- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- অক্টোবর ৩১, ২০২৬
শারীরিক অসুস্থতায় ছুটি নিলে কাটা যাবে মজুরি ! মহারাষ্ট্রে ভয়াবহ স্বাস্থ্য-সংকট,আখখেতের মহিলা শ্রমিকরা বাদ দিচ্ছেন জরায়ু
ভোর চারটে। চারদিকে তখনো অন্ধকার। পুরুষেরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই স্নান সেরে নিচ্ছেন মহিলারা। তার পর শুরু হবে আখ কাটার কাজ। একটানা ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত খাটুনি। দৈনিক মজুরি ৪০০ টাকা। কাজ থেকে এক দিন বিরতি নিলেই কাটা যেতে পারে উপার্জনের বড়ো অংশ। ঋতুস্রাবের যন্ত্রণা, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা গর্ভাবস্থার কারণে কাজে যেতে না পারলেও রেহাই নেই। এ পরিস্থিতিতে কাজ ধরে রাখতে, নিয়মিত মজুরি পেতে মহিলাদের একাংশ বেছে নিচ্ছেন ‘হিস্টেরেক্টমি’ — অস্ত্রোপচার করে জরায়ু বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। মহারাষ্ট্রের বেশ কিছু জেলার মহিলা আখশ্রমিকদের জীবনযাপনের এমনই ভয়াবহ বাস্তবতা সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে, জীবিকার তাগিদে নিজের শরীরের উপরেই কি অধিকার হারাচ্ছেন মহিলা শ্রমিকেরা? চিকিৎসাগত প্রয়োজনের বাইরেও কি তাঁদের অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্তের পিছনে কাজ করছে শ্রমব্যবস্থার নির্মমতা, সামাজিক-অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা ?
মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়া অঞ্চলের বীড জেলা থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার আখ কাটার মরসুমি কাজের জন্য অন্যত্র পাড়ি দেয়। নিজেদের এলাকায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। কৃষিকাজের অনিশ্চয়তা, ঋণ ও পরিবারের ভরণপোষণের দায় তাঁদের ঠেলে দেয় এই কঠিন শ্রমের দিকে। মহারাষ্ট্রের অন্য জেলা থেকে শুরু করে প্রতিবেশী কর্নাটক — বিভিন্ন জায়গায় আখ কাটার কাজে কয়েক মাস কাটিয়ে ফের গ্রামে ফেরেন তাঁরা। শ্রমিকদের অধিকাংশই অনানুষ্ঠানিক ঠিকাদার ব্যবস্থার অধীনে কাজ করেন। স্থানীয় ভাষায় এই ঠিকাদারদের বলা হয় ‘মুক্কাদম’। তাঁরাই শ্রমিক জোগাড় করেন, চিনিকলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন এবং কাজের মরসুম শুরুর আগে পরিবারগুলিকে অগ্রিম টাকা দেন। পরে সে টাকা শ্রমিকদের উপার্জন থেকে কেটে নেওয়া হয়।
সমস্যার সূত্রপাত সেখানেই। অগ্রিম টাকা নেওয়ার অর্থ, নির্ধারিত মরসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাজ করে সে টাকা শোধ করতে হবে। মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেওয়া কিংবা অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ দিন অনুপস্থিত থাকলে তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত আর্থিক দায়। ফলে অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজে যেতে বাধ্য হন শ্রমিকেরা। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে এ চাপ বহুগুণ বেশি। কারণ আখ কাটা, সংগ্রহ, বোঝাই ও পরিবহণের জন্য প্রস্তুত করার মতো কঠিন কাজের পাশাপাশি অস্থায়ী শিবিরে রান্না, সন্তানদের দেখাশোনা, সংসারের যাবতীয় দায়িত্বও তাঁদের সামলাতে হয়। এই শ্রমব্যবস্থায় সাধারণত স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে একটি জুটি হিসেবে কাজ করেন। স্থানীয়ভাবে তাঁদের বলা হয় ‘কোইটা’। প্রত্যেক জুটিকে দিনে গড়ে তিন টন আখ কাটতে হয়। সাত-আটটি এমন জুটিকে নিয়ে তৈরি হয় দল। কোনো মহিলা অসুস্থ হয়ে কাজে যেতে না পারলে তাঁর কাজের ঘাটতি পূরণ করতে হয় দলের অন্য শ্রমিকদের। সেই অতিরিক্ত কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট মহিলার উপর জরিমানার বোঝাও চাপতে পারে। ফলে ঋতুস্রাবের যন্ত্রণা কিংবা শারীরিক অসুস্থতার কারণে এক দিনের ছুটি নেওয়াও অনেকের কাছে কার্যত অসম্ভব। এই আখশ্রমিকেরা দিনে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন। বেশিরভাগ সময়েই তাঁদের দৈনিক উপার্জন মাত্র ৪০০ টাকা।
আখখেতে কাজ করা মহিলাদের কাছে ঋতুস্রাবের সমস্যা কেবল শারীরিক অস্বস্তি কিংবা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের রোজগার। অস্থায়ী শ্রমিক শিবিরগুলিতে পর্যাপ্ত শৌচাগার নেই, অনেক জায়গায় নেই পরিষ্কার জলের ব্যবস্থাও। প্লাস্টিকের চাদর, কাঠের খুঁটি দিয়ে তৈরি অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকতে হয় শ্রমিক পরিবারগুলিকে। কয়েক মাস ধরে নিজেদের গ্রাম থেকে দূরে ওই শিবিরে কাটাতে হয় তাঁদের। ঋতুস্রাবের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, কাপড় পরিবর্তন করা কিংবা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তার উপর রয়েছে কাজ হারানোর ভয়। ঋতুস্রাবের সময় তীব্র ব্যথা হলেও কাজে যেতে হয় মহিলাদের। কারণ এক দিন অনুপস্থিত থাকলে মজুরি কেটে নেওয়া হতে পারে। কখনও সেই আর্থিক ক্ষতি এতটাই বেশি যে পরিবারের ঋণ শোধ করা কিংবা দৈনন্দিন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বার বার ঝুঁকে আখ কাটা, ভারী বোঝা তোলা, ট্রাকে আখ বোঝাই করার মতো কাজ করতে হয় তাঁদের।
ফলে যে শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা প্রয়োজন, তা অবহেলিতই থেকে যায়। তীব্র পেটব্যথা, অস্বাভাবিক রক্তপাত কিংবা অন্যান্য স্ত্রীরোগজনিত সমস্যা নিয়েও চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ পান না অনেকে। সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা কর্মস্থল থেকে দূরে হলে কিংবা বেসরকারি চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। বার বার ফিরে আসা শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হিসেবে তখন অনেক মহিলাই জরায়ু অপসারণের সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকছেন। অথচ ঋতুস্রাব কোনও অসুস্থতা নয়। এটি মহিলাদের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। ঋতুস্রাব বন্ধ করার জন্য জরায়ু বাদ দেওয়া চিকিৎসার সাধারণ পদ্ধতি নয়। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে, যেমন জরায়ুর ‘ফাইব্রয়েড’, অস্বাভাবিক রক্তপাত, গুরুতর ‘এন্ডোমেট্রিওসিস’ কিংবা ক্যানসারের মতো রোগে ‘হিস্টেরেক্টমি’ প্রয়োজন হতে পারে। তবে এটি একটি বড়ো এবং অপরিবর্তনীয় অস্ত্রোপচার। চিকিৎসকেরা সাধারণত রোগীর শারীরিক অবস্থা বিচার করে, বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি বিবেচনা করার পরেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেন। জরায়ু বাদ দিলে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়, গর্ভধারণের সম্ভাবনা চিরতরে শেষ হয়।
‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পূর্ণিমা নামে এক মহিলা আখশ্রমিকের অভিজ্ঞতা। দক্ষিণ ভারতের কর্নাটকের প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চল রামানালে কাজ করেন তিনি। নিজের গ্রাম থেকে ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছেছেন। উদ্দেশ্য, আখ কাটার কাজ করে পরিবারের ঋণ শোধ করা। ভোর চারটেয় উঠে স্নান সেরে কাজে বেরিয়ে পড়েন তিনি। তাঁর মতো আরও বহু মহিলা পুরুষদের ঘুম থেকে ওঠার আগেই নিজেদের দৈনন্দিন কাজ সেরে নেন। গত তিন বছর ধরে একটানা যন্ত্রণায় ভুগছেন পূর্ণিমা। সেই কারণে তিনিও জরায়ু বাদ দেওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাড় করাও তাঁর কাছে অন্যতম সমস্যা। তার জন্যও ঋণ নিতে হতে পারে তাঁকে। পূর্ণিমার জানান, ‘নিজের জরায়ু বাদ দেওয়ার জন্যও আমাকে ঋণ করতে হবে। মনে হয়, আমার শরীরটাই এই ব্যবস্থার দাস হয়ে গিয়েছে।’ তিনি জানান, ‘আমাদের কোনো ছুটির দিন নেই। এক বার এখানে চলে এলে পরের চার-পাঁচ মাস প্রতিদিন একটানা কাজ করতে হয়।’ অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা থেকে মুক্তি পেলে ফের কাজে ফিরতে পারবেন, পরিবারের জন্য উপার্জন করতে পারবেন — এ আশাতেই এহেন সিদ্ধান্তের কথা ভাবছেন তিনি।
সবিতা নামে আর এক মহিলা শ্রমিকের অভিজ্ঞতাও একই রকম উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ‘হিস্টেরেক্টমি’ করিয়েছিলেন তিনি। তার আগে তীব্র ব্যথা ও অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারছিলেন না। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বিশ্রাম কিংবা চিকিৎসার সুযোগ পাননি। সবিতা জানান, ‘কাজে কেউ সাহায্য করে না। ওরা আপনাকে একটুও বিশ্রাম নিতে দেয় না। আমি এত অসুস্থ ছিলাম, অথচ কেউ সাহায্য করেনি। পেটে ব্যথা হতো। ট্রাকে আখ তুলতে মই বেয়ে উঠতে পারতাম না। গত বছর তিন বার পড়ে গিয়েছিলাম। তবুও অভিযোগ জানানোর কোনো উপায় ছিল না।’ চিকিৎসকদের বিশ্বাস করে অস্ত্রোপচারে সম্মতি দিয়েছিলেন সবিতা। ভেবেছিলেন, এক বারেই সমস্ত সমস্যা মিটে যাবে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের কয়েক মাস পরেও তাঁর রক্তপাত, ব্যথা অব্যাহত। পরে পুনেতে গিয়ে চিকিৎসা করালে তাঁর শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে বলে জানিয়েছেন তিনি। অস্ত্রোপচারের রিপোর্ট চাইতে গিয়েও তা পাননি বলে অভিযোগ সবিতার। এ অভিজ্ঞতা শুধু অস্ত্রোপচারের পরবর্তী জটিলতার প্রশ্ন নয়। বরং রোগীকে অস্ত্রোপচারের আগে কতটা তথ্য দেওয়া হয়েছিল, বিকল্প চিকিৎসার কথা জানানো হয়েছিল কি না, অস্ত্রোপচারের পরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নথিপত্র পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
এ বিতর্কে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নারী অধিকারকর্মী সঙ্গীতা চবনের অভিযোগ, কিছু মহিলাকে সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসাগত কারণ ছাড়াই অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর। এমনও অভিযোগ উঠেছে, কিছু মহিলাকে ভয় দেখিয়ে বলা হয়েছে, তাঁদের জরায়ু নষ্ট হয়ে গিয়েছে কিংবা অস্ত্রোপচার না করালে ভবিষ্যতে ক্যানসার হতে পারে। সঙ্গীতা আরও অভিযোগ করেছেন, কিছু আশা কর্মী মহিলাদের ‘হিস্টেরেক্টমি’ করানোর জন্য বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর বিনিময়ে টাকা পেয়েছেন। তবে মহারাষ্ট্রের আশা কর্মীরা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ওয়াডওয়ানি এলাকার আশা কর্মী গঙ্গা শেভান্তের বক্তব্য, কম বয়সে মহিলাদের জরায়ু বাদ দেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। কিন্তু সেই অস্ত্রোপচার সরকারি হাসপাতালে হয়েছে, না বেসরকারি হাসপাতালে, তা তাঁর জানা নেই। রোগী পাঠানোর বিনিময়ে আর্থিক প্রণোদনা পাওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, তিনি নিজে কখনো এমন টাকা পাননি, বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শও তিনি দেন না।
তবে সব ক্ষেত্রেই যে অস্ত্রোপচার অপ্রয়োজনীয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। ‘হিস্টেরেক্টমি’ অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। কিন্তু প্রত্যেকটি অস্ত্রোপচারের পিছনে যথাযথ রোগনির্ণয় ছিল কি না, বিকল্প চিকিৎসার কথা রোগীকে জানানো হয়েছিল কি না, কোনো ধরনের আর্থিক বা সামাজিক চাপ ছাড়াই তাঁর সম্মতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বীডের এ সমস্যাও নতুন নয়। ২০১৯ সালেই বিষয়টি প্রথম জাতীয় স্তরে আলোচনায় আসে। তৎকালীন মহারাষ্ট্র বিধান পরিষদের উপসভাপতি নীলম গোরহের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছিল মহারাষ্ট্র সরকার। জুন মাসে গঠিত ওই কমিটি বীডের মহিলা আখশ্রমিকদের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে জরায়ু অপসারণের ঘটনা খতিয়ে দেখে। ২০১৯ সালের অগস্টে প্রকাশিত তদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, জেলার ৮২,৩০৯ জন মহিলার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১৩,৮৬১ জনের গত এক দশকে ‘হিস্টেরেক্টমি’ হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিলার বয়স ছিল ৩৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এমনকি ২৫ বছরের কম বয়সি মহিলাদেরও জরায়ু বাদ দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছিল।
তবে ১৩,৮৬১ সংখ্যাটি সমীক্ষায় অংশ নেওয়া মহিলাদের মধ্যে ‘হিস্টেরেক্টমি’ করানো মহিলাদের মোট সংখ্যা। এর বাইরে, সমীক্ষায় অংশ না নেওয়া, জরায়ু বাদ দেওয়া মহিলাদের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হতে পারে। তবে, রিপোর্ট থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায়, প্রত্যেকটি অস্ত্রোপচার চিকিৎসাগতভাবে যে প্রয়োজনীয় ছিল তাঁর যেমন প্রমাণ নেই, তেমনি কোনো ধরনের চাপে করানো হয়েছিল, এমন প্রমাণও পরিসংখ্যান দেয় নি। বরং এত কম বয়সে বিপুল সংখ্যক মহিলার জরায়ু বাদ দেওয়ার ঘটনা স্বাস্থ্য পরিষেবা, চিকিৎসাগত সম্মতি এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছিল। কমিটির অনুসন্ধানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু ছয় বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও নতুন করে উঠে আসা অভিজ্ঞতা বলছে, সমস্যার শিকড় এখনো সমানভাবে দগদগে।
২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রের স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বীড জেলায় মোট ১,৩১০ জন মহিলার ‘হিস্টেরেক্টমি’ হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১১৩ জন ছিলেন আখশ্রমিক। এই ১১৩ জনের মধ্যে আট জনের বয়স ছিল ৩৫ বছর কিংবা তার কম। ২০১৯ সাল থেকে জেলায় অন্তত ৩৬২ জন মহিলা আখশ্রমিকের জরায়ু বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য দিকে, ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় মহিলা ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রক জানিয়েছিল, ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত বীডে মহিলা আখশ্রমিকদের মধ্যে ২১১টি ‘হিস্টেরেক্টমি’র ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বছরভিত্তিক হিসাবে ২০২২ সালে ৪৯টি, ২০২৩ সালে ৮৯টি, ২০২৪ সালে ৫৫টি এবং ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৮টি অস্ত্রোপচারের কথা জানানো হয়েছিল। সরকারের বক্তব্য ছিল, প্রতিটি অস্ত্রোপচারের আগে জেলা সিভিল সার্জন এবং মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্টের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল, চিকিৎসাগত কারণেই সেগুলি করা হয়েছিল।
এই দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে সময়কাল ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। ফলে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ২১১টি অস্ত্রোপচারের তথ্য, গোটা ২০২৫ সালে ১১৩ জন আখশ্রমিকের অস্ত্রোপচারের তথ্যকে সরাসরি যোগ করা কিংবা একই ধারাবাহিক হিসাব হিসেবে দেখা যায় না। সমস্ত ‘হিস্টেরেক্টমি’ এবং মহিলা আখশ্রমিকদের অস্ত্রোপচারের পৃথক, স্বচ্ছ ও সমন্বিত পরিসংখ্যান প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা এখানেই। কেন্দ্র সরকারের সংসদীয় জবাবে আরও জানানো হয়েছিল, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে ৫০,১৫৮ জন মহিলা পরিযায়ী আখশ্রমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন। রক্তাল্পতা, প্রজনননালির সংক্রমণ, ঋতুস্রাব সংক্রান্ত সমস্যা, অসংক্রামক রোগ এবং জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্তকরণের পরীক্ষা হয়েছিল তাঁদের। বছরে দু-বার, অর্থাৎ অন্যত্র কাজে যাওয়ার আগে এবং ফিরে আসার পর স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছিল মহারাষ্ট্র সরকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শ্রমিকেরা যখন কয়েক মাস ধরে নিজেদের গ্রাম থেকে দূরে থাকেন, তখন তাঁদের কর্মস্থলে এই পরিষেবা কতটা কার্যকর ভাবে পৌঁছয়?
বীডের ঘটনা সামনে আসার পর একাধিক পদক্ষেপ করেছে মহারাষ্ট্র সরকার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জনস্বাস্থ্য দফতর ‘হিস্টেরেক্টমি’ সংক্রান্ত নজরদারি কমিটি পুনর্গঠন ও অস্ত্রোপচারের ঘটনাগুলির ত্রৈমাসিক পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্দেশ্য ছিল, সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা কর্মক্ষেত্রের চাপের কারণে নয়, কেবল চিকিৎসাগত প্রয়োজনেই যেন অস্ত্রোপচার করা হয়, তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ‘আরোগ্য সাথী’ নামে একটি উদ্যোগ চালু করা হয়। আখশ্রমিকদের প্রতিটি দল থেকে এক জন মহিলাকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সহায়তার প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর, ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকারি নির্দেশিকা জারি করে নীলম গোরহের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। প্রতিটি জেলাকে নিজস্ব কমিটি গঠনের নির্দেশও দেওয়া হয়। গত তিন বছরে মহিলা আখশ্রমিকদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা, বেসরকারি হাসপাতালে হওয়া ‘হিস্টেরেক্টমি’, চিকিৎসার নথি এবং অস্ত্রোপচার করানো মহিলাদের অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজ্যস্তরের কমিটিকে।
জেলাস্তরের কমিটিগুলির নেতৃত্বে থাকার কথা জেলা শাসকদের। সরকারি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক, শল্যচিকিৎসক, ‘ফেডারেশন অফ অবস্টেট্রিক অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটিজ অফ ইন্ডিয়া’র প্রতিনিধি এবং বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। বছরে অন্তত দু-বার বৈঠক করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথাও বলা হয়। তবে শুধু কমিটি গঠন করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মহিলা আখশ্রমিকদের রুজিরুটি, কর্মস্থানের পরিবেশ, শারীরিক সুস্থতার প্রশ্ন। কতগুলি অস্ত্রোপচার চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয়েছে, কোথায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, কোনও হাসপাতাল বা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না এবং ক্ষতিগ্রস্ত মহিলাদের কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে — সেসব তথ্য প্রকাশ্যে আনা প্রয়োজন। প্রশাসনিক নজরদারির পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে এ সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বীডের মহিলা আখশ্রমিকদের সমস্যা শুধু হাসপাতাল কিংবা সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গোটা আখশিল্পের সরবরাহব্যবস্থা। মহারাষ্ট্রের এই অঞ্চল থেকে উৎপাদিত আখ চিনিকলে যায়। সেখান থেকে উৎপাদিত চিনি পৌঁছয় বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। এই অঞ্চলের আখ কোকা-কোলা এবং পেপসিকোর মতো বৃহৎ কোমল পানীয় প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত। কোকা-কোলা জানিয়েছে, শ্রমিকদের পরিষ্কার জল, শৌচব্যবস্থা, ছায়াযুক্ত বিশ্রামের জায়গা, কাজের উপযোগী সরঞ্জাম ও মহিলাদের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার সামগ্রীর সুযোগ উন্নত করতে তারা আন্তর্জাতিক সংগঠন সলিডারিডাদের সঙ্গে কাজ করছে। সংস্থার দাবি, এই উদ্যোগে প্রায় এক লক্ষ মানুষ উপকৃত হয়েছেন। তবে পেপসিকো এ বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ বা মন্তব্য করেনি। ফলে, প্রশ্ন উঠছে, যে শিল্পের উৎপাদিত কাঁচামাল থেকে বৃহৎ সংস্থাগুলি লাভবান হচ্ছে, সেই শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কার? শুধু পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী কিংবা বিশ্রামের জায়গার ব্যবস্থা করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? শ্রমিকদের বেতন-সহ ছুটি, নিরাপদ বাসস্থান, স্বচ্ছ মজুরি এবং ঋণনির্ভর শোষণ থেকে সুরক্ষা না থাকলে এ ধরনের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দফতরও এর আগে ভারতের আখ উৎপাদন, বিশেষত বীডের ক্ষেত্রে, জোরপূর্বক শ্রমের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছে। নিয়োগের সঙ্গে যুক্ত ঋণ, অনিচ্ছাকৃত অতিরিক্ত সময় কাজ করানো, অন্যায্য মজুরি কর্তন এবং অবমাননাকর জীবনযাত্রার পরিস্থিতিকে জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকির লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক আখশ্রমিকই জোর করে শ্রম দিতে বাধ্য হন, তবে শ্রমব্যবস্থার বিপজ্জনক দিকটি স্পষ্ট।
বীডের সঙ্কটের সমাধান খুঁজতে গেলে প্রথমেই প্রয়োজন পরিযায়ী মহিলা শ্রমিকদের পৃথক পরিচয় আর নথিভুক্তিকরণ। স্বামী-স্ত্রীকে একক শ্রমিক-জুটি হিসেবে গণ্য করার ফলে বহু ক্ষেত্রে মহিলাদের শ্রমের পৃথক হিসাব থাকে না। তাঁদের মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার অধিকারও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। প্রত্যেক মহিলার নিজস্ব পরিচয়পত্র এবং বিভিন্ন জেলা ও রাজ্যে কার্যকর স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আখখেতের কাছাকাছি শৌচাগার, পরিষ্কার জল, স্নানের ব্যবস্থা, ঋতুস্রাবের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার সামগ্রী এবং বিশ্রামের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অসুস্থতা, গর্ভাবস্থা কিংবা ঋতুস্রাবের কারণে কোনো মহিলা কাজ থেকে বিরতি নিলে তাঁর মজুরি কেটে নেওয়া বা অতিরিক্ত আর্থিক দায় চাপানোর ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজন বেতন-সহ অথবা অন্য কোনো সুরক্ষিত চিকিৎসাজনিত ছুটির ব্যবস্থা। বেসরকারি হাসপাতালগুলির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ চিকিৎসাগত নিরীক্ষা জরুরি। অস্ত্রোপচারের আগে রোগনির্ণয়, বিকল্প চিকিৎসার সুযোগ, রোগীর সম্মতি ও অস্ত্রোপচারের পরবর্তী চিকিৎসার বিবরণ নথিভুক্ত করতে হবে। প্রত্যেক মহিলাকে তাঁর চিকিৎসার নথি পাওয়ার অধিকার দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কিংবা আর্থিক প্রলোভনের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে।
তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন — একজন মহিলা কেন শুধু কাজ ধরে রাখার জন্য নিজের শরীরের উপর এমন অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন? জীবিকার প্রয়োজনে কাজ করা, নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া, এই দু-টির মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার পরিস্থিতি কেন তৈরি হবে? বীডের পূর্ণিমা কিংবা সবিতার অভিজ্ঞতা কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত দুর্ভোগের কাহিনি নয়। বরং অনানুষ্ঠানিক শ্রমব্যবস্থা, ঋণের বোঝা, স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব এবং মহিলাদের শ্রমের অবমূল্যায়নের এক বৃহত্তর ছবির অংশ। পূর্ণিমার কথায়, তিনি অস্ত্রোপচার করাবেন কি না, তা নিয়েই এখনো দ্বিধায় রয়েছেন। অথচ, ব্যথা থেকে মুক্তি পেলে আবার আখখেতে কাজ করতে পারবেন, পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে পারবেন — এ আশাই তাঁকে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২০১৯ সালের তদন্তের ছ-বছর পরেও যদি মহিলাদের সামনে একই বিকল্প থাকে — অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করা, কাজ বন্ধ রেখে ঋণের বোঝা বাড়ানো, অথবা জরায়ু বাদ দিয়ে কর্মক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা — তবে প্রশ্ন উঠবেই, সরকারি নজরদারি আর কল্যাণমূলক প্রকল্পের বাস্তব সুফল নিয়ে। যে শ্রমব্যবস্থায় একজন মহিলাকে উপার্জনের জন্য নিজের প্রজননস্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস করতে হয়, সে ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া এ সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয়। জরায়ু বাদ দেওয়া কোনো মহিলার ব্যক্তিগত চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু কাজ পাওয়ার শর্ত হিসেবে তা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না।
❤ Support Us





