- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২, ২০২৫
কেরালায় ‘মস্তিষ্ক খাদক’ অ্যামিবার থাবা, মৃত ৩
বর্ষা মানেই দক্ষিণ ভারতে চিরচেনা জলসঙ্কট। তবে এ বছরের কেরালা বর্ষা শুধু জল নয়, সঙ্গে নিয়ে এসেছে এক নতুন আতঙ্ক। নাক দিয়ে জলের সঙ্গে শরীরে ঢুকে পড়ছে ‘মস্তিষ্ক খাদক’ এক মারাত্মক জীবাণু, যার পোশাকি নাম নেগ্লেরিয়া ফাউলরি, সাধারণ ভাষায় ‘ব্রেন-ইটিং অ্যামিবা’। গত এক মাসে কেরালায় এই অ্যামিবার সংক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ জন। এঁদের মধ্যে আছে ৩ মাসের একটি শিশু, ৯ বছরের এক স্কুল পড়ুয়া ছাত্রী ও ৫২ বছরের এক গৃহবধূ। পাশাপাশি একাধিক রোগী এখনো হাসপাতালে ভর্তি, যাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণঘাতী এই অ্যামিবা মূলত বাসা বাঁধে উষ্ণ, অচল বা ধীরগতির মিষ্টি জলে। যেমন পুকুর, কুয়া, নদী, জলাশয় কিংবা অপর্যাপ্ত ক্লোরিনযুক্ত সুইমিং পুলে। বর্ষাকালে যখন এমন জলাশয়গুলিতে এরা বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে, বিস্তারও বেশি হয়। প্রাণঘাতি এই অ্যামিবা জলের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে ততখানি কিছু ঘটে না, তবে নাক দিয়ে সরাসরি দেহে ঢুকলেই বিপদ। নাসারন্ধ্র পেরিয়ে গেলে এটি সরাসরি পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে, এবং শুরু হয় ‘প্রাইমারি অ্যামিবিক মেনিনজোএনসেফালাইটিস’ বা ‘পিএএম’ নামক একটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী সংক্রমণ। চিকিৎসকদের মত অনুযায়ী, ‘পিএএম’ রোগের লক্ষণ ধরা পড়ে সংক্রমণের ১ থেকে ১২ দিনের মধ্যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৫ দিনের মাথায়। প্রাথমিকভাবে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে উচ্চমাত্রার জ্বর, প্রবল মাথাব্যথা, বমি ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই রোগীর মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, হ্যালুসিনেশন শুরু হয়, খিঁচুনি আসে, এবং দ্রুত রোগী কোমায় চলে যান। অনেক ক্ষেত্রেই সংক্রমণের ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু ঘটে আক্রান্তের। কোঝিকোড়ের মৃত শিশু মাত্র ১ দিনের জ্বরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
কেরালা সরকার ভয়াবহ এ সংক্রমণ রুখতে নানা প্রকার উদ্যোগ নিয়েছে। চালু হয়েছে ‘জলই জীবন’ নামে রাজ্যব্যাপী সচেতনতামূলক অভিযান। এর আওতায় প্রতিটি জেলার কুয়া, পুকুর, জলাধারগুলিতে ক্লোরিন মেশানো হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন নিয়মিত জল পরীক্ষাও চালাচ্ছে। একই সঙ্গে জল ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি নিয়ে জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে । বিশেষ করে কুয়া বা পুকুরে স্নান না করতে, খোলা জলাশয়ে মাথা না ডুবিয়ে রাখতে, এবং ধর্মীয় রীতিতে নাক ধোয়ার সময় গরম জল বা বিশুদ্ধ জল ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে। এই অ্যামিবা সংক্রমণের চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল, সংক্রমণ ছড়ায় খুব দ্রুত। তবে সাম্প্রতিককালে কেরালায় এ রোগের চিকিৎসায় কিছু সাফল্য দেখা গিয়েছে, একাধিক রোগী ‘মিল্টেফোসিন’ নামক একটি বিশেষ ওষুধে সাড়া দিয়েছেন। যদিও চিকিৎসকেরা সতর্ক করে জানাচ্ছেন, একমাত্র সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। তাই উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো জরুরি ।
উল্লেখ্য, ভারতে এ রোগ নতুন নয়। প্রথম ‘পিএএম’ সংক্রমণ ধরা পড়েছিল ১৯৭১ সালে। এরপর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, গুজরাটে। কেরালায় প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে আলাপ্পুজায়। কিন্তু ২০২৩ থেকে সংক্রমণের গতি বেড়েছে মারাত্মক হারে। ২০২৪ সালে ৩৬ জন আক্রান্ত হন, যার মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু হয়। আর ২০২৫-এর প্রথম ৮ মাসেই সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২-এ। কেরালার স্বাস্থ্য দফতর থেকে জানানো হয়েছে, ‘পিএএম’ রোগে আক্রান্ত হওয়ার মূল কারণ হলো অপরিশোধিত জলের ব্যবহার। বিশেষ করে বর্ষায় পুকুর বা কুয়ার মতো জায়গায় স্নান বা সাঁতার কাটা বিপজ্জনক হতে পারে। উজু বা ধর্মীয় পদ্ধতিতে নাক পরিষ্কারের সময় ব্যবহৃত জল যদি ফুটিয়ে না নেওয়া হয়, সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে কয়েক গুণ। এখনো পর্যন্ত এই অ্যামিবা সংক্রমণের কোনও প্রতিষেধক বা টিকা নেই। তাই বাঁচার একমাত্র উপায়—সচেতনতা ও সতর্কতা। বেশ কিছু নির্দেশিকা জারি করে পিনরাই বিজয়নের সরকার। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, জলাশইয়ে নামা এড়িয়ে চলুন। নাকে জল ঢুকতে দেবেন না। কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ নিতে ও সঠিক তথ্য দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। কেরালার স্বাস্থ্যকর্তারা মনে করছেন, এ অ্যামিবা সংক্রমণ আগামীতে দেশের অন্যান্য গরম ও আর্দ্র রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাত বেড়েছে, যার ফলে এমন জীবাণুর বিস্তার আরো সহজ হয়ে পড়ছে। তাই এখনই সময়। যদি জলই জীবন হয়, তবে সেই জীবনকে বাঁচাতে চাই সচেতনতার জলসিঞ্চন।
❤ Support Us







