Advertisement
  • দে । শ
  • অক্টোবর ৩১, ২০২৬

ফিল্ম সিটির জন্য ধ্বংস বনাঞ্চল! চিপকো আন্দোলনের স্মৃতি উস্কে গাছ জড়িয়ে বিক্ষোভ ছত্তিশগড়ে

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ফিল্ম সিটির জন্য ধ্বংস বনাঞ্চল! চিপকো আন্দোলনের স্মৃতি উস্কে গাছ জড়িয়ে বিক্ষোভ ছত্তিশগড়ে

পাঁচ দশক আগের ইতিহাস আবার ফিরে এল ছত্তিশগড়ে। উন্নয়নের নামে বনাঞ্চল ধ্বংসের প্রতিবাদে গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে পড়লেন গ্রামবাসীরা। প্রস্তাবিত ফিল্ম সিটির জন্য একের পর এক গাছ কাটার কাজ শুরু হতেই ‘চিপকো আন্দোলন’-এর পথেই প্রতিবাদে নামলেন নয়া রায়পুরের মানা-তুতা এলাকার বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, ফিল্ম সিটি তৈরির বিরোধিতা করছেন না তাঁরা। আপত্তি প্রকল্পের অবস্থান নিয়ে। পরিণত গাছপালায় ভরা বনাঞ্চল ধ্বংস না করে অন্য কোনো ফাঁকা জমিতে প্রকল্প সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হোক। গাছ কাটার প্রতিবাদে পথে নামতেই পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন গ্রামবাসীদের একাংশ। আটক করা হয় ১০ জনকে।

ছত্তিশগড়ের এই ঘটনা ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন। একদিকে রাজ্য সরকারের পর্যটন, কর্মসংস্থান ও চলচ্চিত্র শিল্পের প্রসারের পরিকল্পনা, অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন বনাঞ্চল বাঁচানোর দাবি। আপাতত এই দুইয়ের সংঘাতেই উত্তপ্ত নয়া রায়পুরের মানা-তুতা এলাকা। স্থানীয় সূত্রে খবর, চিত্রোৎপলা ফিল্ম সিটি এবং জনজাতি ও সাংস্কৃতিক কনভেনশন সেন্টার তৈরির জন্য প্রায় ১০০ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। সে জমিতে থাকা গাছ কাটার কাজ শুরু হতেই আপত্তি জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, ওই এলাকায় এমন বহু গাছ রয়েছে, যেগুলির বহু পুরনো। একসঙ্গে এতগুলি গাছ কেটে ফেললে এলাকার পরিবেশের উপর তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। বনাঞ্চলটি নয়া রায়পুরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি তাঁদের।

গাছ কাটার প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেন কংগ্রেস কর্মীরাও। তাঁদের বাধার মুখে সাময়িক ভাবে বন্ধ হয়ে যায় গাছ কাটার কাজ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ফের গাছ কাটার কাজ শুরু হতেই ক্ষোভ আরও বাড়ে। এ বার সরাসরি গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ধরে গাছ কাটার কাজে বাধা দেন গ্রামবাসীরা। তাঁদের এই প্রতিবাদ মনে করিয়ে দেয় উত্তরাখণ্ডের ঐতিহাসিক ‘চিপকো আন্দোলন’-এর কথা। বিক্ষোভের সময় পুলিশ ও গ্রামবাসীদের মধ্যে ধস্তাধস্তির একটি ভিডিয়োও প্রকাশ্যে এসেছে। এর পরেই ১০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করে মানা থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। খবর পেয়ে থানার বাইরে জড়ো হন কংগ্রেসের শহর ও গ্রামীণ জেলা নেতৃত্ব-সহ দলীয় কর্মীরা। আটক গ্রামবাসীদের মুক্তির দাবিতে থানার বাইরে বিক্ষোভ দেখান তাঁরা। শেষ পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা পর আন্দোলনকারীদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

গ্রামবাসীদের বক্তব্য, তাঁরা উন্নয়নের বিরোধী নন। বরং এলাকার অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন চান। কিন্তু সে উন্নয়নের মূল্য যদি হয় প্রাচীন গাছ কেটে ফেলা, তা হলে সে পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। তাঁদের দাবি, নয়া রায়পুরে বিকল্প জমির অভাব নেই। যে সব জমিতে বড়ো গাছ বা ঘন বনাঞ্চল নেই, সেখানেই ফিল্ম সিটি তৈরি করা যেতে পারে। গাছ কাটা বন্ধ না হলে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প এলাকার বনাঞ্চলে প্রায় ১,৫০০ থেকে ৫,০০০ গাছ কাটার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ২০০টি গাছ কাটা হয়েছে বলেও অভিযোগ। যদিও এ সংখ্যার সরকারি নিশ্চিতকরণ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। ফলে ঠিক কতগুলি গাছ কাটা হবে, প্রকল্পের জন্য পরিবেশের উপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

প্রস্তাবিত এই প্রকল্প ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা অবশ্য বেশ বড়ো। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি চিত্রোৎপলা ফিল্ম সিটি এবং জনজাতি ও সাংস্কৃতিক কনভেনশন সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই। ফিল্ম সিটি নির্মাণের জন্য ৯৫.৭৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার। সাংস্কৃতিক কনভেনশন সেন্টারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে আরও ৫২.০৩ কোটি টাকা। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে প্রকল্প দু-টি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই সঙ্গে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে বলেও আশা সরকারের। প্রস্তাবিত ফিল্ম সিটিতে চলচ্চিত্র এবং ওয়েব সিরিজের শুটিংয়ের জন্য একাধিক স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করার কথা। সেখানে রাস্তা, রেলস্টেশন, বিমানবন্দরের আদলে শুটিং সেট তৈরি করা হবে। অন্যদিকে, সাংস্কৃতিক কনভেনশন সেন্টারে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী এবং জনজাতি সংস্কৃতির নানা কর্মসূচির আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের বক্তব্য, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ছত্তিশগড়ে পর্যটনের প্রসার ঘটবে। পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে, স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের পথও খুলবে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কর্মসংস্থান ও পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি করতে গিয়ে বিদ্যমান প্রাকৃতিক সম্পদকে কতটা বিসর্জন দেওয়া যায়? বিশেষত, যে সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বনাঞ্চল হ্রাস এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন একটি বিনোদন পরিকাঠামো প্রকল্পের জন্য এমন বৃহৎ বনাঞ্চল ধ্বংস করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশপ্রেমীরা। চলমান প্রতিবাদের তাৎপর্য আরও বেশি, কারণ গাছ জড়িয়ে ধরে গাছ বাঁচানোর এই কৌশল ভারতের পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের গাড়োয়াল হিমালয় অঞ্চলে শুরু হয়েছিল ‘চিপকো আন্দোলন’। বাণিজ্যিক ভাবে গাছ কাটার বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের সংগঠিত প্রতিরোধই পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্তরে পরিচিতি পায়। আন্দোলনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে উত্তরাখণ্ডের রেনি গ্রামের ঘটনা।

সে সময়ে রেনি গ্রামের পুরুষদের অন্যত্র ডেকে পাঠানোর সুযোগে বনাঞ্চলে গাছ কাটতে পৌঁছেছিলেন ঠিকাদারদের লোকজন। তাঁদের আসার খবর পেয়ে গৌরা দেবীর নেতৃত্বে গ্রামের ২৭ জন মহিলা জড়ো হন। গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ধরে কাঠুরিয়াদের পথ আটকান তাঁরা। গৌরা দেবীর নেতৃত্বে সে প্রতিরোধ শুধু এক বনাঞ্চলকে রক্ষা করার লড়াই ছিল না, বরং পরিবেশ সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষের অধিকার ও মহিলাদের নেতৃত্বের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। ‘চিপকো আন্দোলন’-এর অন্যতম সংগঠক চণ্ডীপ্রসাদ ভট্ট স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে বনজ সম্পদের ব্যবহারের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। তাঁর মতে, বনকে কেবল বাণিজ্যিক কাঠের ভান্ডার হিসেবে দেখলে চলবে না। বনাঞ্চল স্থানীয় মানুষের খাদ্য, জল, জ্বালানি এবং জীবিকার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। অন্যদিকে, পরিবেশকর্মী সুন্দরলাল বহুগুণা আন্দোলনটিকে বৃহত্তর পরিবেশ সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর বিখ্যাত বক্তব্য ছিল, ‘বাস্তুতন্ত্রই স্থায়ী অর্থনীতি।’ অর্থাৎ, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে কোনও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

‘চিপকো আন্দোলন’-এর প্রভাব পরবর্তী সময়ে ভারতের পরিবেশনীতি ও বন সংরক্ষণ সংক্রান্ত আলোচনাতেও পড়ে। ১৯৮০ সালে হিমালয় অঞ্চলের নির্দিষ্ট উচ্চতায় বাণিজ্যিক ভাবে সবুজ গাছ কাটার উপর ১৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৮৭ সালে এ আন্দোলনকে দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক ‘রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড’। পরবর্তী সময়ে কর্নাটকের পশ্চিমঘাট অঞ্চলে আপ্পিকো আন্দোলনও চিপকোর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। আপ্পিকো আন্দোলনের মূল দর্শন ছিল তিনটি — বনাঞ্চলকে রক্ষা করা, ধ্বংস হয়ে যাওয়া জমিতে নতুন করে গাছ লাগানো ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা। কন্নড় ভাষায় ‘আপ্পিকো’ শব্দের অর্থও জড়িয়ে ধরা। ১৯৮৩ সালে পাণ্ডুরঙ্গ হেগড়ের নেতৃত্বে এ আন্দোলন শুরু হয়। বনাঞ্চল রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানো, জ্বালানি কাঠের ব্যবহার কমানো এবং বিকল্প জ্বালানির প্রসারেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা।

‘চিপকো আন্দোলন’-এর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নারীর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের প্রশ্ন। পরবর্তী সময়ে পরিবেশ নারীবাদ বা ‘ইকোফেমিনিজম’ আলোচনায় এ আন্দোলন বিশেষ জায়গা করে নেয়। পাহাড়ি গ্রামগুলিতে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, পানীয় জল নিয়ে আসা, পশুখাদ্য জোগাড় এবং কৃষিকাজের মতো দৈনন্দিন দায়িত্বের বড়ো অংশ সামলাতেন মহিলারা। ফলে বনাঞ্চল ধ্বংস হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ত তাঁদের জীবনযাত্রার উপর। বন উজাড়ের অর্থ ছিল আরও দূর থেকে জল ও জ্বালানি সংগ্রহ করা, কৃষিজমিতে মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি ও পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া। সে কারণেই ‘চিপকো আন্দোলন’-এ মহিলাদের অংশগ্রহণ নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়। বনাঞ্চল সম্পর্কে তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর জীবনধারণের বাস্তব প্রয়োজনই তাঁদের প্রতিরোধের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। গৌরা দেবী ও তাঁর সহযোগীদের লড়াই দেখিয়েছিল, পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্নে গ্রামের মহিলারা শুধু ক্ষতিগ্রস্ত নন, তাঁরা আন্দোলনের নেতৃত্বও দিতে পারেন।

নয়া রায়পুরের সাম্প্রতিক প্রতিবাদ সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সঙ্গে তুলনার সুযোগ তৈরি করেছে। যদিও দুই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়, তবু একটি প্রশ্ন একই রয়ে গিয়েছে — উন্নয়নের পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষ এবং প্রকৃতির স্বার্থ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? ফিল্ম সিটি তৈরি হলে কর্মসংস্থান হতে পারে, পর্যটন বাড়তে পারে, স্থানীয় শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা নতুন পরিকাঠামো পেতে পারেন। কিন্তু সে সম্ভাবনা বাস্তবায়িত করার জন্য  বনাঞ্চল ধ্বংস করাই কি একমাত্র পথ? না কি উন্নয়নের পরিকল্পনা তৈরির সময় পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন? আপাতত এই প্রশ্নগুলিই সামনে রেখে গাছ জড়িয়ে প্রতিবাদে নেমেছেন ছত্তিশগড়ের গ্রামবাসীরা। পাঁচ দশক আগে হিমালয়ের পাহাড়ে যে প্রতিরোধের জন্ম হয়েছিল, তারই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে রায়পুরে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!