Advertisement
  • ক | বি | তা রোব-e-বর্ণ
  • মে ১৪, ২০২৩

গোলাম রসুলের গুচ্ছ কবিতা

গোলাম রসুলের গুচ্ছ কবিতা

ভাস্কর্য: দেবাশিস মল্লিক চৌধুরী

 

স্রোত অন্য দিকে ছুটছে

আর, কেবল তীক্ষ্ণ অনুভূতি প্রবণতা নিয়ে তৃপ্ত নয় গোলাম রসুলের কবিতার ছন্নছাড়া স্বভাব। স্রোত ভিন্ন দিকে ছুটছে। নতুন মােড় আঁকছে শব্দ, বাক্য গঠন, আর অসমাপ্ত, অস্পষ্ট উচ্চারণ; নৈশব্দ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খুঁজছে এমন এক নিসর্গ, যা নগরসভ্যতার ভেতরে নয়, বাইরেও নয়। এ এক প্রকান্ড বিস্ময়কর অবস্থান, ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য হলেও দৃশ্যগত নয়, সরাসরি প্রশ্নময় নয়, আবার প্রকারন্তরে জাগিয়ে দেয় এমন কিছু নিরুত্তর জিজ্ঞাসা এবং মগ্ন চৈতন্যে ছুঁইয়ে দেয়, ভাসিয়ে দেয় অসংলগ্ন খন্ডচিত্র নির্মাণের সূক্ষ্ণ, অতিসূক্ষ্ণ আচড়। এরকম অনাসক্ত, নির্মোহ রেওয়াজের নাম কী ?  সৃজনশীল পাগলামি ? নিসঙ্গতাবোধের আগুণে উদ্দীপ্ত প্রতিভার স্বনির্বাচিত বন্দীশালা থেকে মুক্তির অনুভব।

                                                                                                                                                                                              বাহারউদ্দিন

বন্দীশালায় নৈঃশব্দ্যের সঙ্কট

দিগন্ত দিয়ে ওদের কারারুদ্ধ করা যায় নি
অস্তমিত ধূসরমালা
শূন্য থেকে শূন্যতর সেতুগুলো পাহারা দেয় ওদের

এমন সময় আকাশে মৃতেরা জেগে উঠল
যারা মারা গিয়েছিল বন্দিশালায় নৈঃশব্দ্যের সঙ্কটে

নির্যাতিত বালি ধুধু করছে প্রাগৈতিহাসিক বৃষ্টিতে
আমি আয়নায় দেখছিলাম ব্যথিত রাশি রাশি মেঘ
তারা চলে যাচ্ছে
তাদের হাতে হাতে রয়েছে একটা বড়সড় সূর্য

অচেনা

ওই মৃত রেখা আর রঙে আমি একা থাকতে চেয়েছিলাম

ডুবে যাচ্ছিলাম দূরদিগন্তে

তাও আমি ছেলেবেলা থেকে নক্ষত্রদের জানি
একসঙ্গে সারারাত জেগে থাকতাম
যখন আমরা কাঁদতাম
আর আমাদের কান্নাগুলো হয়ে যেত নাক্ষত্রিক জল

নদী নেই
জ্বরে কাঁপছে উপকূল
পৃথিবী কখনো নঙর করে না

অন্য গ্রহ থেকে নুনের গন্ধ আসে
জীবনের স্বপ্ন দেখি
সকলে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে মা বাবা আত্মীয়স্বজন
এমন কি পশু পাখিরা যারা নিজের কাছেও অচেনা

ভোর হচ্ছে
ধ্বংসের পাশে বসে
মানুষ সাইরেন বাজাচ্ছে
দূরের শুকনো জলাশয় আরো প্রবল করে তুলছে বিদায়ের সব মুহূর্তকে।

শূন্যতার অংশীদার

পারদের মতো ওঠানামা

গন্ধকে ডোবানো দিগন্ত ডানা
উড়ে যাই
আর অতি দ্রুত মুছে যায়

যে অভিমুখে অন্ধকার বলয় পার হতে হতে, সারা বছর আমি ক্ষতবিক্ষত বৃষ্টি
এবং যখন অন্যান্য স্তম্ভ গুলো অতিক্রম করে চলে যাই, সে সময় দেখি
নক্ষত্রদের বিষণ্ণ ঋতুগুলো
থেমে যাই
ঘূর্ণমান পাখায়
বিস্ফোরণের মতো সহসা চমকে উঠি
যা আমার রুদ্ধশ্বাস জীবন

দূরে মুখ থেকে খসে পড়ে ভিজে নিঃশ্বাস অতীত গৃহের মতো
যেখানে আর কেউ বসবাস করে না

মাথার ওপর দানবের মতো কালিমালিপ্ত আকাশ
আমরা একসঙ্গে সবাই উড়ে যাই

অন্য এক বিশ্বাস নিয়ে

সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি আকাশ
ওখানে আমরা একাকার হয়ে যাই
আর খুঁজে পাই আলাদা একটা জীবন

এখন সবকিছু অন্যরকম লাগছে
যেন পৃথিবীর একটা প্রতিফলন
যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি
যেখানে একটা ধাঁধা ঝিঁঝিঁর মতো উড়ে বেড়াচ্ছে
আশ্চর্য লাগে কীভাবে আমরা বানিয়েছি এত সব আস্তানা
আমাদের বাড়িঘর হাটবাজার

আরো নেমে এসে দেখি
মেঘে সূর্যাস্তের আভা
মর্মান্তিক আমাদের সেই সব ভালোবাসার মতো
অনেকেই চলে গেছে জানি
যারা কোনোদিন ফিরবে না আর

আমাদের নদীগুলোও শুকিয়ে গেছে
ফিরে যাওয়া পাখিদের মতো ম্লান হয়ে গেছে অনেক পাহাড়
আমরা কেবল তাকিয়ে থাকি গভীর রাতের নক্ষত্রমণ্ডলীর দিকে অন্য এক বিশ্বাস নিয়ে

চিত্র: দেবদাস চক্রবর্তী

 

অচেনা শহর

আমার অশ্রু দিয়ে আমি চাঁদকে ধুয়ে দিয়েছি
আমার আঙুল কেটে আমি গেয়েছি গান
যখন সমুদ্রের মাঝখানে নৌকা হারিয়ে মাতাল হয়েছিল বৈঠা আমার মতো
আমি রক্ত দিয়ে গেয়েছিলাম সব হারানোর গান

বেঁচে থাকার উত্তাল আয়না ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছি কতবার

ছেলেবেলায় প্রবল পাগলামি করে কবরের ধারে বসে বইগুলো পড়ে ফেলতাম
প্রাচ্যের বিশাল কবরখানায় আমার শৈশবের বিষাদজোনাকিরা পরীর মতো নাচত
আমি কবরের সিংহাসনের ওপর বসে থাকতাম একা

শরৎ কালের মেঘ, উন্মমাদগ্রস্ত বৃষ্টি
আমাকে ছেড়ে পালিয়ে গেল আমার জীবন
আমি এখন অচেনা শহর
নিয়ে আসিনি মানবিকতার আসবাবপত্র

এখানে আকাশ চামড়ার মতো কুঁচকে থাকে
নক্ষত্ররা রক্ষা করে তাদের
প্রতীয়মান আমরা হেঁটে বেড়াতাম আয়নার ভেতরে
ঘোড়ার গাড়ির ঘন্টার শব্দ, রেস্তোরাঁর গাছ
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিঁড়ি
কুৎসিত গলি গুলোতে ঝুলতে থাকা ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের পায়ের দড়িদড়া

মহান গ্রন্থের পাতাগুলো উড়ছে ইতর আকাশে
শহরের হাসি যেখানে চক্রাকারে ঘুরছে

সমাজব্যবস্থাগুলো সুতোর মতো ঝুলছে
হাওয়া কাটাকাটি করে দিচ্ছে
আমরা হাওয়ার এক কোণ ধরে ঝুলন্ত
আলগা মনুষ্যত্বের মতো

আমি পাঠ করছি ঈশ্বরের আই ফোন

আমার হৃদয় একটি জলসাঘর
শরীরের শিল্পীদের আমি বারণ করিনি
তারাও আমার মতো জানত না কিভাবে মরতে হয়

দুটো আকাশ ঘুরছে উল্টোদিকে

পাখিরা উড়ে যাচ্ছে বিষণ্ণ ঋতুগুলোর মতো
তারা যাচ্ছিল উপসাগর যেভাবে পালিয়ে যায় আমাদের এপারে রেখে দিয়ে
উন্মত্ত আশা নৌকার মতো
প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে আমাদের ফেলে দেয় জলের ব্যাখ্যার ওপর
ভেসে ওঠে আলোকিত গ্যালারি আর তাদের নক্ষত্রসমূহ, বালি আর মেঘ

এখানে কে ব্যাখ্যা করবে আমরা কীভাবে জন্মেছিলাম আর কীভাবে মরে গিয়েছিলাম
বছরের পর বছর আমরা অপেক্ষা করে থাকি মৃত্যুর পরে কী আছে জানার জন্য
দেখি মৃত্যুর আলোক সজ্জায় পৃথিবী অনুপস্থিতি

দুটো আকাশ ঘুরছে উল্টো দিকে
আমাদের সেই সব জীবন আর মরণের মতো

সূর্যদয়ের মুহূর্ত

পৃথিবীর সীমান্তে মাটির মুরগি
আর মোরগের সে অবিস্মরণীয় ডাক মনে করিয়ে দেয় আমাকে নিয়ে যাবে সবচেয়ে দূরে, যেখানে একটি দয়ার স্তম্ভ ভাসছে

বুঝতে পারছিলাম শেষ পর্যন্ত তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়লে প্রাচীন নৈঃশব্দ্য নিয়ে
মেঘ এসে ঘুমিয়ে আছে তোমার পাশে
আমাদের ইতিহাস মৃত্যুই
আর দেখা হবে না কোনোদিন এই সূর্যের সময়ে

ওখানে কোনো মানুষ নেই যে তোমাকে নিয়ে যাবে কবর পর্যন্ত
আমারও কোনো ধর্ম নেই যে পাঠাবো একটি কাগজ

 

 

♦♣♦♣—♦♣♦♣  ♦♣♦♣—♦♣♦♣


  • Tags:
❤ Support Us
ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
ঈশানবঙ্গের শক্তি পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!