  • দে । শ
  • আগস্ট ১১, ২০২৬

স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে প্রথম বার, লালকেল্লায় গাওয়া হবে ‘বন্দে মাতরম্’

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে প্রথম বার, লালকেল্লায় গাওয়া হবে ‘বন্দে মাতরম্’

স্বাধীনতা দিবসের চেনা অনুষ্ঠানে এ বার বদলের ছোঁয়া। ১৫ আগস্ট দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে প্রথম বার লালকেল্লায় পরিবেশিত হবে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লালকেল্লার প্রাকারে পৌঁছনোর পর জাতীয় গানটি পরিবেশিত হবে। সে সময় উপস্থিত সকলকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। তারপর জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন প্রধানমন্ত্রী। শেষে বাজবে জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’। সোমবার, এই নতুন অনুষ্ঠানসূচির কথা জানিয়েছেন প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিংহ।

প্রতি বছর ১৫ আগস্ট লালকেল্লার প্রাকার থেকে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী। এত দিন সে অনুষ্ঠানে পতাকা উত্তোলনের পর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের রীতি ছিল। এ বার তার আগেই জায়গা করে নিচ্ছে ‘বন্দে মাতরম্’। ফলে স্বাধীনতা দিবসের মূল সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় গানকে প্রথম বার আনুষ্ঠানিক ভাবে যুক্ত করা হচ্ছে।  প্রতিরক্ষা সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী প্রাকারে পৌঁছবেন, তার পর ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশিত হবে। উপস্থিত সকলকে সে সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এর পর প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন এবং জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হবে। প্রায় ২৭ হাজার আমন্ত্রিত অতিথি, বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং পড়ুয়ার উপস্থিতিতে এই নতুন পর্ব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

এ বারের এই আয়োজনের পিছনে রয়েছে আরও একটি ঐতিহাসিক উপলক্ষ। ২০২৬ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘বন্দে মাতরম্’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করছে দেশ। সে আবহেই জাতীয় গানটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সামনে এনে স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠানে তাকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। ১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এ প্রথম পূর্ণাঙ্গ আকারে প্রকাশিত হয় ‘বন্দে মাতরম্’। পরবর্তী কালে গানটির প্রথম অংশ ভারতের জাতীয় গান হিসাবে স্বীকৃতি পায়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে গানটি হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। সভা-মিছিল থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন— বিভিন্ন পর্বে ‘বন্দে মাতরম্’-এর উচ্চারণ জাতীয়তাবাদী আবেগকে আরও তীব্র করেছিল। এ বার সেই ঐতিহাসিক গানই লালকেল্লার স্বাধীনতা দিবসের মূল মঞ্চে নতুন আনুষ্ঠানিক মর্যাদা পেতে চলেছে।

শুধু মূল অনুষ্ঠানেই নয়, এ বারের স্বাধীনতা দিবসের আমন্ত্রণপত্রেও ‘বন্দে মাতরম্’-কে বিশেষ জায়গা দেওয়া হয়েছে। আধিকারিক সূত্র উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আমন্ত্রণপত্রে গানটির ছ-টি স্তবকই রাখা হয়েছে। জাতীয় গানটির মর্যাদা বাড়াতে কেন্দ্রের সাম্প্রতিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এ সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি বছর সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশনের জন্য নির্দিষ্ট বিধিও স্থির করেছে কেন্দ্র। সে নির্দেশিকা অনুযায়ী, গানটির ছ-টি স্তবক ১৯০ সেকেন্ড বা তিন মিনিট ১০ সেকেন্ডের মধ্যে পরিবেশন করার কথা। জাতীয় পতাকা উত্তোলন-সহ যে সব সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের রীতি রয়েছে, সেখানে জাতীয় সঙ্গীতের আগে জাতীয় গান পরিবেশনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ফলে লালকেল্লার ১৫ আগস্টের অনুষ্ঠানটি সেই নতুন বিধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতীকী প্রয়োগগুলির অন্যতম হতে চলেছে।

জাতীয় গানটির মর্যাদা বাড়ানোর পাশাপাশি এর অবমাননাকে শাস্তিযোগ্য করার উদ্যোগও নিয়েছে কেন্দ্র। সংসদে সম্প্রতি পাশ হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংশোধনী বিল। নতুন আইনি ব্যবস্থায় জাতীয় গানকে জাতীয় সঙ্গীতের মতো সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইচ্ছাকৃত ভাবে ‘বন্দে মাতরম্’-এর পরিবেশনে বাধা দেওয়া বা তার অবমাননা করার ক্ষেত্রে কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা দু-টিরই বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনি পরিবর্তনের পরেই স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠানে গানটির অন্তর্ভুক্তি বিশেষ তাৎপর্য পাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এ বারের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে শুধু ‘বন্দে মাতরম্’ নয়, আরও একটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে চলেছে— দেশের তরুণ প্রজন্ম। এ বারের অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা ‘যুবশক্তি—বিকশিত ভারতের পথে নেতৃত্ব’। অর্থাৎ দেশের উন্নয়ন এবং ভারতকে ‘বিকশিত ভারত’-এ পরিণত করার লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মের অবদানকেই সামনে রাখতে চাইছে কেন্দ্র। দেশের ছাত্রছাত্রী, তরুণ উদ্যোগপতি, ইঞ্জিনিয়ার এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতী যুবকদের সাফল্য ও অবদান অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হবে। মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে মহাকাশের আবর্জনা বা ‘স্পেস ডেব্রিস’ ব্যবস্থাপনা— নতুন প্রযুক্তি এবং গবেষণার একাধিক ক্ষেত্রে তরুণ ভারতীয়দের কাজের উদাহরণও তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানকে ঘিরে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিও বিশেষ ভাবে বাড়ানো হচ্ছে। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিদ্যা এবং গণিত অলিম্পিয়াডে এ বছর পদকজয়ী ১৯ জন পড়ুয়াকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা রয়েছে। দিল্লির বিভিন্ন সরকারি স্কুলের পড়ুয়ারাও লালকেল্লার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত থাকবে।

‘যুবশক্তি’কে এ বারের স্বাধীনতা দিবসের মূল ভাবনা করার সিদ্ধান্ত এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন দেশ জুড়ে ছাত্র-যুবদের আন্দোলন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ছাত্র-যুবদের ধারাবাহিক আন্দোলন হয়ে চলেছে। দিল্লির আন্দোলনের অন্যতম রাজনৈতিক পরিণতি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। প্রধানের পদত্যাগকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসাবেও দেখা হয়েছিল।

সে আবহেই স্বাধীনতা দিবসের মূল সরকারি অনুষ্ঠানের বিষয় হিসাবে ‘যুবশক্তি’ বেছে নেওয়া ঘিরে রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিক ভাবেই আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বক্তব্য, এ বারের অনুষ্ঠান পরিকল্পনায় ‘যুবশক্তি’কে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া হিসাবে নেওয়া হয়নি। পরিকল্পনাটি আগেই স্থির হয়েছিল। ফলে একদিকে ছাত্র-যুবদের সাম্প্রতিক আন্দোলন, অন্যদিকে লালকেল্লার মঞ্চে তরুণ প্রজন্মের সাফল্য ও অবদান তুলে ধরার সরকারি উদ্যোগ— দুইয়ের মধ্যে রাজনৈতিক তাৎপর্য খুঁজছেন অনেকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সাম্প্রতিক সময়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে একাধিক বার্তা দিয়েছেন। সে আবহে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘যুবশক্তি’কে রাখা তরুণদের কাছে সরকারের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।

স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিংহ জানিয়েছেন, বিরোধী দলনেতার সাংবিধানিক পদমর্যাদা অনুযায়ী তাঁর বসার ব্যবস্থা করা হবে। বিরোধী দলনেতার পদ ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমতুল। সেই প্রোটোকল মেনেই এ বার লালকেল্লার অনুষ্ঠানে রাহুলের আসন নির্ধারিত হবে। ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের ঠিক পরেই তাঁর বসার ব্যবস্থা থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রতিরক্ষা সচিব। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, শীর্ষ সামরিক আধিকারিক, আমলা, কূটনীতিক, ছাত্রছাত্রী এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতী ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা।

সব মিলিয়ে এ বারের ১৫ আগস্টের অনুষ্ঠান যেন একসঙ্গে একাধিক বার্তা দিতে চলেছে। এক দিকে ১৫০ বছর পূর্ণ করা ‘বন্দে মাতরম্’-কে  স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে লালকেল্লা থেকে প্রথম বার আনুষ্ঠানিক ভাবে গাওয়ার সিদ্ধান্ত, অন্য দিকে ‘বিকশিত ভারত’-এর যাত্রায় তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা তুলে ধরার উদ্যোগ। জাতীয় গান, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বর্তমান ভারতের যুবসমাজ— তিন বিষয়কে এক সুতোয় বেঁধেই এ বার সাজছে দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠান।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!