- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ৭, ২০২৬
অবলুপ্ত হচ্ছে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন, মাদ্রাসায় শিক্ষক-কর্মী নিয়োগের দায়িত্বেও এসএসসি ?
রাজ্যের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী নিয়োগ ব্যবস্থায় বড়োসড়ো প্রশাসনিক পরিবর্তন। এবার থেকে মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের জন্য পৃথক কোনও কমিশনের ব্যবস্থা থাকবে না। মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন তুলে দেওয়া হয়েছে এবং সেটিকে স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এবার মাদ্রাসাতেও শিক্ষক নিয়োগ করবে স্কুল সার্ভিস কমিশন। তবে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া এখনো বাকি।
মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘ দিনের পৃথক ব্যবস্থা বদলে ফেলতে চলেছে রাজ্য সরকার। সাধারণ স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব যে স্কুল সার্ভিস কমিশনের হাতে, মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও সেই একই কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে এত দিন যে নিয়োগ প্রক্রিয়া মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে চলত, তার জায়গায় নতুন ব্যবস্থায় এসএসসিই নিয়োগের দায়িত্ব নেবে। তবে ঘোষণার পরেই সমস্ত নিয়ম বদলে যাচ্ছে, এমনটা নয়। মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন এবং এসএসসির নিয়োগ কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে হবে। সে আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেই নতুন ব্যবস্থা পূর্ণ মাত্রায় কার্যকর হওয়ার কথা।
এত দিন সাধারণ স্কুল এবং মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগ ছিল দুই পৃথক ব্যবস্থার অধীনে। সাধারণ স্কুলের ক্ষেত্রে এসএসসি এবং মাদ্রাসার ক্ষেত্রে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করত। ফলে শিক্ষকতার চাকরির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া প্রার্থীদের দু-টি পৃথক নিয়োগ ব্যবস্থার দিকে নজর রাখতে হতো। রাজ্য সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে সে বিভাজন তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলো। সরকারের পরিকল্পনা কার্যকর হলে মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগও এসএসসির নিয়োগ কাঠামোর মধ্যে চলে আসবে। ফলে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে আবেদন, পরীক্ষা, মেধা তালিকা ও নিয়োগ — পুরো প্রক্রিয়াই এক কমিশনের অধীনে আনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে মাদ্রাসার জন্য আলাদা শূন্যপদ, আলাদা মেধা তালিকা বা সাধারণ স্কুলের সঙ্গে একই প্যানেল—কোন পদ্ধতি নেওয়া হবে, তা এখনো সরকারি ভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি। নতুন নিয়োগবিধি প্রকাশের পরেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
কেন এই বদল ?
রাজ্য প্রশাসনের যুক্তি, শিক্ষক নিয়োগে পৃথক পৃথক কাঠামো রাখার পরিবর্তে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হলে প্রশাসনিক জটিলতা কমতে পারে। একই সঙ্গে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মের সামঞ্জস্য রাখার সুযোগও তৈরি হবে। চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এখনো পর্যন্ত মাদ্রাসায় শিক্ষকতার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের এসএসসি এবং মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন — দুই দিকের বিজ্ঞপ্তি, যোগ্যতা ও পরীক্ষার নিয়ম সম্পর্কে আলাদা করে খোঁজ রাখতে হতো। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে সেই পৃথক কাঠামোর প্রয়োজন অনেকটাই কমবে। তবে, দুই ক্ষেত্রেই যে পরীক্ষার সিলেবাস, বয়সসীমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা নিয়োগের ধাপ অপরিবর্তিত থাকবে — এমন কোনো সরকারি ঘোষণা এখনো হয়নি। ফলে নতুন বিধি প্রকাশের আগে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন তৈরির পিছনে নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। ফলে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশে সেই কমিশনের আইনি অস্তিত্ব পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব নয়। বিধানসভায় প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন বা বাতিলের প্রক্রিয়া করতে হবে। একই সঙ্গে এসএসসির মাধ্যমে মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের আইনি ভিত্তিও স্পষ্ট করতে হবে। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে বিধানসভায় প্রয়োজনীয় বিল আনা এবং সংশ্লিষ্ট বিধি বদল। এ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেই নতুন নিয়োগ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রকাশ করা সম্ভব হবে। এদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে শুরু হওয়া বা অপেক্ষমাণ নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালেও নিয়োগ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি এবং কাউন্সেলিংয়ের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ফলে পুরনো ব্যবস্থায় যে নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলি শুরু হয়ে গিয়েছে, সেগুলি কী ভাবে শেষ করা হবে, না কি নতুন ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসা হবে — তা নিয়েও চাকরিপ্রার্থীদের নজর থাকবে সরকারের পরবর্তী বিজ্ঞপ্তির দিকে।
ক্ষমতার পালাবদলের পর, রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক পরিসরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। বিশেষ করে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অনুমোদনহীন মাদ্রাসার সংখ্যা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনিক মহলের একাংশের দাবি, ২০০৮ সালের পর থেকে স্বীকৃত মাদ্রাসার সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য কোনও বৃদ্ধি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে সেই ৬১৪টি প্রতিষ্ঠানই স্বীকৃতির তালিকায় রয়ে যায়। নতুন করে কোনো সরকার স্বীকৃত মাদ্রাসা গড়ে ওঠেনি তৃণমূল জমানায়। পাল্লা দিয়ে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অনুমোদনহীন বা ‘খারিজি’ মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশাসনের সাম্প্রতিক সমীক্ষাতেও একাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, পরিকাঠামো এবং পরিচালন ব্যবস্থা নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে যাচাই এবং নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসনের একাংশ।
সম্প্রতি কলকাতা-সহ রাজ্যের ২২টি জেলা জুড়ে মাদ্রাসাগুলির পরিস্থিতি যাচাই করতে সমীক্ষা চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানগুলির অনুমোদন, পরিকাঠামো, শিক্ষক ও পড়ুয়ার সংখ্যা, পরিচালন ব্যবস্থা এবং অর্থের উৎস — একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। জেলা প্রশাসনের রিপোর্টের পর রাজ্য স্তর থেকেও পুনরায় যাচাইয়ের জন্য বিশেষ দল পাঠানো হয়েছিল। সে সমীক্ষায় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২,১৩২টি মাদ্রাসা প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা স্বীকৃতি নিয়ে চলছে। অন্যদিকে ২,৩৯৬টি মাদ্রাসার প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন বা সংশ্লিষ্ট বোর্ডের স্বীকৃতি নেই বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। এর পরেই প্রথম দফায় ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। আরও প্রায় ১০০টি মাদ্রাসাকে পাঠানো হয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিস। ওই প্রতিষ্ঠানগুলির বক্তব্য খতিয়ে দেখার পরে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, বন্ধের নির্দেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের অভাব এবং ন্যূনতম পরিকাঠামোর ঘাটতি-সহ একাধিক অনিয়ম ধরা পড়েছে। তবে অনুমোদিত মাদ্রাসাগুলিকে এই সিদ্ধান্তের আওতায় আনা হয়নি।
প্রশাসনের সমীক্ষার পর যে ছবিটি সামনে এসেছে, তাতে রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার একটা বড়ো অংশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি অনুমোদন ছাড়া এত সংখ্যক প্রতিষ্ঠান কী ভাবে এত দিন চলল, তাদের পড়ুয়া ও শিক্ষক সংখ্যাই বা কত, কী ভাবে তাদের পরিকাঠামো চলছে—এই সব প্রশ্নই এখন প্রশাসনের নজরে। প্রথম দফায় ২৫২টি প্রতিষ্ঠানকে বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি আরও ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যথাযথ নথি বা অনুমোদন দেখাতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে প্রশাসন জানিয়েছে। জেলাভিত্তিক হিসাবেও বেশ কিছু এলাকায় এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। মালদহে প্রায় ৪৪-৪৫টি, উত্তর দিনাজপুরে প্রায় ৩৭টি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় প্রায় ৩২টি মাদ্রাসা বন্ধের তালিকায় রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে। মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়াতেও একাধিক প্রতিষ্ঠান এই তালিকায় রয়েছে।
মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন উঠে গেলে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে শিক্ষক নিয়োগের উপরেই। কারণ, এত দিন মাদ্রাসার জন্য পৃথক কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা ছিল। নতুন ব্যবস্থায় এসএসসি দায়িত্ব নিলে নিয়োগের কাঠামোও বদলাতে হবে। চাকরিপ্রার্থীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — মাদ্রাসার শিক্ষকতার জন্য আলাদা বিজ্ঞপ্তি হবে কি না, মাদ্রাসার শূন্যপদ কী ভাবে প্রকাশ করা হবে, প্রার্থীদের যোগ্যতার মাপকাঠি কী হবে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও সিলেবাসে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না এবং পুরনো নিয়োগের ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এসবের কোনোটিরই চূড়ান্ত উত্তর এখনো মেলেনি। ফলে বিভিন্ন মহলে নানা সম্ভাবনার কথা উঠলেও সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সেগুলিকে নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই।
অন্যদিকে, সমালোচকদের প্রশ্ন, মাদ্রাসার নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে নতুন নিয়োগ কাঠামো তৈরি হবে। কারণ, মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী কিছু পৃথক প্রয়োজন থাকতেই পারে। ফলে, নতুন নিয়ম তৈরির সময় সেই বিষয়গুলিও কী ভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, গেরুয়া শিবিরের বিরুদ্ধে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় আদর্শ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা সহ একাধিক অভিযোগ নানান সময়ে বারবার উঠেছে। মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন গঠন ও তার কার্যক্রমের সঙ্গে ইতিহাস আর বিতর্ক দুই-ই রয়েছে। ২০০৮ সালের আগে মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের জন্য পৃথক কোনো কমিশন বা নির্দিষ্ট নিয়োগ কাঠামো ছিল না। ২০০৭ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যের ৬১৪টি মাদ্রাসাকে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেয়। তার পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৮ সালে তৈরি হয় মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন আইন। সে আইনের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়ে এসেছে। এ বার সেই ব্যবস্থাতেই বদল আনতে চাইছে রাজ্য সরকার।
❤ Support Us







