Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • অক্টোবর ১০, ২০২৫

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রয়াত। বাংলা সাহিত্য আরো এক মননশীল, সংবেদনশীল কণ্ঠ হারাল। গল্পের ছন্দে, প্রবন্ধের পাঁজরে, কিংবা চিত্রকলার আলো-ছায়ায় তিনি যুগিয়ে যেতেন ভাবনার সংলাপ। শুক্রবার, বাংলাদেশেরে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। বয়স হয়েছিল পঁচাত্তর।

শুক্রবার সকাল থেকেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল তাঁর। নেওয়া হয়েছিল লাইফ সাপোর্টে। দুপুরে চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, পরিস্থিতি সঙ্কটজনক। শেষ পর্যন্ত বিকেল পাঁচটা নাগাদ তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। তাঁর মৃত্যুতে শুধু বাংলাদেশের সাহিত্য সমাজ, কিংবা তাঁর অসংখ্য ছাত্র, সহকর্মী, পাঠক ও গুণগ্রাহীরা নন, শোকের ছোঁয়া লেগেছে এপার বাংলাতেও। পশ্চিমবঙ্গের সংবেদনশীল পাঠকদের কাছেও পরিচিত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, শনিবার সকাল ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে তাঁর মরদেহ।

মনজুরুল ইসলাম ছিলেন এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ। শিক্ষক হিসেবে যেমন তিনি ছিলেন অনুসন্ধিৎসু ও প্রেরণাময়, লেখক হিসেবে তেমনি ছিলেন সংবেদনশীল ও স্বকীয় স্বরে সমৃদ্ধ। ছাত্রেরা তাঁকে ডাকত ‘এসএমআই স্যার’ নামে। তাঁর ক্লাসে ছিল না কোনো কাঠিন্য। ইংরেজি সাহিত্যকে তিনি বুঝিয়েছেন এমনভাবে, যেন তা বাংলা সাহিত্যের আপন আলোয় মিশে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ১৯৭৪ সালে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। প্রায় চার দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ২০১৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। পরে বেসরকারি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে শিক্ষকতা অব্যাহত রাখেন। শিক্ষকতা তাঁর জন্য পেশা ছিল না, ছিল প্রার্থনার মতো নিবিষ্টতা। তাঁর এক সাবেক ছাত্র জানিয়েছেন, প্রতিটি ক্লাসে তিনি শুধু সাহিত্য শেখাতেন না, শেখাতেন জীবন, সমাজ, ইতিহাস, দর্শন এবং বিশ্বসাহিত্য।

৭০-এর দশকে তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা হলেও, আশির দশকে এসে তিনি সাহিত্যে ফিরেছিলেন এক অন্য মেজাজে। ‘অলস দিনের হাওয়া’ নামক গ্রন্থটি তাঁকে পরিচিত করে তোলে এক নতুন ভাষা ও ভাবনার গল্পকার হিসেবে। বাংলা ছোটগল্পে তিনি এনে দিয়েছিলেন জাদু-বাস্তবতার রঙ, যা কখনও ছিল স্বপ্নের মতো, কখনো আবার হাড়ভাঙা বাস্তবের মতো নির্মম। তাঁর লেখার বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, লেখার গড়ন কখনো জটিল হয়নি। সহজ অথচ গভীর। শব্দে ছিল না বাহুল্য, ছিল ব্যঞ্জনা।

নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে স্বাভাবিকভাবে গল্পে উপস্থাপন করার ক্ষমতা খুব কম লেখকের থাকে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সেটাই করতেন অবলীলায়। তাঁর গল্পে জাদু বাস্তবতা এসেছে সাজিয়ে গুছিয়ে নয়, বরং স্বাভাবিক পরিণতির মতো। তাঁর গল্পগ্রন্থ যেমন ‘থাকা না থাকার গল্প’, ‘কাচ ভাঙা রাতের গল্প’, ‘অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প’, কিংবা ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ পাঠকদের মন ছুঁয়েছে আলাদাভাবে। তাঁর উপন্যাস ‘আধখানা মানুষ্য’, ‘তিন পর্বের জীবন’, ‘আজগুবি রাত’— সবই বাংলা কথাসাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শুধু কথাসাহিত্য নয়, তিনি লিখেছেন ‘নন্দনতত্ত্ব’, ‘অলস দিনের হাওয়া’, ‘রবীন্দ্রনাথের জ্যামিতি ও অন্যান্য শিল্পপ্রসঙ্গ’-এর মতো প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক গ্রন্থও।

চিত্রকলার প্রতিও ছিল তাঁর প্রবল অনুরাগ। শুধু শিল্পরসিক নন, শিল্প-সমালোচক হিসেবেও ছিলেন দুর্দান্ত। বিমূর্ত ছবিকে সাহিত্যের ভাষায় অনুবাদ করতে পারতেন যেভাবে, তা অনন্য। শিল্পের রূপের মধ্যে সংযোগের এক ব্যতিক্রমী সেতুবন্ধন গড়েছিলেন তিনি। কখনো শিল্পাঙ্গনে, কখনো শিল্পপ্রদর্শনীতে— তাঁর উপস্থিতি ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন একুশে পদক (২০১৮), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৬), প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার, কাগজ সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা। তবে স্বীকৃতি তাঁকে আত্মগর্বে ভরিয়ে দেয়নি। ব্যক্তি জীবনে ছিলেন অত্যন্ত নম্র, বিনয়ী এবং আন্তরিক। তাঁর শোককাতর বন্ধু ও ছাত্ররা বলেন, তিনি কাউকে কখনও ছোটো করে দেখতেন না। প্রত্যেককে সম্মান দিতে জানতেন।

শিক্ষক, লেখক, প্রাবন্ধিক, শিল্পবোদ্ধা— সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একার ভেতরে ছিলেন এক বহুমাত্রিক চরিত্র। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য শুধু একজন লেখক নয়, হারাল এক নির্মোহ চিন্তককে, যিনি সহজে কথা বলতেন, গভীর ভাবনা জাগিয়ে তুলতেন, একান্ত মানবিকতার বার্তা বহন করতেন। তাঁর মৃত্যুর ক্ষত বাংলা শিল্প-সাহিত্যের জগতে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকবে। আরম্ভ পত্রিকা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!