- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ২, ২০২৬
১৫ বুথে পুনর্নির্বাচনের মধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন স্ট্রংরুমের সিসিটিভি বিভ্রাটের অভিযোগ, নিরাপত্তা নিয়ে সরব দুই ফুল শিবির
দ্বিতীয় দফার ভোটকে ঘিরে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের আবহে শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট পশ্চিম ও ডায়মন্ড হারবারের ১৫টি বুথে পুনর্নির্বাচন শুরু হয়েছে। সকাল থেকে আপাতত শান্তিপূর্ণ ভাবেই চলছে ভোটগ্রহণ। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, বেলা ১১টা পর্যন্ত দুই বিধানসভা কেন্দ্র মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৩৬.৯৯ শতাংশ। তার মধ্যে মগরাহাট পশ্চিমে ভোটদানের হার ৩৮.২ শতাংশ, ডায়মন্ড হারবারে ৩৫.৯২ শতাংশ।
সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তার অনেক আগেই বুথের সামনে ভিড় জমতে শুরু করে। মগরাহাট পশ্চিমের একটি বুথের সামনে সকাল ৬টা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন ভোটারেরা। স্থানীয়দের একাংশের কথায়, এলাকায় সাধারণত ভোটকে কেন্দ্র করে অশান্তির ইতিহাস নেই। সে কারণেই পুনর্নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অনেকের মনে। দ্বিতীয় বার ভোট দিতে হওয়ায় কিছুটা ক্ষোভও ধরা পড়েছে ভোটারদের কথায়। ভোট দিতে আসা কয়েক জন জানান, বুধবার তাঁরা ভোট দিয়েছিলেন। পরে শুক্রবার রাতে বিএলও বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর দেন, ভোট বাতিল হয়েছে এবং শনিবার ফের ভোট হবে। যদিও পুনর্নির্বাচনের দিনে ভোটদানে কোনো অসুবিধার মুখে পড়তে হয়নি বলেই জানিয়েছেন তাঁরা।
পুনর্নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তার বলয়ও চোখে পড়ার মতো। কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশের জওয়ানেরা সকাল থেকেই বুথের সামনে মোতায়েন রয়েছেন। কোথাও জমায়েত করতে দেওয়া হয়নি। বুথ চত্বর এবং আশপাশের এলাকায় নিয়মিত টহল দিয়েছে নিরাপত্তারক্ষীরা। কমিশনের তরফেও দাবি, ভোটগ্রহণ আপাতত নির্বিঘ্নেই চলছে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের ১১টি বুথ এবং ডায়মন্ড হারবারের ৪টি বুথে এ দিনের পুনর্নির্বাচন হচ্ছে। মগরাহাট পশ্চিমের ৪৬, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১৪২, ২১৪, ২
এদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায় পুনর্নির্বাচন নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। সেখানে একাধিক বুথ থেকে গোলমালের অভিযোগ ওঠার পর স্ক্রুটিনির জন্য এলাকায় গিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত। সূত্রের খবর, দিল্লিতে পাঠানো তাঁর প্রাথমিক সুপারিশে ফলতার প্রায় ৩০টি বুথে পুনর্নির্বাচনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টে উল্লেখ, ভোটের দিন সকালে ফলতার বেশ কয়েকটি বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে সেই তথ্য কমিশনের কন্ট্রোল রুমে পৌঁছায়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্রের খবর, ভোটের দিন সকালে ফলতার বেশ কয়েকটি বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে সেই তথ্য কমিশনের কন্ট্রোল রুমে পৌঁছায়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কমিশনের তরফে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। বিদায়ী বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও ফলতায় পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ডায়মন্ড হারবারে ৪টি এবং মগরাহাটে ১১টি বুথে পুনর্নির্বাচন হচ্ছে বটে, কিন্তু ডায়মন্ড হারবারের আরও কয়েকটি বুথে সমস্যা হয়েছিল বলেও তাঁর দাবি।
প্রসঙ্গত, প্রথম দফার ভোট মোটের উপর শান্তিপূর্ণ হলেও বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিক্ষিপ্ত অশান্তির অভিযোগ উঠে আসে। ফলতার একটি বুথে ইভিএমে বিজেপি এবং সিপিএমের বোতামের উপর ‘টেপ’ লাগানো ছিল বলে অভিযোগে উত্তেজনা ছড়ায়। উদয়নারায়ণপুরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক জওয়ানের ধাক্কায় এক বৃদ্ধের মৃত্যুর অভিযোগও ওঠে। ভোটের পর মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ অগ্রবাল জানিয়েছিলেন, প্রাপ্ত অভিযোগগুলি বিবেচনা করেই পুনর্নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে, গণনাকেন্দ্রগুলির নিরাপত্তা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বারাসত কলেজে চারটি ঘরের সিসিটিভি ১৭ মিনিট বন্ধ থাকার অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। দলের বক্তব্য, ডিসপ্লে মনিটরিং সংযোগে সমস্যা ছিল। ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার–এর দাবি, ক্যামেরা বন্ধ ছিল না, বরং বাইরে থাকা ডিসপ্লে মনিটর কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, যার ফলে ফুটেজ দেখা যাচ্ছিল না। তবে ওই সময়ের সমস্ত রেকর্ডিং সংরক্ষিত আছে এবং তা সকলকে দেখানো হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন অশোকনগরের তৃণমূল প্রার্থী নারায়ণ গোস্বামী। তিনি জানান, সকাল ৮টা ৮ মিনিট নাগাদ দলীয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিষয়টি জানতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি অবজারভার ও জেলা নির্বাচন আধিকারিককে জানান এবং প্রায় ৮টা ৩০ মিনিট নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছন। তাঁর দাবি, প্রায় ৮টা ২২-২৩ মিনিট নাগাদ ক্যামেরা আবার সচল হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘সিসিটিভি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকার কথা, তা হলে কেন এই বিভ্রাট ? এর জবাব দিতে হবে।’ বিজেপির পক্ষ থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। বিজেপি নেতা শঙ্কর চট্টোপাধ্যায় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘কে ক্যামেরা বন্ধ করল, কতক্ষণ বন্ধ ছিল, সব কিছু খতিয়ে দেখতে হবে। দোষীদের গ্রেফতার ও সাসপেন্ড করতে হবে।’ বরানগরের বিজেপি নেতা সজল ঘোষ কটাক্ষ করে বলেন, ‘যে অভিযোগ এতদিন আমরা করতাম, এখন তৃণমূলই তা করছে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি হতে পারে, কিন্তু এই সময় এমন ঘটনা সন্দেহের জন্ম দেয়।’
সাখাওয়াতে স্ট্রংরুমের ২০০ মিটারের মধ্যে বিএনএসের ১৬৩ ধারা জারি থাকায় কড়া নজরদারি চালাচ্ছে পুলিশ। পরিচয়পত্র পরীক্ষা করেই যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ভোরের দিকে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রেও উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ, ভোর ৪ টে নাগাদ ব্যালট বোঝাই আটটি বাক্স সেখানে পৌঁছয়। পরে সেগুলি এমন একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে সিসিটিভি নেই। তৃণমূলের দাবি, ওই ব্যালট বাক্স আগেই পৌঁছনোর কথা থাকলেও তা দেরিতে আসে। পরে অন্য ঘরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া নিয়ে আপত্তি জানালেও তা গ্রহণ করা হয়নি। এই অভিযোগের সমর্থনে সিসিটিভি নজরদারির একটি ছবি এবং একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে শাসকদল। শ্যামপুকুরের বিজেপি প্রার্থী পূর্ণিমা চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, স্ট্রংরুমের ভিতর থেকে তৃণমূল কর্মীরা ফেসবুক লাইভ করছিলেন এবং তাঁকে লক্ষ্য করে স্লোগান দিচ্ছিলেন। এতে নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে তাঁর দাবি। স্ট্রংরুম সংক্রান্ত যাবতীয় ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বর্তমানে ওই গণনাকেন্দ্র কড়া নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। বারাসাত গভর্নমেন্ট কলেজের এই স্ট্রংরুমে বারাসাত, অশোকনগর, হাবড়া ও দেগঙ্গা— চারটি বিধানসভা কেন্দ্রের ইভিএম সংরক্ষিত রয়েছে।
পূর্ব বর্ধমানের ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্ট্রংরুমেও নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। বিজেপি প্রার্থী সঞ্জয় দাস একটি ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছেন, একজন ব্যক্তি দড়ি বেয়ে স্ট্রংরুমের ছাদে উঠছেন, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ফাঁক তুলে ধরে।
তবে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি স্বরাজ ঘোষ পাল্টা অভিযোগ করে জানান, স্ট্রংরুমের সিসিটিভি ডিসপ্লেতে দেখানো সময়ের সঙ্গে বাস্তব সময়ের ১-২ মিনিট পার্থক্য রয়েছে। জেলা নির্বাচন দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন গণনাকেন্দ্রে এখনও এসি ও সিসিটিভি বসানোর কাজ চলছে।
পুনর্নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পর গণনা হবে আগামী ৪ মে। এ বার গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা কমিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২৯৪টি আসনের ভোট গোনা হবে ৭৭টি কেন্দ্রে। তার আগে স্ট্রংরুমের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ইভিএম সংরক্ষিত কেন্দ্রগুলিতে সিসিটিভির কড়া নজরদারি রয়েছে। ফলে এক দিকে যেমন মগরাহাট পশ্চিম ও ডায়মন্ড হারবারে আপাতত শান্তিপূর্ণ ভাবে পুনর্নির্বাচন চলছে, অন্য দিকে ফলতা এবং গণনাকেন্দ্র ঘিরে ওঠা নতুন প্রশ্ন রাজ্যের রাজনৈতিক পারদকেও উঁচুতে রেখেছে। এখন নজর কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
❤ Support Us






