- এই মুহূর্তে দে । শ
- ডিসেম্বর ১৭, ২০২৫
আরএসএস–ঘনিষ্ঠ ‘ভারত বোধ আইকেএস’ পরীক্ষার জন্য বিশ্বভারতীর সেমেস্টার সূচিতে বদল, তীব্র বিতর্ক রাজনৈতিক ও শিক্ষামহলে
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) পরিচালিত ‘ভারত বোধ আইকেএস’ পরীক্ষার কারণে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সেমেস্টার পরীক্ষার সূচিতে বদল আনা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষামহল ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্বভারতীতে আগামী ৭ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ পর্যন্ত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের সেমেস্টার পরীক্ষা নির্ধারিত ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি নোটিশ জারি করে সমস্ত ভবনের অধ্যক্ষ ও বিভাগীয় প্রধানদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, ২৯ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোনও পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। কারণ ওই সময় দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে আরএসএস–ঘনিষ্ঠ বিদ্যাভারতীর প্রকল্প ‘ভারত বোধ’-এর অধীন ‘আইকেএস’ পরীক্ষা, যা ৩১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
এই সিদ্ধান্তের জেরে বহু বিভাগকে নতুন করে পরীক্ষার সূচি তৈরি করতে হচ্ছে, যা নিয়ে ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক–অধ্যাপিকারা। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক অধ্যাপক জানান, “সব পরীক্ষা সূচি আগেই চূড়ান্ত করে ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার নতুন করে সব সাজাতে গিয়ে চরম সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।”
বিশ্বভারতীর ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষ অবশ্য বিতর্ক উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “পরীক্ষার তারিখ বদল হয়নি। মাঝখানের কয়েকদিন মাত্র পরীক্ষা রাখা হয়নি। বিশ্বভারতী একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রের নির্দেশ মেনেই কাজ করে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।”
তবে প্রশ্ন উঠছে—একটি বেসরকারি সংগঠনের পরীক্ষার জন্য কেন ইউনেস্কো স্বীকৃত ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ তকমাধারী বিশ্বভারতীকে নিজের সেমেস্টার পরীক্ষার সূচি বদলাতে হবে? সমালোচকদের দাবি, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন উঠছে।
উল্লেখ্য, আরএসএস-এর শিক্ষা শাখা বিদ্যাভারতীর একটি প্রকল্প হল ‘ভারত বোধ’। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য যুবসমাজকে ভারতীয় সংস্কৃতি, দর্শন, আয়ুর্বেদ, জ্যোতির্বিদ্যা ও যোগচর্চার সঙ্গে যুক্ত করা, যা ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হয়।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র। সিপিআইএমের বীরভূম জেলা সম্পাদক গৌতম ঘোষ বলেন, “গুরুদেবের বিশ্বভারতী এখন কার্যত আরএসএসের নিয়ন্ত্রণে। রবীন্দ্রনাথের আদর্শ মুছে দিয়ে সঙ্ঘ তাদের নিজস্ব এজেন্ডা চাপাতে চাইছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।”
অন্যদিকে বিজেপির বোলপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল বলেন, “এটি সম্পূর্ণ বিশ্বভারতীর অভ্যন্তরীণ বিষয়। কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষামূলক পরীক্ষার বিরোধিতা কেন?”
তৃণমূল কংগ্রেসের বীরভূম জেলা মুখপাত্র জামশেদ আলি খান অভিযোগ করেন, “আরএসএস ও বিজেপি পরিকল্পিতভাবে বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রনাথের ভাবধারা মুছে দিতে চাইছে। নিজেদের পরীক্ষা সরিয়ে রেখে বেসরকারি সংগঠনের পরীক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তৃণমূল ছাত্র পরিষদ এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামবে।”
আরএসএসের রাজ্য কমিটির সদস্য শিবাজীপ্রসাদ মণ্ডল অবশ্য বলেন, “বিদ্যাভারতী একটি শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান। ভারতবোধ গড়ে তোলাই লক্ষ্য। দেশজুড়ে এই পরীক্ষা হবে। শিক্ষার নামে এত আপত্তি কেন?”
প্রসঙ্গত, এর আগেও রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সংগঠনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা স্থগিত বা চালু রাখা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্বভারতীতে ‘গৈরিকীকরণ’-এর অভিযোগে অতীতে একাধিকবার ছাত্র আন্দোলন ও বিক্ষোভ হয়েছে। কিছুদিন বিতর্কমুক্ত থাকার পর ফের আরএসএস–ঘনিষ্ঠ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তাপ ছড়াল বিশ্বভারতীতে।
প্রবীণ আশ্রমিক অপর্ণা দাস মহাপাত্র ও সুপ্রিয় ঠাকুরের কথায়, “রবীন্দ্রনাথের আদর্শ ধীরে ধীরে বিসর্জিত হচ্ছে। আগে বিশ্বভারতীতে এমন সক্রিয় রাজনীতি দেখিনি। এখন শিক্ষা ও সংস্কৃতির জায়গায় রাজনীতিই প্রধান হয়ে উঠছে।”
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বভারতীর ভবিষ্যৎ পথ ও তার আদর্শিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও প্রশ্ন উঠে গেল।
❤ Support Us






