- এই মুহূর্তে দে । শ
- ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬
বাংলাদেশ সীমান্তে ‘প্রথম গ্রাম’-এর ডাক, ভোটের মুখে উন্নয়ন-নিরাপত্তার দ্বিমুখী কৌশল বিজেপির
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উন্নয়ন আর নিরাপত্তার সমান্তরাল রেখায় হাঁটতে চাইছে কেন্দ্র। কাছাড় জেলার ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা নাথামপুর গ্রাম থেকে ‘ভাইব্র্যান্ট ভিলেজেস প্রোগ্রাম’ (ভিভিপি)-এর দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা করে এমনই বার্তা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ, ‘সীমান্ত লাগোয়া গ্রাম আর দেশের শেষ প্রান্ত নয়, এরা ভারতের প্রথম গ্রাম।’ তাঁর দাবি, বরাক উপত্যকা-সহ সব সীমান্তবর্তী জেলার প্রতিটি গ্রামে সব রকম সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেবে কেন্দ্রীয় সরকার।
২০২৩ সালে উত্তর সীমান্তকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল এই প্রকল্প। তখন লক্ষ্য ছিল চিনের সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) লাগোয়া গ্রামগুলিকে জনপালায়ন রোখা, সড়ক, বিদ্যুৎ, জীবিকা ও প্রাথমিক পরিষেবার প্রসার সহ সমস্ত অবকাঠামো শক্তিশালী করা। অরুণাচল প্রদেশের উল্টো দিকে চিনের দ্রুত বসতি গড়ে তোলার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রের এ পদক্ষেপকে কৌশলগত পাল্টা-চাল বলেই মনে করেছিলেন অনেকে। প্রথম পর্যায়ে ৪,৮০০ কোটি টাকার বরাদ্দে ২,৯৬৭টি গ্রাম অন্তর্ভুক্ত হয়। অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ ও লাদাখ— চিন সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতেই ছিল মূল জোর।
এ বার দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রকল্পের বিস্তার আরও বহুদূর। এপ্রিল ২০২৫-এ অনুমোদিত এই পর্যায়ের জন্য বরাদ্দ ৬,৩২০ কোটি টাকা, যদিও উদ্বোধনী ভাষণে শাহ ৬,৮৩৯ কোটি টাকার মোট ব্যয়ের কথাও উল্লেখ করেন, যা ২০২৮-২৯ অর্থবর্ষ পর্যন্ত চলবে। ১২টি রাজ্য ও ২টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে ১,৯৫৪টি গ্রামকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার ও বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিও এখন এই কর্মসূচির আওতায়। অসমে কাছাড় ও করিমগঞ্জ জেলার ১৪০টি গ্রাম চিহ্নিত হয়েছে।
অসমে এই সম্প্রসারণের রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশ, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ও সীমান্ত নিরাপত্তা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬ কিলোমিটার; নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল, জলাভূমি, ঘন জঙ্গল ও দুর্গম ভূপ্রকৃতি— নজরদারির পক্ষে বহু জায়গাই চ্যালেঞ্জিং। চোরাচালান, মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ— সংবেদনশীলতার ইতিহাস দীর্ঘ। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে শনাক্ত অনুপ্রবেশের ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ১,১০৪-এ, যা প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই বৃদ্ধির পটভূমিতে রয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা। ২০২৪ সালের অগস্টে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর পরিস্থিতি টালমাটাল হয়। তবে নিরাপত্তা মহলের একাংশের মতে, পরবর্তী সময়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা কমেছে। প্রাক্তন বিএসএফ মহাপরিচালক দিলজিৎ সিং চৌধুরী জানান, ২০২৫ সালে ২,৫৫০-র বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করা হলেও যৌথ টহল ও তথ্য আদানপ্রদানের ফলে সামগ্রিক ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। তাঁর দাবি, শাসন পরিবর্তনের পর অনুপ্রবেশ ‘উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছে’ এবং বাংলাদেশের বর্ডার গার্ডসের সঙ্গে সমন্বয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছে।
তবু সীমান্তের সমস্যা এক্কেবারেই ফুরোয়নি। অসমের দক্ষিণ সালমারা সেক্টর ও পাশের কুচবিহার সেক্টরে বিএসএফ পরিদর্শনে চোরাচালান চক্রের সক্রিয়তা ও উগ্রপন্থার সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। নিরাপত্তা সূত্রের আশঙ্কা, অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানের আইএসআই এই পূর্বাঞ্চলীয় করিডরকে কাজে লাগিয়ে উত্তর-পূর্বে নাশকতার ছক কষতে পারে। ফেব্রুয়ারি ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১,৪২২টি ‘পুশব্যাক’-এর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৫-এর শেষভাগেই ৮১টি ঘটনা।এ আবহে শাহের রাজনৈতিক সুর তীব্র। তিনি অভিযোগ তোলেন, কংগ্রেস শাসনে সীমান্ত কার্যত ‘খোলা’ ছিল, অনুপ্রবেশকারীরা অসমের যুবকদের কর্মসংস্থান, দরিদ্রের রেশন ও গ্রামাঞ্চলের জমি দখল করেছে, জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলানোর চেষ্টা হয়েছে। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘কংগ্রেস আমলে যারা ঢুকেছে, প্রত্যেককে খুঁজে বের করে ফেরত পাঠাব।’ আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে এ বক্তব্য যে বিজেপির প্রধান নির্বাচনী সুর, তা স্পষ্ট।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা-ও বহুবার জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, ২০১১ সালে রাজ্যে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ছিল ৩৪ শতাংশ, যা ২০২৭ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশে পৌঁছতে পারে; এর বড়ো অংশই বাংলাদেশি উৎসের অভিবাসনের ফল। ধুবরি ও বরপেটার মতো জেলায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও তিনি বলেছেন। উন্নয়নের খতিয়ানও তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ২০১৩-১৪ সালে অসমের মাথাপিছু আয় ছিল ৪৯ হাজার টাকা, যা ২০২৫-২৬ সালে বেড়ে ১.৫৪ লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে। গত ৫ বছরে প্রতিদিন গড়ে ১৪ কিলোমিটার করে রাস্তা তৈরি হয়েছে; ২৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি রাস্তা তৈরি হয়েছে; অসংখ্য ছোটো সেতু এবং ৪টি বড়ো সেতু নির্মিত হয়েছে। সীমান্তগ্রামে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কর্মসূচি, প্রকল্প ও সংযোগে অতিরিক্ত জোর দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অন্য দিকে, দ্বিতীয় পর্যায়ে মেঘালয়েও ৯২টি গ্রাম চিহ্নিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে সাংমা বিধানসভায় জানিয়েছেন, প্রকল্প এখনো পরিকল্পনা স্তরে; নির্দিষ্ট বাজেট বা প্রকল্পের খুঁটিনাটি রাজ্যকে জানানো হয়নি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্ধারিত মানদণ্ডেই গ্রাম নির্বাচন হয়েছে। জেলা স্তরে ডেপুটি কমিশনারদের নেতৃত্বে কমিটি গঠিত হলেও বিধায়কদের অন্তর্ভুক্ত না করা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন কয়েকজন জনপ্রতিনিধি; রাজ্য সরকার বিষয়টি কেন্দ্রের কাছে উত্থাপন করেছে। ২০২৮-২৯ অর্থবর্ষ পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে, কিন্তু ২০২৫-২৬ সালের বরাদ্দ এখনও নির্দিষ্ট হয়নি।
❤ Support Us






