- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
পড়ুয়ার অভাবে বন্ধের পথে পশ্চিমবঙ্গের ৯৩৩ স্কুল ? সম্পত্তির বিকল্প ব্যবহারের জন্য কমিটি গঠন
পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার্থীর অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা ৯৩৩টি প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পথে রাজ্য সরকার। স্কুলগুলিতে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো পড়ুয়া ভর্তি না হওয়ায় ইতিমধ্যেই সেগুলি কার্যত অচল হয়ে রয়েছে। এবার সেসব স্কুলের জমি, ভবন, মাঠ ও অন্যান্য সম্পত্তি যাতে নষ্ট হয়ে না যায়, তার বিকল্প ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
স্কুল শিক্ষা দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, পড়ুয়াশূন্য স্কুলগুলির অধিকাংশই স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই বন্ধ স্কুলের ভবন ও সম্পত্তিকে বিকল্প কাজে ব্যবহারের বিষয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ জারি হয়েছিল। এবার সে সিদ্ধান্তেই চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজ্যের ৯৩৩টি প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে গত কয়েক বছর ধরে কোনো পড়ুয়া ভর্তি হয়নি। কোনো কোনো স্কুলে গত ২০ বছর ধরেও নতুন করে ছাত্রছাত্রীর দেখা মেলেনি। আবার অপেক্ষাকৃত কিছু স্কুলে গত পাঁচ বছর ধরে কোনও ভর্তি হয়নি। ফলে পড়ুয়া না থাকায় স্কুলগুলি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে।
এহেন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা স্কুলগুলির পরিকাঠামো ও সম্পত্তি নিয়েই এবার ভাবনাচিন্তা করছে সরকার। স্কুলগুলির ভবন, জমি, মাঠ-সহ অন্যান্য সম্পত্তি যাতে নষ্ট হয়ে না যায়, সে উদ্দেশ্যেই ব্যবহারযোগ্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় জেলাশাসকের নেতৃত্বে একটি করে কমিটি তৈরি করা হয়েছে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলিকে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে সরকারের বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর বা ‘ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল এক্সচেঞ্জ’-এর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, স্কুলগুলির সম্পত্তি বর্তমানে শিক্ষা দফতরের অধীনে রয়েছে। সেগুলি ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই বিষয়টিই কমিটি পর্যালোচনা করবে। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী ওই জমি বা পরিকাঠামো অন্য কোনো সরকারি কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
মন্ত্রী আরও জানান, রাজ্যের ৯৩৩টি প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল রয়েছে যেখানে গত ২০ বছর থেকে শুরু করে অন্তত গত পাঁচ বছর পর্যন্ত কোনও ছাত্র ভর্তি হয়নি। পড়ুয়ার অভাবে স্কুলগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে থাকা ভবন, জমি ও মাঠের মতো সম্পত্তি অনেক ক্ষেত্রেই নষ্ট হচ্ছে। তাই সেগুলির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।
এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের বক্তব্য, সরকারি স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা কমে যাওয়ার সমস্যা সাম্প্রতিক নয়; এর শিকড় কয়েক দশকের পুরনো। তাঁর দাবি, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক থেকেই সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে ধীরে ধীরে বহু পরিবার সন্তানদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠাতে শুরু করে।
কুণাল ঘোষের মতে, সে সময়ে ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ কমে যাওয়া এবং কম্পিউটার শিক্ষার পরিকাঠামো যথাযথভাবে গড়ে না ওঠার মতো বিষয়গুলি সরকারি স্কুলের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়তে থাকায় বহু পরিবার পরবর্তী প্রজন্মকে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, যে প্রজন্ম ওই সময়ে সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছিল, তাদের অনেকেই পরবর্তীতে নিজেদের সন্তানদের একই স্কুলে ভর্তি করাননি। এর ফলে সরকারি স্কুলগুলিতে পড়ুয়ার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে বহু স্কুল কার্যত পড়ুয়াশূন্য হয়ে পড়ে।
কুণাল ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, এ পরিস্থিতি রাতারাতি তৈরি হয়নি। কয়েক দশক ধরে সরকারি স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা কমার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তারই পরিণতিতে বর্তমানে বহু স্কুলে কোনও ছাত্রছাত্রী নেই। তাঁর মতে, ইংরেজি শিক্ষা, কম্পিউটার শিক্ষা এবং বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সেই সময় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব পরবর্তী সময়েও পড়েছে। তবে বর্তমানে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো, দীর্ঘদিন ধরে পড়ুয়াশূন্য হয়ে পড়ে থাকা স্কুলগুলির অব্যবহৃত সম্পত্তিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নির্ধারণ করা। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির ৩০ দিনের রিপোর্টের পরই প্রতিটি স্কুলের জমি, ভবন, মাঠ ও অন্যান্য সম্পত্তির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
❤ Support Us






