Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ৩১, ২০২৬

ক্লাসরুমের বচসার জের ! স্কুলের মধ্যেই ছ-বছরের ছাত্রীকে পাথর, ফুলের টব দিয়ে বেপরোয়া আক্রমণ তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়ার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ক্লাসরুমের বচসার জের ! স্কুলের মধ্যেই ছ-বছরের ছাত্রীকে পাথর, ফুলের টব দিয়ে বেপরোয়া আক্রমণ তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়ার

স্কুলের ভিতরেই সহপাঠীর হাতে ভয়াবহ ভাবে আক্রান্ত হল একরত্তি। হরিয়ানার পঞ্চকুলার একটি বেসরকারি স্কুলে কিন্ডারগার্টেনের এক ছাত্রীকে পাথর এবং ফুলের টব দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে তৃতীয় শ্রেণির এক পড়ুয়ার বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, অভিযোগ, মারধরের জেরে মেয়েটি অচৈতন্য হয়ে পড়লেও থামেনি হামলা। তার পর চুলের মুঠি ধরে স্কুলের ভিতরেই তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। গুরুতর জখম অবস্থায় প্রথমে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল ছাত্রীটিকে। পরে অবস্থার গুরুত্ব বুঝে তাকে চণ্ডীগড়ের ‘পোস্টগ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’ (পিজিআই)-এ স্থানান্তরিত করেন চিকিৎসকেরা। যদিও প্রথমে তার অবস্থা সঙ্কটজনক বলে জানা গেলেও, বর্তমানে সে স্থিতিশীল বলে খবর। কী কারণে এমন হিংসার ঘটনা ঘটল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে, সিসিটিভিতে ঘটনার ভিডিও থেকে আঁতকে উঠছেন অভিভাবক থেকে পড়ুরা প্রত্যেকেই।

ঘটনাটি ঘটেছে হরিয়ানার পঞ্চকুলার সেক্টর ২০-এর সংস্কৃতি মডেল স্কুলে। স্কুলের ফাঁকা শ্রেণিকক্ষে একা ছ–বছরের এক খুদে পড়ুয়া। আচমকাই ঘরে ঢুকে পড়ল তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্র। তার পরেই শুরু মারধর। কখনো বেঞ্চের সঙ্গে মাথা ঠুকে দেওয়া, কখনো চুলের মুঠি ধরে মেঝেতে ফেলে লাথি মারা। তাতেও থামল না আক্রমণ। পাথর ও ফুলের টব তুলে নিয়ে বার বার আঘাত করা হল শিশুটির মাথায়। এমনকি, রক্তাক্ত অবস্থায় অচৈতন্য হয়ে পড়ে থাকার পরেও রেহাই পেল না সে। চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মুখেও লাথি মারা হয় বলে অভিযোগ। হরিয়ানার পঞ্চকুলার একটি স্কুলে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় ছড়িয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। স্কুলের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে ঘটনার বেশ কিছু অংশ। সেই ফুটেজ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

ঘটনার বিবরণে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অভিযুক্ত পড়ুয়া প্রথমে ওই ছাত্রীকে তার বাবার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়ার কথা বলে স্কুলের একতলায় ফাঁকা ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। সরল আশ্বাসেই তার সঙ্গে যায় শিশুটি। কিন্তু একতলায় পৌঁছনোর পরেই তার উপর হামলা শুরু হয় বলে অভিযোগ। স্কুলের মতো একটি নিরাপদ পরিসরে কী ভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ঘটনার আরও একটি দিক সামনে এসেছে। জানা গিয়েছে, আক্রান্ত ছাত্রীর বাবা-মা তাকে স্কুল থেকে নিতে এলে অভিযুক্ত ছাত্রই তাঁদের ডেকে নিয়ে যায় ওই শ্রেণিকক্ষে। সেখানে নিয়ে গিয়ে সে জানায়, তাঁদের মেয়ে ঘরের ভিতরে পড়ে রয়েছে। তার কথা শুনে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মেয়ের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যান অভিভাবকেরা। গুরুতর জখম অবস্থায় ছাত্রীটিকে দ্রুত পঞ্চকুলার সেক্টর ৬-এর সিভিল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন, তার আঘাতের গুরুত্ব বিবেচনায় আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। সে কারণে তাকে চণ্ডীগড়ের পিজিআই হাসপাতালে পাঠানো হয়। প্রথম দিকে শিশুটির শারীরিক অবস্থা সঙ্কটজনক বলে জানা গিয়েছিল। পরে অবশ্য তার অবস্থা স্থিতিশীল হয়েছে বলে খবর।

ঘটনার খবর পেয়েই স্কুলে পৌঁছয় স্থানীয় থানার পুলিশ। সেক্টর ২০ থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক যশদীপের নেতৃত্বে তদন্তকারী আধিকারিক প্রদীপ কুমার-সহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। স্কুলের ভিতরে ঠিক কী ঘটেছিল, কী ভাবে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটল, সে সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক বা কর্মীদের কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।  স্কুল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিশেষ করে, স্কুল চলাকালীন ক্ষুদে পড়ুয়াদের উপর নজরদারির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। স্কুলের একতলা ও ফাঁকা শ্রেণিকক্ষে অভিযুক্ত পড়ুয়া ও আক্রান্ত ছাত্রী কী ভাবে পৌঁছল, সে প্রশ্নও তদন্তের আওতায় রয়েছে। অভিযুক্ত পড়ুয়ার বাবা-মাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা। কী কারণে সে এমন আচরণ করল, তার নেপথ্যে কোনও বিবাদ বা অন্য কোনো পরিস্থিতি ছিল কি না, তা বোঝার চেষ্টা চলছে। আহত ছাত্রীর পরিবারের দাবি, এর আগেও অভিযুক্ত পড়ুয়ার আচরণ নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। স্কুলের শিক্ষকদের কাছে ওই ছাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিল কিন্ডারগার্টেনের ছাত্রীটি। সে অভিযোগের জেরেই তার উপর হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে পরিবারের তরফে দাবি করা হয়েছে। অভিযুক্ত ছাত্র এর আগেও একাধিক বার আক্রমণাত্মক আচরণ করেছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার প্রকৃত কারণ ও স্কুল কর্তৃপক্ষের কোনো  গাফিলতি ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

এ ঘটনা স্কুলের ভিতরে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষত কিন্ডারগার্টেনের মতো বয়সে যারা এখনো নিজেদের বিপদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন নয়, তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব স্কুল কর্তৃপক্ষের। অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পাঠান নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার আশায়। সেখানে স্কুলেরই চৌহদ্দির মধ্যে এমন ভয়াবহ হামলার অভিযোগ উঠলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, পড়ুয়াদের উপর নজরদারি এবং নিরাপত্তার বন্দোবস্ত কতটা যথাযথ। পঞ্চকুলার এ ঘটনা অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্কুলের ভিতরে পড়ুয়াদের হাতে সহপাঠীদের আক্রান্ত হওয়ার একাধিক ঘটনার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। গত জুলাইয়ে উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ের একটি বেসরকারি স্কুলে পাঁচ বছরের এক পড়ুয়াকে প্রায় ১২ মিনিট ধরে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল তারই এক সহপাঠিনীর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ওই ছাত্রী স্কুলের ক্লাস মনিটর ছিল। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক না থাকার সুযোগে সে শিশুটিকে চড়, ঘুষি মারে এবং চুল ধরে টানতে থাকে বলে অভিযোগ। পরে সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনাটি ধরা পড়ে। গত সেপ্টেম্বরেই কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলে নবম শ্রেণির এক পড়ুয়াকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার অভিযোগ ওঠে তারই এক সহপাঠীর বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় আহত ছাত্রকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল। দিল্লির মৌজপুরের একটি প্লে-স্কুলে তিন বছরের শিশুকে চেয়ারে বেঁধে রেখে নির্যাতনের অভিযোগও সামনে এসেছিল গত আগস্টে।

কেনই বা তৃতীয় শ্রেণির ওই পড়ুয়া কিন্ডারগার্টেনের ছাত্রীর উপর এমন হামলা চালাল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কেন সাম্প্রতিক সময়ে গোটা দেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে হিংসার প্রবণতা বাড়ছে তা ঘিরেও বাড়ছে উদ্বেগ। অল্প বয়সি পড়ুয়াদের মধ্যে আগ্রাসী আচরণের লক্ষণ দেখা দিলে স্কুল কর্তৃপক্ষ, অভিভাবকদের কী ধরনের পদক্ষেপ করা প্রয়োজন, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। শিশুদের আচরণগত সমস্যা সব সময় শাস্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে তার পিছনে পারিবারিক পরিবেশ, মানসিক চাপ, সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা অন্য কোনো অজানা কারণ থাকতে পারে। তবে কোনো কারণই অন্য শিশুর উপর এমন হামলার অভিযোগকে খাটো করে দেখার সুযোগ দেয় না। একই সঙ্গে অভিযুক্ত পড়ুয়াটিও নাবালক হওয়ায়, ঘটনার তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের ক্ষেত্রে তার বয়স ও আইনি সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মধ্যে আগ্রাসী আচরণের পিছনে পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ থেকে শুরু করে মানসিক চাপ, সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের মতো নানা কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, স্কুলস্তরে নিয়মিত কাউন্সেলিং, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা ও প্রতিটি পড়ুয়ার আচরণের উপর সংবেদনশীল নজরদারিও জরুরি।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!