Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • মার্চ ১০, ২০২৬

যুদ্ধের জেরে গ্যাস সংকট, বাণিজ্যিক এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি । বন্ধের মুখে মেট্রো শহরের বহু হোটেল–রেস্তোরাঁ। সংকটে পরিবহণ ব্যবস্থাও   

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
যুদ্ধের জেরে গ্যাস সংকট, বাণিজ্যিক এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি । বন্ধের মুখে মেট্রো শহরের বহু  হোটেল–রেস্তোরাঁ। সংকটে পরিবহণ ব্যবস্থাও   

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে ভারতের হোটেল ও রেস্তোরাঁ শিল্পে। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের নির্দেশে অস্থায়ী ভাবে বন্ধ কলকাতা, বেঙ্গালুরু ও মুম্বই সহ একাধিক শহরের বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ।ফলে, চরম সঙ্কটে পড়েছে হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী দু-দিনের মধ্যেই শহরগুলোর বহু হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেকারি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক তেল শোধনাগারগুলিকে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর জরুরি নির্দেশ দিয়েছে।

হোটেল মালিকদের দাবি, বেঙ্গালুরুতে বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বেঙ্গালুরু হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পি. সি. রাও স্পষ্ট জানিয়েছেন, যদি অবিলম্বে গ্যাসের জোগান স্বাভাবিক না হয়, তবে মঙ্গলবার থেকেই শহরের বহু হোটেল ও রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখতে বাধ্য হবেন তাঁরা। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি, তবে এখনো পর্যন্ত সমস্যার কোনো সমাধান মেলেনি বলে দাবি। একই ছবি দেখা যাচ্ছে মুম্বইয়েও। ইন্ডিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিজয় শেট্টির জানিয়েছেন, রবিবার থেকেই মুম্বইয়ের বহু রেস্তোরাঁয় বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে পরিস্থিতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তবে আগামী দু-দিনের মধ্যে শহরের প্রায় সমস্ত হোটেল ও রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। চেন্নাইয়েও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেখানকার হোটেল অ্যাসোসিয়েশন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে জানিয়েছে, হাসপাতাল, কলেজ হস্টেল এবং ট্রেন যাত্রীদের জন্য খাবার সরবরাহ যাতে বন্ধ না হয়, তার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

কলকাতার হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকদের দাবি, সোমবার থেকেই বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক জায়গায় সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় রান্নাঘরের কাজ চালানোই দুষ্কর হয়ে উঠেছে। শহরের কয়েকটি বড়ো বেকারি ও খাবার প্রস্তুতকারী সংস্থা ইতিমধ্যেই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বলে শিল্পমহলের সূত্রে জানা গিয়েছে। দ্য ললিত সুরি হসপিটালিটি গ্রুপের ডেভেলপমেন্ট বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার কামাল রাজা জানিয়েছেন, ‘আমাদের সীমিত পরিমাণ এলপিজি ব্যবহার করে কাজ চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী গ্যাসের ব্যবহার কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে যত দিন সম্ভব পরিষেবা চালু রাখা যায়।’

রেস্তোরাঁ শিল্পেও শুরু হয়েছে মজুত পর্যালোচনা। স্পেশালিটি রেস্তোরাঁস লিমিটেডের চেয়ারম্যান অঞ্জন চট্টোপাধ্যায় জানান, তাঁদের বিভিন্ন ব্র্যান্ড— ‘মেইনল্যান্ড চায়না’, ‘ওহ! ক্যালকাটা’ এবং ‘ক্যাফে মেজুনা’ এখন মজুত গ্যাস হিসেব করে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আগামী দিনে এলপিজি ঘাটতির কথা আমাদের জানানো হয়েছে। সে কারণে আমরা মজুত গ্যাসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করছি। কয়েক দিনের মতো সিলিন্ডার রয়েছে। আশা করছি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে।’ তবে শিল্প সংগঠনগুলির আশঙ্কা, পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে আতিথ্য শিল্প বড় সঙ্কটে পড়বে। হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সভাপতি সুদেশ পোদ্দার বলেন, ‘সরকার যদি সম্পূর্ণ ভাবে বাণিজ্যিক সিলিন্ডার রিফিল বন্ধ করে দেয়, তা হলে আতিথ্য শিল্পে ব্যাপক সমস্যা তৈরি হবে। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, অন্তত সীমিত পরিমাণে হলেও বাণিজ্যিক এলপিজি সরবরাহ চালু রাখা হোক।’

গ্যাস সংকটের মূল কারণ, পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ বাহিনী। তার পর থেকেই ওই অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এই প্রণালী দিয়েই বিশ্বের বহু দেশে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। ভারতের এলপিজি আমদানির প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে এবং তার প্রভাব পড়ছে গ্যাসের বাজারেও। সোমবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বোচ্চ। যদিও মঙ্গলবার তা কিছুটা কমে প্রায় ৯২ ডলারে নেমে এসেছে। এই অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। গত ৭ মার্চ দেশজুড়ে ১৪.২ কেজির গৃহস্থালি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা এবং ১৯ কেজির বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ১১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

যদিও পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারতীয় তেল সংস্থাগুলি জানিয়েছিল, অন্তত ৭০ দিন পর্যন্ত দেশে গ্যাস সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু তার মধ্যেই হঠাৎ করে বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহে সমস্যা দেখা দেওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে। হোটেল ও রেস্তোরাঁ শিল্পের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এই শিল্পে লক্ষ লক্ষ মানুষের রোজগার নির্ভর করে। পাশাপাশি বহু সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে ছাত্রছাত্রী, চাকরিজীবী ও বয়স্ক মানুষ প্রতিদিনের খাবারের জন্য হোটেল বা রেস্তোরাঁর উপর নির্ভরশীল। ফলে বাণিজ্যিক গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সমস্যায় পড়বেন সাধারণ মানুষও।

এদিকে এই পরিস্থিতির প্রভাব ঘরোয়া এলপিজি সিলিন্ডারের উপরও পড়তে পারে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় অনেকেই আগেভাগেই সিলিন্ডার বুকিং করতে শুরু করেছেন। যাঁদের বাড়িতে দুটি সিলিন্ডার রয়েছে, তাঁরা আগাম বুকিং করে রাখছেন। কেন্দ্রীয় সরকার আপাতত ঘরোয়া এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সে কারণে সিলিন্ডার বুকিংয়ের নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে যেখানে ২০ দিন অন্তর নতুন সিলিন্ডার বুক করা যেত, এখন তা বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কালোবাজারির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

এই মুহূর্তে, আমদানিকৃত এলপিজি থেকে অ-গৃহস্থালি ক্ষেত্রের জন্য সীমিত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা রেখেছে কেন্দ্র সরকার। তবে সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবাকে। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও শিল্পক্ষেত্রে গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য তেল বিপণন সংস্থাগুলির ৩ জন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরকে নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বিভিন্ন সংস্থার আবেদন খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে কোথায় এবং কী পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি আশ্বস্ত করেছেন যে ভারত এই সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম। তাঁর বক্তব্য, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পথ খোঁজা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব পড়তে পারে শহরের পরিবহণ ব্যবস্থাতেও। কলকাতার অটোচালকদের একাংশ ইতিমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস বা সিএনজি-র দাম বাড়ে, তা হলে রাস্তায় গাড়ি চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে। শহরের বিভিন্ন রুটের অটোচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার কয়েকটি পাম্পে প্রতি কিলোগ্রাম সিএনজি বিক্রি হয়েছে ৫৭ টাকা ৬৮ পয়সা দরে। অন্যদিকে দমদম, বাগুইআটি বা সল্টলেকের মতো উত্তর শহরতলির এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে গ্যাসের দাম দাঁড়িয়েছে ৬২ টাকা ৪৮ পয়সা। অর্থাৎ আগের তুলনায় প্রায় ৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। অটোচালকদের অভিযোগ, সব পাম্পে সিএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে যেখানেই গ্যাস মিলছে, সেখানেই দীর্ঘ লাইন পড়ছে। দক্ষিণ কলকাতার একটি অটো ইউনিয়নের নেতা অশোক চক্রবর্তী বলেন, ‘সব পাম্পে গ্যাস না থাকায় কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় চাপ বাড়ছে। সে কারণে দীর্ঘ লাইন পড়ছে।’

অটোচালকদের মতে, এমনিতেই যাত্রী কমে যাওয়ায় তাঁদের আয় কমেছে। ই-রিকশা এবং অ্যাপভিত্তিক বাইক পরিষেবার দাপটে অটোচালকদের ব্যবসা আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক অন্তত ১০০ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে প্রায় ২ হাজার টাকার ভাড়া না তুলতে পারলে লাভের মুখ দেখা কঠিন। কিন্তু বর্তমানে সপ্তাহে ৩ দিনও সেই আয় হচ্ছে না। তবে সরকারি আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। তাঁদের দাবি, দেশের পেট্রল পাম্পগুলিতে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে। তবু শিল্পমহলের একাংশের মতে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা হলে তার প্রভাব ভারতের জ্বালানি বাজারে আরও গভীর হতে পারে। সে পরিস্থিতিতে রেস্তোরাঁ, বেকারি ও খাদ্যশিল্প, পরিবহণ-সহ বহু ব্যবসা কঠিন সঙ্কটে পড়তে পারে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতিনিধিরা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!