- এই মুহূর্তে স | হ | জ | পা | ঠ
- জুন ২৬, ২০২৫
আফ্রিকার হৃদস্পন্দনে পৃথিবীর নতুন ভবিষ্যৎ ! জন্ম নিচ্ছে নতুন মহাসাগর, ভাগ হচ্ছে ভূ-খণ্ড
ধরণীর গহিন অতল থেকে উঠে আসছে এক অজানা বার্তা—ছন্দময়, শক্তিশালী এবং ধীরে ধীরে পরিবর্তনের সংকেতবাহী। ইথিওপিয়ার আফার অববাহিকায়, যেখানে তিনটি টেকটোনিক প্লেট মিলিত হয়েছে, সেখানকার মাটির নিচে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন এক অভূতপূর্ব ভূতাত্ত্বিক ঘটনা—পৃথিবীর ‘হৃদস্পন্দন’। আর এই ভূতাত্ত্বিক আশ্চর্য ঘটনার হাত ধরে আফ্রিকার বুকে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন মহাসাগর।
সম্প্রতি ‘নেচার জিওসায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এমনটাই জানিয়েছেন সাউদ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। গভীর ম্যান্টল থেকে উঠে আসা গলিত পদার্থ ছন্দময়ভাবে পৃথিবীর পৃষ্ঠে চাপ সৃষ্টি করছে, যার ফলে ক্রমশ ফেটে যাচ্ছে আফ্রিকার ভূমি। ভবিষ্যতে এই স্থানে গড়ে উঠবে এক নতুন মহাসাগর। যেন যুগের পর যুগ ধরে চলতে থাকা এক মৌন সৃষ্টি-নাটক, যা আজ আমাদের চোখের সামনে খুলে দিচ্ছে ভবিষ্যতের জানালা। নতুন এই আবিষ্কার শুধু ভূগোলের পাঠ বদলে দিচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে আমাদের চিন্তা করার ভঙ্গিও। এতদিন ভূ-কম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, মহাদেশীয় ভাগ—সবই আমরা দেখেছি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে, এগুলির পেছনে রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট ছন্দ, নির্দিষ্ট গতি এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত এক গভীর, প্রাণবন্ত ভূ-অভ্যন্তর।
গবেষক দলের অন্যতম প্রধান লেখিকা ড. এমা ওয়াটস জানিয়েছেন, ‘আমরা দেখতে পেয়েছি আফারের নিচের ভূ-স্তরের একটি অংশ নির্জীব, নিস্পন্দ নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে স্পন্দিত হয়। সে স্পন্দনের নিজস্ব রাসায়নিক চিহ্নও রয়েছে।’ বর্তমানে সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এই গবেষক আরো বলেন, ‘এই স্পন্দিত ম্যাগমা রিফটিং প্লেটের ফাঁক দিয়ে উঠে আসছে, যা পৃথিবীর অভ্যন্তর ও ভূপৃষ্ঠের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।’ প্রায় ১৩০টিরও বেশি আগ্নেয় শিলার নমুনা সংগ্রহ করে এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পান বিজ্ঞানীরা। গবেষণার সহ-লেখক, অধ্যাপক টম গারনন বলেন, ‘এই ছন্দময় গলনের ধরণ ঠিক যেন হৃদস্পন্দনের মতো। প্লেটের গঠন আর গতি বুঝতেই স্পন্দনের প্রকৃতিও বদলে যাচ্ছে।’
এই ‘স্পন্দন’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় কল্পবিজ্ঞানের কথা, যেখানে পৃথিবী হয়ে ওঠে জীবন্ত। তবে এ কথা গল্প হলেও, বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর গভীরে যা চলছে, তারই প্রতিফলন আমরা দেখি ভূ-পৃষ্ঠে। ফলে ভূবিজ্ঞানের পাঠে এই আবিষ্কার নতুন মাত্রা যোগ করবে নিঃসন্দেহে। একইসঙ্গে, এটি নতুন করে ভাবতে শেখাবে আমাদের—পরিবেশ, প্রকৃতি ও মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে। সাউদ্যাম্পটন ও ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ডেরেক কিয়ার বলেন, ‘গভীর ম্যান্টলের এই আপওয়েলিং এবং উপরের টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর ফলে আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প এবং মহাদেশ ভাগ হওয়ার যে প্রক্রিয়া, তা বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন দিশা খুলে যাচ্ছে।’ গবেষকরা মনে করেন, আফার রিফট ধরে এখন যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে চলতে চলতে সম্পূর্ণ মহাদেশকে ভাগ করে দেবে। আর আগামী কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যে সেখানেই গড়ে উঠবে এক নতুন মহাসাগর। তবে এই আশ্চর্য আবিষ্কারের আনন্দের পাশাপাশি আছে সতর্কতার বার্তাও। ভূ-গর্ভে এমন পরিবর্তন কেবল নতুন সৃষ্টির ইঙ্গিত নয়, তা বিপদের পূর্বাভাসও হতে পারে। ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত—এইসব দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস দিতে, এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। শুধু তাই নয়, উন্নয়ন নীতি, নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও নয়া আবিষ্কারের ভূমিকা হয়ে উঠতে পারে বৈপ্লবিক।
উল্লেখ্য, প্রতি ২৬ সেকেন্ডে একবার নিঃশব্দে কেঁপে ওঠে পৃথিবী। না, ভূমিকম্প নয়—এই রহস্যময় কম্পন অনুভব করা যায় না, ধরা পড়ে কেবল সিসমোমিটারে। ষাটের দশকে প্রথম ধরা পড়েছিল এর অস্তিত্ব, পরে ২০০৫-এ আবার নজরে আসে বিজ্ঞানীদের। উৎস? আফ্রিকার উপকূল সংলগ্ন গাল্ফ অফ গিনির গভীরে কোথাও। তীব্র ঢেউ নাকি সাগরতলের আগ্নেয়গিরি—বিতর্ক, দ্বিমত রয়েছে, এত বছরেও মেলেনি চূড়ান্ত উত্তর। কিন্তু, রয়ে গিয়েছে এক অবাক করা সত্য—এই স্পন্দন আজো চলছে, একটানা, অবিরাম। বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, বড়ো ভূকম্প বা প্লেট টেকটনিকের মতো গুরুতর বিষয়ের তুলনায় এ গবেষণার গুরুত্ব কম, তাই এর পেছনে সময় দেওয়া হয় না খুব একটা। তবুও, প্রশ্নটা থেকেই যায়— কেন প্রতি ২৬ সেকেন্ডে কাঁপে পৃথিবী? কে পাঠায় এই নিঃশব্দ সংকেত ? বিজ্ঞানীরা বলে চলেছেন, ‘কারণ এখনো অধরা।’
❤ Support Us





