- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ৩১, ২০২৬
পূর্ব মেদিনীপুরে খ্রিস্টান পরিবারের উপর নিগ্রহের অভিযোগ ! পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া থানার অন্তর্গত পশ্চিম অর্জুনদা গ্রামে দুই খ্রিস্টান পরিবারের উপর হামলা, শারীরিক নির্যাতন ও ধর্মান্তরণের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ, গত ১১ অক্টোবর সন্ধ্যা প্রায় ৬টা নাগাদ একদল ব্যক্তি ওই পরিবারের সদস্যদের হেনস্থা ও হুমকি দেয়। পরবর্তীতে ফের হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। হামলায় গুরুতর আহত হন গৃহবধূ পার্বতী হেমব্রম সরেন। মারধরের ফলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, একদল ব্যক্তি জোরপূর্বক বাড়িতে প্রবেশ করে পরিবারের সদস্যদের ঘরের ভিতরে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর করে। ঘটনার খবর পেয়ে মনিরামপুরের বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা (BCP)-র সদস্য সমীর সংগঠনের লিগ্যাল সেলকে বিষয়টি জানান। এরপর বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার লিগ্যাল সেলের এক আইনজীবী পার্বতী সরেনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে ঘটনার সত্যতা জানার চেষ্টা করেন। অভিযোগ, কথা চলাকালীনই হামলাকারীরা তাঁর কাছ থেকে ফোন কেড়ে নেয়। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে আইনজীবীকে হুমকি দেয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। আইনজীবীর পরিচয় বুঝতে পেরেই তাঁরা ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে দাবি।
পরিবারের পক্ষ থেকে ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দায়ের করা পুলিশি অভিযোগে বলা হয়েছে, খ্রিস্টধর্মকে ‘আমেরিকান ধর্ম’ বলে আখ্যা দিয়ে অভিযুক্তরা পরিবারটিকে এক সপ্তাহের মধ্যে জোরপূর্বক হিন্দুধর্ম গ্রহণ করার জন্য চাপ দেয়। পাশাপাশি বাড়ির উঠোনে তুলসী মঞ্চ নির্মাণ এবং মনসা গাছ লাগিয়ে পূজা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশ অমান্য করলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এমনকি স্থানীয় বাজারে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা, রেশন কার্ড ও আয়ুষ্মান ভারত কার্ডের মতো সরকারি সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া, বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া এবং প্রকাশ্যে খুন করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশে দায়ের করা অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত হিসেবে গোরাচাঁদ সরেন, বলরাম সরেন, সোমবারি সরেন, মামণি সরেন, আরতি সরেন, অর্জুন সরেন, লগেন হাঁসদা এবং গীতা সরেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পরপরই পাঁশকুড়া থানায় এবং জেলা পুলিশ সুপারের কন্ট্রোল রুমে বিষয়টি জানানো হয়। অভিযোগ, থানার পক্ষ থেকে দ্রুত পুলিশ পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও খবর দেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরেও ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছয়নি। এই সময়ের মধ্যেই গুরুতর মারধরের কারণে পার্বতী সরেন অচেতন হয়ে পড়েন বলে দাবি পরিবারের। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আক্রান্তদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাঁদের বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেয়। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়। ইতিমধ্যে থানায় একটি এফআইআর দায়ের হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।
তবে আক্রান্ত পরিবারের অভিযোগ, এফআইআর দায়ের হওয়ার পরেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অভিযুক্তরা গ্রামে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে দাবি তাঁদের। ফলে আক্রান্ত পরিবার বর্তমানে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
উল্লেখ্য, আক্রান্ত পরিবারটি বালিচক ক্যাথলিক প্যারিশের অধীনস্থ ‘ক্রাইস্ট দ্য কিং মিশন চার্চ’-এর সঙ্গে যুক্ত। ঘটনার খবর পেয়ে BCP-র বালিচক কমিটির প্রতিনিধিরা বিনোদ কুমারের নেতৃত্বে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিবারটির পাশে দাঁড়ান। বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার লিগ্যাল সেলের পক্ষ থেকে আক্রান্ত পরিবারের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক এফআইআর-এর খসড়াও পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইনজীবী পায়েল সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংগঠন সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মহল। তাঁদের অভিযোগ, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সংখ্যালঘু খ্রিস্টান পরিবারগুলির উপর হেনস্থা, হুমকি ও হামলার ঘটনা ঘটছে। মুখ্যমন্ত্রীর নিজের জেলায় এমন অভিযোগ সামনে আসায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আক্রান্ত পরিবার ও বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার পক্ষ থেকে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আক্রান্ত পরিবারের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার রক্ষায় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা।
❤ Support Us







