Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • এপ্রিল ২৩, ২০২৬

জেলায় জেলায় বিক্ষিপ্ত অশান্তি, বোমাবাজি, ইভিএম বিভ্রাট : প্রথম দফায় রাজ্যজুড়ে ভোটে উত্তাপ। ‘সব নজরে রয়েছে’ দাবি কমিশনের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জেলায় জেলায় বিক্ষিপ্ত অশান্তি, বোমাবাজি, ইভিএম বিভ্রাট : প্রথম দফায় রাজ্যজুড়ে ভোটে উত্তাপ। ‘সব নজরে রয়েছে’ দাবি কমিশনের

সকাল ৭টা বাজতেই শুরু হয়েছে বহু প্রতীক্ষিত প্রথম দফার ভোটগ্রহণ। রাজ্যের ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্র জুড়ে গণতন্ত্রের উৎসবের সূচনা হলেও, শুরু থেকেই সে আবহে মিশে গেল উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং বিক্ষিপ্ত অশান্তির ছায়া। সময় যত গড়িয়েছে, অভিযোগের বহরও তত বেড়েছে— ইভিএম বিকল থেকে বোমাবাজি, ভুয়ো ভোট থেকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, সব মিলিয়ে দিনভর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে একাধিক জেলা।

সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল সিইও দফতরে পৌঁছন। প্রবেশের মুখেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়ে তিনি সংক্ষিপ্ত জবাব দেন— ‘হ্যাঁ, খবর এসেছে। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ মালদার মোথাবাড়িতে ইভিএম খারাপ হয়ে ভোটগ্রহণ শুরু না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই তিনি জানান, কমিশনের প্রতিনিধি ইতিমধ্যেই কড়া পদক্ষেপ করছেন। শুধু ইভিএম নয়, বিভিন্ন বুথে সিসি ক্যামেরা বিকল হওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। সেই প্রসঙ্গেও একই সুরে আশ্বাস দেন তিনি—‘সেটাও ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু মাঠের চিত্র বলছিল অন্য কথা।

মালদার মোথাবাড়িতে ভোট শুরুর দেড় ঘণ্টা পরেও ভোটগ্রহণ শুরু করা যায়নি বলে অভিযোগ ওঠে। ইভিএম বিকলের জেরে ক্ষুব্ধ ভোটাররা সেক্টর অফিসারকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখান। একই ধরনের চিত্র ধরা পড়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। বাঁকুড়ার সারদামনি মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ১৮৭ নম্বর বুথে ইভিএম খারাপ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভোট দিতে পারেননি অনেকে। কেউ আধ ঘণ্টা, কেউ বা চল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করেছেন—তবু ভোটগ্রহণ শুরু হয়নি নির্ধারিত সময়ে।  মুর্শিদাবাদের কান্দি বিধানসভার ১৩০ নম্বর বুথে ইভিএম সমস্যার কারণে ভোটগ্রহণ শুরুতে দেরি হয়। একই অভিযোগ ওঠে শামসেরগঞ্জের ২১২ নম্বর বুথেও। শিলিগুড়ির মার্গারেট স্কুলের ২৬/৩১ নম্বর বুথেও সকাল থেকেই লম্বা লাইন, কিন্তু মেশিন বিকলের কারণে ভোট শুরু হয়নি সময়মতো। কেন এই বিলম্ব, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের তরফে স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি বলে জানা গিয়েছে।

অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের নওদা হয়ে ওঠে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে বোমাবাজির অভিযোগ ঘিরে চরম অশান্তি ছড়ায়। আমজনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীরকে ঘিরে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের ‘গো ব্যাক’ এবং ‘চোর’ স্লোগান পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। শিবনগর গ্রামের ১৭৩ নম্বর বুথের সামনে তাঁর গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ চলে। এক পর্যায়ে তিনি রাস্তার মাঝখানে লরির সামনে চেয়ার নিয়ে বসে পড়েন, পাশে দাঁড়ানো সমর্থকেরা হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করতে থাকেন তাঁকে। ক্ষোভে ফুঁসে উঠে তিনি অভিযোগ করেন, ‘পুলিশ পুরো তৃণমূলের দালালি করছে। বেআইনি রিভলভার নিয়ে মস্তানবাহিনী নামানো হয়েছে। রাতভর মহিলাদের উপর অত্যাচার হয়েছে।’ পাল্টা হুঁশিয়ারিও দেন—‘আমার লোককে পাথর ছুড়লে কি রসগোল্লা ছুড়বে?’

শিলিগুড়িতে উঠে আসে ভুয়ো ভোটের গুরুতর অভিযোগ। ভারতনগরের রামকৃষ্ণ পাঠশালা বিদ্যালয়ের এক মহিলা ভোটার জানান, আধ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর তাঁকে জানানো হয় তাঁর ভোট আগেই পড়ে গিয়েছে। বিস্মিত ও হতাশ ওই ভোটার বলেন, ‘প্রথমবার ভোট দিতে এসেছিলাম। সব নথি নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আমাকে বলা হল, অন্য কেউ আমার ভোট দিয়ে দিয়েছে। এর পর থেকে ভোট দিতে না এলেই তো হয়!’ ডোমকলেও ভোটের দিন উত্তেজনা ছড়ায়। জটলা তৈরি হয়, পরিস্থিতি কিছুটা অশান্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ ওঠে, কেন্দ্রীয় বাহিনী যথাযথভাবে সক্রিয় নয়। পাশাপাশি সিপিএমের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের সমর্থকদের বাড়িতে আটকে রাখা হচ্ছে এবং ভোট দিতে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগের তির তৃণমূলের দিকেই।

রানিনগরের নটকুলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি বুথ থেকে কংগ্রেসের এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কংগ্রেস প্রার্থী জুলফিকর আলির অভিযোগ, “বাঁশঝাড়ের তলায় বোমা-পিস্তল নিয়ে বসে আছে দুষ্কৃতীরা। মানুষকে বাড়ি থেকে বেরোতে দিচ্ছে না।” একইসঙ্গে বুথ জ্যাম করার অভিযোগও ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। সিউড়ির কুতুরা গ্রামের ২৫১ নম্বর বুথে তৃণমূল প্রার্থীর এজেন্ট রমারঞ্জন চট্টোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁকে বুথে ঢুকতে দেয়নি। তিনি বিষয়টি এসডিও এবং পুলিশ পর্যবেক্ষককে জানিয়েও কোনও প্রতিকার পাননি বলে দাবি। হলদিয়ায় তৃণমূল প্রার্থী তাপসী মণ্ডল অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোটারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে এবং ধমক দিচ্ছে। যদিও বুথের সামনে কোনওরকম জটলা এড়াতে সক্রিয় ছিল বাহিনী ও পুলিশ। শিলিগুড়ির এক বুথে সিপিএম ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। অভিযোগ, তৃণমূল কর্মীরা বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। ডোমকলের নাজিরপুরের ২২০ নম্বর বুথে সিপিএম কর্মীকে মারধরের অভিযোগও ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকলেও কেন্দ্রীয় বাহিনী দেরিতে পৌঁছয় বলে অভিযোগ।

রাজনৈতিক চাপানউতোরও ছিল তুঙ্গে। নন্দীগ্রামে তৃণমূলের দাবি, পুলিশ বিজেপির হয়ে কাজ করছে। বিদায়ী মন্ত্রী শশী পাঁজা জানান, পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু পুলিশকর্মীকে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, পিংলার ওসি চিন্ময় প্রামাণিক বিজেপি এজেন্টদের বুথ থেকে সরিয়ে দিচ্ছেন। তিনি ওই ওসির অবিলম্বে সাসপেনশনের দাবি জানান। দিনহাটায় তৃণমূল প্রার্থী উদয়ন গুহ অভিযোগ করেন, পুলিশ তাঁদের কর্মীদের থানায় ডেকে পাঠাচ্ছে, যা পরিকল্পিতভাবে বিজেপিকে সাহায্য করার চেষ্টা। তৃণমূলের আরও অভিযোগ, হলদিয়া ও নন্দীগ্রামে এমন পুলিশ আধিকারিকদের রাখা হয়েছে, যাঁদের সঙ্গে শুভেন্দুর ‘ভাল সম্পর্ক’ রয়েছে।

এই উত্তপ্ত আবহের মধ্যেই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরে ভোট দিয়ে বুথ থেকে বেরোনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হয় ইসরাতন বিবির, বয়স প্রায় পঞ্চাশ। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় তাঁর স্বামীর নাম বাদ পড়ে গিয়েছিল, এমনকি পরিবারের অন্য সদস্যদের নামও তালিকা থেকে কাটা যায়। এই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ছিলেন তিনি। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তৃণমূল প্রার্থী শিউলি সাহা বলেন, “এটা গণতন্ত্রের লজ্জা। এমন ঘটনা হওয়া উচিত নয়।”

অন্যদিকে ভোট দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। সিপিএম নেতা সূর্যকান্ত মিশ্র ভোট দিয়ে জানান, এ বার বামেদের ভোট বাড়বে এবং মেরুকরণ ভাঙবে। তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল মেয়ে সুকন্যাকে নিয়ে ভোট দিয়ে বলেন, “শান্তিপূর্ণ ভোট হচ্ছে, এটাই আমরা চেয়েছিলাম।” বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, মানুষ পরিবর্তন চাইছে এবং বিজেপির হাতেই শান্তি ও উন্নয়ন সম্ভব। এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মনও জলপাইগুড়িতে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, সকাল ১১টা পর্যন্ত মোট ২৬০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। সি-ভিজিল অ্যাপের মাধ্যমে এসেছে আরও ৩৭৫টি অভিযোগ। প্রথম দফার ভোটে প্রায় ৫ লক্ষ ভোটকর্মী দায়িত্বে রয়েছেন। প্রায় ১৫ হাজার বুথকে ‘স্পর্শকাতর’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সকাল ১১ টা পর্যন্ত রাজ্যে মোট ভোট পড়েছে ৪১ শতাংশ। এগিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুর।

প্রশাসনের দাবি, বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া ভোট মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ। তবে দিনের শুরু থেকেই যে হারে অভিযোগ জমা পড়েছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে—নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর? ভোট যত এগোবে, সেই প্রশ্নই কি আরও প্রকট হয়ে উঠবে, সে দিকেই এখন তাকিয়ে রাজ্য।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!