Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৫

সাহিত্য অকাদেমি সচিবের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ, বরখাস্ত মহিলাকে পুনর্বহালের নির্দেশ আদালতের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সাহিত্য অকাদেমি সচিবের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ, বরখাস্ত মহিলাকে পুনর্বহালের নির্দেশ আদালতের

সাহিত্য অকাদেমির সচিবের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ এনেছিলেন তিনি। অভিযোগ দায়েরের কিছুদিনের মধ্যেই চাকরি হারান। পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় ‘খারাপ কর্মদক্ষতা’-র অভিযোগে। তবে তা যে আসলে ‘প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ’ ছিল, শুক্রবার তা স্পষ্ট জানিয়ে দিল দিল্লি হাইকোর্ট। আদালতের রায়ে একদিকে যেমন ওই নারী আধিকারিককে তাঁর পুরনো পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তেমনই আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, সাহিত্য অ্যাকাডেমির সচিব ড. কে. শ্রীনিবাস রাও-ই এ ঘটনায় ‘নিয়োগকর্তা’র ভূমিকা পালন করেছেন, ফলে পিওএসএইচ আইন অনুযায়ী তদন্ত করার অধিকার জেলা স্তরের স্থানীয় অভিযোগ কমিটির রয়েছে। আদালতের এ পর্যবেক্ষণকে ঘিরেই রীতিমতো চাপে সাহিত্য অ্যাকাডেমি।

২০১৮ সালের ঘটনা। উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দা এক মহিলা অকাদেমিতে উচ্চপদে নিযুক্ত হন। অভিযোগ, সে সময় থেকেই সচিব শ্রীনিবাস রাও তাঁকে বারংবার অশালীন মন্তব্য এবং শারীরিক হেনস্তা করেন। কখনো সফরের মাঝপথে, কখনো অফিসের লিফটে, হেনস্তার রেশ ছড়িয়েছে বিভিন্ন পর্বে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে ওই মহিলা প্রথমে সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি ড. মাধব কৌশিককে একটি ই-মেল করেন। সেখানে তিনি একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের আবেদন জানান। কিন্তু অকাদেমি তা না করে অভিযোগটি নিজেদের অভ্যন্তরীণ কমিটি-র কাছে পাঠিয়ে দেয়। অথচ পিওএসএইচ আইনে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে যে, যদি অভিযুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্তা হন, তাহলে তদন্ত করতে হবে বাইরের কমিটিকে, অর্থাৎ এলসিসিকে। অভিযোগকারিনী আইসিসি-র কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি। তাঁর বক্তব্য, ‘আমার ই-মেলটিকে অনুমতি ছাড়াই অভিযোগ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।’ তারপরে আইসিসি-র বৈঠকে চাপ তৈরি করা হয় অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য। তিনি আরো অভিযোগ তুলেছেন যে, সভাপতি নিজে তাঁকে বলেন—সচিবের বিরুদ্ধে কিছুই করা হবে না। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করার পর অবশেষে তিনি ২০১৯ সালের ২৯ নভেম্বর দিল্লির জেলা প্রশাসনের অধীনস্থ স্থানীয় অভিযোগ কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এলসিসি জানায়, সচিব ‘নিয়োগকর্তা’র সংজ্ঞাভুক্ত এবং তাঁরা তদন্তে অগ্রসর হবেন। সঙ্গে সঙ্গে সুপারিশ করে, ওই মহিলাকে ৩ মাস সবেতন ছুটি দেওয়া হোক। কিন্তু আকাদেমি তাতেও অরাজি হয়।

এই পরিস্থিতিতে দিল্লি হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন অভিযোগকারিণী। পাল্টা অকাদেমিও আদালতের শরণাপন্ন হয়, দাবি তোলে, এলসিসির এক্ষেত্রে তদন্তের অধিকার নেই। আদালতও প্রথমে তদন্তে স্থগিতাদেশ দেয়, কিন্তু নির্দেশ দেয়, ভুক্তভোগী মহিলার বেতন চালু রাখতে হবে এবং তাঁকে ‘পেইড লিভ’-এ রাখা হোক। কিন্তু আদালতের নির্দেশের ঠিক একদিন পর, ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, অকাদেমি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ওই মহিলাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেয়। কারণ হিসাবে দেখানো হয় ‘দ্বিবার্ষিক পরীক্ষামূলক নিয়োগের মেয়াদ শেষ’ এবং ‘দক্ষতার অভাব’। ৩ বছরের আইনি লড়াইয়ের পরে অবশেষে ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট দিল্লি হাইকোর্ট জানিয়ে দেয়— এই বরখাস্ত ‘অবৈধ ও প্রতিহিংসামূলক’। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘ওই মহিলার বরখাস্তের সময় সচিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিচারাধীন ছিল। প্রতিষ্ঠান হিসেবে অ্যাকাডেমির উচিত ছিল সিদ্ধান্ত মুলতুবি রাখা।’ অকাডেমি যেভাবে ‘রিভিউ কমিটি’-র সুপারিশে তাঁকে বরখাস্ত করেছে, তা প্রতিষ্ঠানটির নিয়মে কোথাও লেখা নেই বলেও জানায় আদালত। এরপরই আদালত নির্দেশ দিয়েছে, ওই মহিলাকে অবিলম্বে পুনর্বহাল করতে হবে, সেপ্টেম্বর মাসের বেতন দিতে হবে, যাবতীয় বকেয়া বেতন ৪ সপ্তাহের মধ্যে মিটিয়ে দিতে হবে।

তবে এত বিতর্কের মাঝেও একাধিক সরকারি মঞ্চে সম্মানিত হচ্ছেন অভিযুক্ত সচিব শ্রীনিবাস রাও। হাইকোর্টের রায়ের ঠিক ৫দিন আগে, ২৩ আগস্ট বিহার সরকারের কাছ থেকে ‘বাবু গঙ্গাশরণ সিং সম্মান’ গ্রহণ করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার নিজে তাঁর হাতে তুলে দেন ১ লক্ষ টাকার চেক এবং সংবর্ধনার সনদ। এ ছাড়াও, রাষ্ট্রপতি ভবনে ‘বৈচিত্র্যের অমৃত মহোৎসব’ হোক কিংবা ব্রিকস সাহিত্য সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব, সর্বত্র সচিবের উপস্থিতি ও ভূমিকাও প্রশ্ন তুলেছে অনেকের মনে। এদিন, হাইকোর্ট তার রায়ে স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাহিত্য অকাদেমির উচিত ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে কাজ করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রতিষ্ঠানটি আইনের আলোকে না চলেই বিতর্কের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে গিয়েছে।’ এ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে উঠে আসছে আরো একটি বড় প্রশ্ন, সাহিত্য চর্চার অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান কি সত্যিই নারীকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে পারছে? নাকি, প্রতিষ্ঠান ও পদাধিকারীদের দায়বদ্ধতার অভাবেই এই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে ? প্রতিবেদনে বর্ণিত সমস্ত অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন। অভিযুক্তের দোষ বা নির্দোষ প্রমাণ এখনো আদালতের চূড়ান্ত রায়ের বিষয়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!